নিজস্ব প্রতিবেদক
২০২৪ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশে একটি বৃহৎ রাজনৈতিক আন্দোলন শুরু হয়, যা প্রথমে কোটাবিরোধী ও বৈষম্যবিরোধী দাবিতে সীমাবদ্ধ ছিল। তবে দ্রুত এই আন্দোলন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের একটি সরাসরি সরকারের বিরুদ্ধে সংগ্রামে রূপ নেয়। সরকার কিছু দাবি মেনে নিয়েও আন্দোলন থামেনি; বরং তা আরও বিপজ্জনক ও সহিংস হয়ে ওঠে। সরকারি স্থাপনা ভাঙচুর, কারাগারে বন্দি জঙ্গিদের পলায়ন, পুলিশের ওপর নৃশংস হামলা ও স্নাইপার হামলার ঘটনা সংঘটিত হয়, যা দেশে এক অনিশ্চিত ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করে।
এই সময় দেশের সেনাবাহিনী এবং আন্দোলনকারীদের মধ্যে সশস্ত্র সংঘর্ষ এড়ানোর চেষ্টা করা হয়, কিন্তু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। অবশেষে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিরাপত্তাহীনতায় পদত্যাগ করতে বাধ্য হন এবং দেশ ছাড়েন। এরপর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়া সত্ত্বেও দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও অবনতি হয় এবং বিভিন্ন স্থানে সহিংসতা বাড়তে থাকে।
এই অস্থিতিশীল অবস্থায় জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনার ভলকার টুর্ক সরকারকে কঠোর পদক্ষেপ না নিতে অনুরোধ করেন এবং আন্দোলনকারীদের পক্ষপাতিত্ব করেন। যদিও পুলিশের ওপর নৃশংস হামলা, সরকারি ভবনে আগুন দেওয়ার ঘটনা ও কারাগারে হিংস্রতা সম্পর্কে তিনি বিশেষভাবে কিছু বলেননি। এই একপক্ষীয় সমর্থন জাতিসংঘের পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তোলে এবং দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলোতে জাতিসংঘের অযথা হস্তক্ষেপের প্রশ্ন সৃষ্টি করে।
অবস্থা এতটাই সংকটাপন্ন হয় যে, মহাখালীয়ে সেতু ভবন, বনানীতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ভবনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ভবনে অগ্নিসংযোগ করা হয়। পাশাপাশি রাজধানীর মেট্রো স্টেশনে ব্যাপক ভাঙচুর চালানো হয়। আন্দোলনকারীরা দেশের বিভিন্ন এলাকায় নাশকতা চালিয়ে সরকারের নিয়ন্ত্রণ কার্যত ভেঙে দেন। যদিও সেনাবাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালায়, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে অংশ নেওয়া সেনাদের নিরস্ত্র করার পরিকল্পনাও গ্রহণ করে, যা সেনাবাহিনীর কার্যক্রমকে সীমিত করে এবং দেশের নিরাপত্তায় আরও সংকট সৃষ্টি করে।
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতিসংঘ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে জুলাই-আগস্ট মাসের সংঘর্ষে নিহতের সংখ্যা ১৪০০ ছাড়িয়ে গিয়েছিল বলে জানানো হয়। কিন্তু প্রতিবেদনে পরবর্তীতে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড ও সহিংসতার দায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ওপর চাপানো হয়নি। তদুপরি, ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ও তার সমর্থকদের ওপর সংঘটিত হামলা ও নাশকতার বিষয়টি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি, যা প্রতিবেদনটির পক্ষপাতিত্ব ও অসম্পূর্ণতার গুরুতর প্রশ্ন উত্থাপন করে।
অপরদিকে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, যার নেতৃত্বে ছিলেন ড. ইউনুস, ২০২৪ সালের মে মাসে আওয়ামী লীগের সব ধরনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে। জাতিসংঘের রেসিডেন্ট কোঅর্ডিনেটর গোয়েন লুইস এই নিষেধাজ্ঞাকে সমর্থন জানান এবং এমনকি আওয়ামী লীগ ছাড়া নির্বাচন ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ হতে পারে বলে মন্তব্য করেন। এই বক্তব্য জাতিসংঘের পক্ষ থেকে ক্ষমতাসীন দলের উপর দমন-পীড়নের বৈধতা প্রদানের একটি সুস্পষ্ট সংকেত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
জুলাই আন্দোলনের এক বছর পূর্তিতে জাতিসংঘ আয়োজিত অনুষ্ঠানে ড. ইউনুস জাতিসংঘকে ধন্যবাদ জানান, যা এক প্রকার স্বীকারোক্তি যে জাতিসংঘের ভূমিকা এই আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ও সিদ্ধান্তমূলক ছিল। তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে জাতিসংঘের প্রতিবেদনে একপক্ষীয়তা স্পষ্ট হওয়ায় এবং সহিংসতার প্রকৃত চিত্র তুলে ধরার ক্ষেত্রে গাফিলতি থাকার কারণে জাতিসংঘের ভূমিকা ব্যাপক বিতর্ক ও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বর্তমানে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে জাতিসংঘের এই ভূমিকা নিয়ে কঠোর সমালোচনা রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আন্তর্জাতিক সংস্থার এই ধরনের অর্ধেক-মাত্র তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন এবং একপক্ষের সমর্থন দেশের সার্বভৌমত্ব ও স্থিতিশীলতার জন্য মারাত্মক হুমকি হতে পারে। তারা মনে করছেন, বাংলাদেশের রাজনীতি ও মানবাধিকার বিষয়ে জাতিসংঘের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন, যাতে দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও শান্তি পুনঃস্থাপন সম্ভব হয়।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, জাতিসংঘের এই ধরনের হস্তক্ষেপ একটি দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অবাঞ্ছিত প্রভাব ফেলেছে। একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা হিসেবে জাতিসংঘের মূল কর্তব্য হলো সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানো। তবে বাংলাদেশে পরিস্থিতি বিচার-বিবেচনায় তারা একপক্ষীয় সমর্থন প্রদর্শন করেছে যা ব্যাপক প্রশ্ন উত্থাপন করছে। পুলিশের ওপর সহিংসতা, সরকারি স্থাপনায় আগুন দেওয়ার মতো ঘটনা গুরুত্ব সহকারে বিবেচনায় আনা হয়নি, যা রিপোর্টের নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষুণ্ন করেছে।
মন্তব্য করুন