নিজস্ব প্রতিবেদক
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে ভোট জালিয়াতির মাধ্যমে জয় পেল দেশবিরোধী রাজনৈতিক দল জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ছাত্র শিবির। এরইমধ্যে ছাত্রদল সমর্থিত ভিপি প্রার্থী আবিদুল ইসলাম খান ভোট প্রত্যাখান করেছেন। ডাকসু বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী ঐক্য প্যানেলের ভিপি প্রার্থী উমামা ফাতেমাও। এছাড়া বামপন্থী প্রতিরোধ পর্ষদের সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদপ্রার্থী মেঘমল্লার বসুও অভিযোগ করেছেন ভোটে নানা অনিয়ম-কারচুপির ঘটনা দৃশ্যমান। ভোট কারচুপির অভিযোগ এনেছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনও।
কার্জন হল কেন্দ্রে অমর একুশে হলের একটি বুথে ভোটারকে আগে থেকে পূরণকৃত ব্যালট সরবরাহ করা হয়েছে। এই অভিযোগে কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে বলা হয়, ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রে (টিএসসি) বেগম রোকেয়া হলের ভোটাররা ভোট দিয়েছেন। এই কেন্দ্রে একজন ভোটারের ব্যালেট পেপারে দুই পদে টিক চিহ্ন দেওয়া ছিল বলে এক প্রার্থী অভিযোগ করেছেন। এই অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন সহকারী প্রক্টর এ কে এম নূর আলম সিদ্দিকী।
বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী সংসদ প্যানেলের জিএস পদপ্রার্থী আবু বাকের মজুমদার "ভোট কারচুপি বা ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং" এর অভিযোগ এনেছেন। তিনি দাবি করেন, অমর একুশে হলের ভোটারদের ব্যালট বাক্স আগে থেকে ভর্তি ছিল। রোকেয়া হলের ঘটনাও তুলে ধরেন তিনি।কাদের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ এমন প্রশ্নে তিনি জানান, যারা অনেক আগে থেকে রাজনীতিতে সক্রিয়। তারাই এরকম করতে পারেন।
নির্বাচন প্রত্যাখান করেছেন যেসব প্রার্থীরা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী ঐক্য প্যানেলের ভিপি প্রার্থী উমামা ফাতেমা। এ নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা চলার মধ্যেই মঙ্গলবার (৯ সেপ্টেম্বর) দিনগত রাত সোয়া ৩টার পর ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এ কথা জানিয়েছেন।
ফেসবুক পোস্টে উমামা ফাতেমা লিখেছেন, ‘বয়কট! বয়কট! ডাকসু বর্জন করলাম। ডাকসু নির্বাচনকে ‘সম্পূর্ণ নির্লজ্জ কারচুপির নির্বাচন’ আখ্যায়িত করে উমামা ফাতেমা লিখেছেন, ‘৫ আগস্টের পরে জাতিকে লজ্জা উপহার দিলো ঢাবি প্রশাসন। শিবির পালিত প্রশাসন।’
পরিকল্পিত কারচুপির অভিযোগ তুলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেছেন ছাত্রদল সমর্থিত প্যানেলের সহ-সভাপতি (ভিপি) পদপ্রার্থী আবিদুল ইসলাম খান। মঙ্গলবার (৯ সেপ্টেম্বর) দিনগত রাত আড়াইটার দিকে বিভিন্ন ভোটকেন্দ্র থেকে ফলাফল আসার মধ্যেই এই প্রতিক্রিয়া দেন তিনি।
আবিদুল ইসলাম খান বলেন, পরিকল্পিত কারচুপির এই ফলাফল দুপুরের পরপরই অনুমান করেছি। নিজেদের মতো করে সংখ্যা বসিয়ে নেওয়া হয়েছে। এই পরিকল্পিত প্রহসন আমি প্রত্যাখ্যান করছি।
কারচুপির অভিযোগ এনে ডাকসু নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন তাহমিনা আক্তার নামে এক স্বতন্ত্র সহ-সভাপতি (ভিপি) প্রার্থী। মঙ্গলবার বিকেলে টিএসসিতে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ভোটকেন্দ্রে ভোট কারচুপি ও দখলদারিত্ব হয়েছে। অভিযোগ করে তাহমিনা আক্তার বলেন, আগে থেকে ইসলামী ছাত্রশিবিরের প্রার্থীর পক্ষে পূরণ করা ব্যালট দিয়ে এবং বিভিন্ন কৌশলে জালিয়াতি করে তাদের প্রার্থীকে জিতিয়ে দেওয়ার জন্য প্রহসনের ভোটগ্রহণ হয়েছে।
শঙ্কিত শিক্ষার্থীরা
স্বাধীনতার পরে এই প্রথমবারের মতো ভোট জালিয়াতির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ন্ত্রণে এল শিবিরের হাতে। আন্তর্জাতিকভাবে সন্ত্রাসী স্বীকৃতি পাওয়া দলটি ডাকসু জেতায় শঙ্কা প্রকাশ করেছেন শিক্ষার্থীরা। তারা বলছেন, নির্বাচনে জয়ের আগেই নানাভাবে নারীদের চরিত্র হনন করেছে এই দলটি। নারীদের গণধর্ষণের হুমকিও দিয়েছে তাদের সমর্থকেরা। এখন তারা ক্ষমতায় গেলে কী হবে এ নিয়ে শিক্ষার্থীদের শঙ্কা বাড়ছে।
ডাকসু নির্বাচনে তৎপর ছিল বট বাহিনী
জামায়াত-শিবিরের বট বাহিনী ডাকসু নির্বাচনের দিন সকাল থেকে ভোটের ফলাফল প্রকাশ করে দেয়। বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের মতো শিবির নিয়ন্ত্রিত পেজগুলো থেকে বিকেলেই ফলাফল বলে দেওয়া হয়। এছাড়া তারা শিবিরের বিপক্ষে থাকা প্রার্থীদের বিরুদ্ধে নানা ধরনের উস্কানিমূলক বক্তব্যও ছড়াতে থাকে। এ থেকেও স্পষ্ট যে ফলাফল শিবির আগে থেকেই জানত।
এরপর কী
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এবারের ডাকসু ভোট যেন এক নজিরবিহীন প্রহসন, যা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতাকে বড় প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ডাকসু নির্বাচন সবসময়ই ছিল দেশের জাতীয় রাজনীতির প্রতিচ্ছবি। কিন্তু এবারকার নির্বাচনে যেভাবে জালিয়াতি, দখলদারিত্ব আর কারচুপির অভিযোগ উঠেছে, তা শুধু ডাকসুর গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেনি, বরং গোটা জাতির ভবিষ্যৎকেও সংকটে ফেলেছে।
মন্তব্য করুন