নিজস্ব প্রতিবেদক
৫ আগস্টের পর থেকে দেশের আদালত পাড়ায় মব হামলার ঘটনা ক্রমশ ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে, যা বিচারব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও আইনের শাসনের প্রতি গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। সর্বশেষ ঘটনা ঘটেছে সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের মামলার শুনানিকে কেন্দ্র করে, যেখানে আদালতে উত্তেজনা ও হট্টগোলের ঘটনা প্রকাশ পেয়েছে।
গত ১১ আগস্ট হাইকোর্টে সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হকের জামিন ও মামলা বাতিলের আবেদনের শুনানির সময় আসামিপক্ষ ও রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে তুমুল বাকবিতণ্ডা ও ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটে। বিচারপতি শেখ জাকির হোসেন ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চে এই ঘটনা সংঘটিত হয়।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা সময় চাইলেও আসামিপক্ষের আইনজীবীরা শুনানির জন্য জোর দাবি জানান, যা পরিস্থিতিকে উত্তপ্ত করে তোলে। এমনকি আদালত কক্ষে একজন আইনজীবীকে ধাক্কা দেওয়ার ঘটনাও ঘটে। পরে আদালত শুনানির জন্য আগামী ১৭ আগস্ট দিন ধার্য করেন। এ ঘটনা প্রসঙ্গে আসামিপক্ষের আইনজীবী এম কে রহমান বলেন, “আদালতকে ডিকটেট করার চেষ্টা করা হচ্ছে, যা বিচার বিভাগের জন্য অপ্রত্যাশিত।”
জানা গেছে, সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হকের পক্ষে থাকা আইনজীবীরা— কামরুল হক সিদ্দিকী, মহসিনুর রহমান, জেড আই খান পান্না, এম কে রহমান, মনসুরুল হক চৌধুরী, মঞ্জিল মোর্শেদ প্রমুখ—এতে আপত্তি জানালে রাষ্ট্রপক্ষের এজি জসিম, ইব্রাহিম খলিল, উজ্জ্বলসহ কয়েকজন বেঞ্চ থেকে লাফিয়ে উঠে প্রতিপক্ষের আইনজীবীদের ওপর চড়াও হন। ধাক্কাধাক্কি ও হেনস্তার এক পর্যায়ে আইনজীবী বেলায়েত হোসেনকে মারধর করা হয়। বিচারপতির উপস্থিতিতেই ঘটে যাওয়া এই সহিংসতায় তিনি বাধ্য হয়ে শুনানি পরবর্তী রোববারে পিছিয়ে দেন। এই ঘটনার সাথে যুক্ত আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট হলো, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় শেখ হাসিনার পক্ষে আইনজীবী হতে চেয়েছিলেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জেড আই খান পান্না, তবে তার আবেদন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ খারিজ করে দেয়।
এর আগেও আদালত প্রাঙ্গণে মবের ঘটনা ঘটেছে। ২২ মে মানিকগঞ্জ আদালতে আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি ও কণ্ঠশিল্পী মমতাজের ওপর জুতা ও ডিম নিক্ষেপ করা হয়। ২০ আগস্ট ঢাকার আদালতে হাজির করার পর সাবেক মন্ত্রী ড. দীপু মনি ও সাবেক উপমন্ত্রী আরিফ খান জয়ের ওপর একদল আইনজীবী হামলা চালায়। ২২ আগস্ট ৭১ টিভির সাংবাদিক দম্পতি শাকিল আহমেদ ও ফারজানা রূপা পুলিশি নিরাপত্তার মধ্যেই হামলার শিকার হন; রূপাকে প্রকাশ্যে ঘুষি মারা হয়।
৭ অক্টোবর ঢাকার আদালতে সাবেক মন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরীর ওপর ডিম নিক্ষেপ, ২৮ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ আদালতে সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হককে কিল-ঘুষি মারা এবং ১৪ আগস্ট ঢাকায় আনিসুল হক ও সালমান এফ রহমানের ওপর জুতা ও ডিম নিক্ষেপের ঘটনাও ঘটে। ২৪ আগস্ট সিলেট আদালতে আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিকও হামলার শিকার হন। এসব ঘটনায় কারও বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
বরং ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, হামলাকারীদের মধ্যে অনেকে আইনজীবী পরিচয়ধারী। কখনও আবার ভুক্তভোগী পক্ষের আইনজীবীর বিরুদ্ধেই মামলা হয়েছে। সাবেক এমপি ব্যারিস্টার সায়েদুল হক সুমনের পক্ষে আদালতে শুনানি শেষে মিডিয়ায় ব্রিফ করার সময় আইনজীবী মোরশেদ হোসেন শাহীন প্রকাশ্যে মারধরের শিকার হন। তিনি অভিযোগ করে বলেন, “আমার চেম্বার ভাঙচুর হয়েছে, কোনো প্রতিকার পাইনি, উল্টো হত্যাচেষ্টা মামলার আসামি বানানো হয়েছিল।”
সূত্রের দাবি, অ্যাটর্নি জেনারেল ও আইন মন্ত্রণালয়ে ৬-৮ কোটি টাকার অবৈধ লেনদেন না দিলে আদালত এলাকায় মব হামলা চালানো হয়। এর সঙ্গে ভুয়া মামলা, মামলা দীর্ঘায়িত করা ও নির্যাতনের মতো কৌশলও জড়িত। আইন মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্বীকার করেন, কিছু গোষ্ঠী ইচ্ছাকৃতভাবে আইনি প্রক্রিয়ায় বাধা দিতে এই ধরনের সহিংস কৌশল ব্যবহার করছে।
আইন বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, আদালত এলাকায় এভাবে মব সন্ত্রাস চলতে থাকলে বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তারা সকল আইনজীবীকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে অরাজকতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে আইনাঙ্গনে স্বাভাবিক পরিবেশ ও আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।
মন্তব্য করুন