নিজস্ব প্রতিবেদক
গণঅভ্যুত্থান ও নৈতিক রাজনীতির কথা বলে আত্মপ্রকাশ করা জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এখন বিতর্কের কেন্দ্রে। চাঁদাবাজি, অর্থ কেলেঙ্কারি এবং অস্বচ্ছ অর্থ ব্যবস্থাপনার অভিযোগে দলটি সমালোচনার মুখে পড়েছে। এনসিপির রাজনৈতিক কার্যক্রমে বিপুল অর্থ ব্যয়ের উৎস এবং এ অর্থের বণ্টন নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে, যা দলটির ঘোষিত আদর্শের সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক।
চাঁদাবাজির অভিযোগ ও পদযাত্রা ঘিরে বিতর্ক
সাম্প্রতিক জুলাই পদযাত্রাকে ঘিরে এনসিপির বিরুদ্ধে চাঁদা তোলার অভিযোগ জোরালো হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন অভিযোগে বলা হয়, এই কর্মসূচির অর্থ সংগ্রহে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে জোরপূর্বক চাঁদা আদায় করা হয়েছে। কোনো কোনো জেলায় ৫০ লাখ টাকার বেশি খরচের দাবি করা হয়েছে। ৬৪টি জেলায় সমান ব্যয় হলে মোট খরচ দাঁড়ায় প্রায় ৩২০০ কোটি টাকা, যা এনসিপির ঘোষিত ২ কোটি টাকার ‘নাগরিক আমানত’ তহবিলের বিপরীতে এক চরম বৈপরীত্য তৈরি করেছে।
সবশেষ গুলশান-২ এলাকায় আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য শাম্মী আহমেদের বাসায় চাঁদা চাইতে গিয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের তিন নেতা পুলিশের হাতে আটক হন। পরে এনসিপি প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে তাদের বহিষ্কার করে। তবে এই পদক্ষেপও বিতর্ক থামাতে পারেনি—বরং দলটির নৈতিক রাজনীতির দাবিকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
চাঁদার ভাগ কারা পান?
বিশ্বস্ত সূত্রগুলোর বরাতে জানা যায়, সংগৃহীত চাঁদার টাকা চলে যাচ্ছে এনসিপি ও সংশ্লিষ্ট ছাত্র আন্দোলনের একাধিক নেতার পকেটে। এদের মধ্যে আছেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, যুগ্ম আহ্বায়ক নুসরাত তাবাসসুম, উত্তরাঞ্চলের মুখপাত্র সারজিস আলম, দক্ষিণাঞ্চলের মুখপাত্র হাসনাত আব্দুল্লাহ, সিনিয়র যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আব্দুল হান্নান।
সূত্রগুলো দাবি করে, আগে চাকরির দাবিতে আন্দোলন করা এই নেতারা এখন আর্থিকভাবে আর পিছিয়ে নেই। নাহিদ ইসলামের বাবা ছিলেন একজন শিক্ষক, অথচ এখন তিনি ঢাকায় সেটেলমেন্ট অফিস চালান, নিজস্ব গাড়ি-বাড়ি রয়েছে।
সারজিস আলম–এর নামে ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওতে ৭ লাখ টাকা চাঁদা নেওয়ার প্রমাণ দেখা যায়। আরেকটি ভাইরাল চ্যাটে একজনের কাছ থেকে আইফোন নেওয়ার কথাও উঠে আসে। মার্চে পঞ্চগড়ে তার শতাধিক গাড়ির শোডাউন দেখে অনেকে কটাক্ষ করেন—“জমিদারের নাতি”।
হাসনাত আব্দুল্লাহ ও আব্দুল হান্নান মাসুদের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ওইদিকে ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন দাবি করেন, হান্নানকে একটি বন্দরের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
ব্যাংকিং লেনদেন ও বিদেশে পাড়ি
এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক খান তালাত মাহমুদ রাফির ব্যক্তিগত মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টে ৬১ লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। সংবাদমাধ্যম আল-ইহসান–এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত তার বিকাশ অ্যাকাউন্টে এই টাকা লেনদেন হয়। একই সময়ে তার মায়ের নামে খোলা অন্য এক বিকাশ অ্যাকাউন্টে লেনদেন হয় ৩১ লাখ ৯০ হাজার টাকা। জানা গেছে, রাফি বর্তমানে সুইজারল্যান্ডে পাড়ি দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
স্বচ্ছতা নেই, পুরনো বিতর্ক এখনো জীবিত
এনসিপি দাবি করে তাদের সংগঠনের অর্থায়ন আসে গণচাঁদা ও সদস্যদের অনুদান থেকে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো স্বচ্ছ হিসাব প্রকাশ করেনি দলটি। বরং ২০২৩ সালের বন্যা ত্রাণের জন্য সংগৃহীত ১৬–১৭ কোটি টাকার হিসাব নিয়েও রয়েছে গুরুতর অভিযোগ, যার জবাব আজও মেলেনি।
রাজনৈতিক ছত্রছায়া ও প্রতিক্রিয়া
এ বিষয়ে গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি ভিপি নুরুল হক নুর মন্তব্য করেন, “সরকারের ছত্রছায়ায় এনসিপিকে ‘কিংস পার্টি’ হিসেবে দাঁড় করানো হচ্ছে। পদযাত্রায় ব্যবহৃত বিপুল অর্থ সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় এসেছে কি না, তা তদন্ত হওয়া জরুরি।”
সাবেক বৈষম্যবিরোধী নেতা উমামা ফাতেমা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেন, “এতো চাঁদাবাজি দেখে সবাই হঠাৎ করে অবাক হওয়ার ভান করছেন—এটাই হাস্যকর। আসলে এটা তো বহুদিনের বিষয়। শুধু এবারই তারা পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে। যারা ভালো করে খোঁজ জানেন, তারা জানেন—এই শেকড় কত গভীরে বিস্তৃত।”
মন্তব্য করুন