ডেস্ক রিপোর্ট
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহম্মদ ইউনুস দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ১৮ মাসে তার প্রতিষ্ঠিত ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঘিরে একাধিক আর্থিক ও আইনি সিদ্ধান্ত এসেছে। এসব সিদ্ধান্ত আইনসম্মত বলে সংশ্লিষ্ট পক্ষের দাবি থাকলেও সমালোচকরা নৈতিকতা, স্বার্থের সংঘাত ও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার প্রশ্ন তুলছেন।
গ্রামীণ ব্যাংকের আয়করমুক্ত সুবিধা পুনর্বহাল
গত সপ্তাহে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) প্রজ্ঞাপন জারি করে ২০২৯ সাল পর্যন্ত গ্রামীণ ব্যাংক কে আয়করমুক্ত সুবিধা দেয়। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, প্রতিষ্ঠানটিকে প্রতিবছর কেবল আয়কর রিটার্ন জমা দিতে হবে।
গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠার পর থেকেই কর অব্যাহতি পেয়ে আসছিল। তবে ২০২১ সালের ১ জানুয়ারি থেকে সেই সুবিধা বন্ধ করা হয়। নতুন করে অব্যাহতি দেওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে— ক্ষমতার শীর্ষে থাকা অবস্থায় প্রতিষ্ঠাতার জন্য এই সুবিধা কতটা নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য।
সমালোচকদের মতে, বিশেষ আইনে প্রতিষ্ঠিত একটি ব্যাংকের জন্য এমন সিদ্ধান্ত রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল।
৬৬৬ কোটি টাকার কর দাবির রায় প্রত্যাহার
ড. ইউনূসের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ কল্যাণের কাছে এনবিআরের দাবি করা ৬৬৬ কোটি টাকার কর আদায়ের বিষয়ে হাই কোর্টের পূর্বের রায় সম্প্রতি প্রত্যাহার করা হয়েছে। বিচারপতি মোহাম্মদ খুরশীদ আলম সরকার ও বিচারপতি সরদার মো. রাশেদ জাহাঙ্গীরের বেঞ্চ এ সিদ্ধান্ত দেন এবং মামলার নথি প্রধান বিচারপতির কাছে পাঠানো হয়।
এর আগে হাই কোর্ট রিট খারিজ করে কর পরিশোধের বৈধতা বহাল রেখেছিল। পরে জানা যায়, বেঞ্চের একজন বিচারপতি অতীতে মামলাটিতে রাষ্ট্রপক্ষের হয়ে শুনানি করেছিলেন— সেই কারণে রায় প্রত্যাহার করা হয়।
আইনজীবী ও সমালোচকদের মতে, সময়কাল ও প্রেক্ষাপট মিলিয়ে দেখলে বিষয়টি জনমনে প্রশ্ন তৈরি করছে।
কর অব্যাহতি নিয়ে নীতিগত বিতর্ক
এনবিআর চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, কর আরোপের ক্ষেত্রে সংসদের অনুমোদন প্রয়োজন হলেও কর অব্যাহতি সরকার প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে দিতে পারে। আইনগত এখতিয়ার থাকলেও, নীতিগতভাবে ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তির প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এমন সুবিধা দেওয়া কতটা গ্রহণযোগ্য— তা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ বলছেন, স্বার্থের সংঘাত এড়াতে এ ধরনের সিদ্ধান্তে অতিরিক্ত স্বচ্ছতা ও স্বাধীন পর্যালোচনা থাকা উচিত ছিল।
স্পেকট্রাম বরাদ্দ ও বৃহৎ আর্থিক সিদ্ধান্ত
এ সময়ের মধ্যে টেলিযোগাযোগ খাতে বড় একটি সিদ্ধান্তও এসেছে। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) ৭০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডে ১০ মেগাহার্টজ স্পেকট্রাম বরাদ্দ দিয়েছে গ্রামীণ ফোন কে। ১৩ বছরের জন্য দেওয়া এই বরাদ্দের বিপরীতে প্রায় ২ হাজার ২০০ কোটি টাকা রাজস্ব পাওয়ার কথা বলা হয়েছে।
গ্রামীণ’ ব্র্যান্ড সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সিদ্ধান্ত একই সময়পর্বে আসায় জনপরিসরে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্ন
সমালোচকদের দাবি, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ দায়িত্বে থাকা অবস্থায় নিজের প্রতিষ্ঠিত বা ঘনিষ্ঠভাবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পক্ষে কর–সুবিধা বা আইনি স্বস্তি পাওয়া নৈতিক মানদণ্ডে বিতর্ক তৈরি করে। তাদের মতে, আইনি বৈধতা থাকলেও জনআস্থার প্রশ্নটি আলাদা।
১৮ মাসের এই ধারাবাহিক সিদ্ধান্তগুলো এখন জনপরিসরে বড় ধরনের বিতর্কের জন্ম দিয়েছে— যা সামনে আরও আইনি ও রাজনৈতিক আলোচনার বিষয় হয়ে থাকতে পারে।
মন্তব্য করুন