নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে একটি গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। বলা হচ্ছে, ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকারকে সরিয়ে সেনাবাহিনীর সমর্থন নিয়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূস ৮ আগস্ট ক্ষমতা গ্রহণ করেন এবং এরপর থেকে তিনি সেনাবাহিনীকে দুর্বল করার একটি পরিকল্পিত নীলনকশা বাস্তবায়ন করছেন। এই অভিযোগে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান, প্রেস সচিব শফিক, লেফটেন্যান্ট জেনারেল এস এম কামরুল হাসানসহ কয়েকজনের নাম জড়িত।
ড. ইউনূস ক্ষমতায় আসার পর দুটি ব্রিগেড গঠন করেছেন। প্রথম ব্রিগেডের মাধ্যমে কারাগার থেকে জঙ্গিদের মুক্তি দেওয়া হয়েছে, এবং দ্বিতীয় ব্রিগেডের লক্ষ্য সেনাবাহিনীকে দুর্বল করা। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ইউটিউবারদের মাধ্যমে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। বিশেষ করে পিনাক চক্রবর্তী, কনক সরোয়ার, এবং ইলিয়াস হোসেনরা এই প্রচারণায় জড়িত। এছাড়া, হিজবুত তাহরীরের মতো জঙ্গি গোষ্ঠীর সমর্থিত দল সেনাবাহিনীর মধ্যে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে।
আরেকটি গুরুতর অভিযোগ হলো, রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনের নামে তাদের অস্ত্র ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এই প্রশিক্ষণের পেছনে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান, প্রেস সচিব শফিক, এবং ব্রিগেডিয়ার আজমিরের সমন্বয়ে একটি পরিকল্পনা কাজ করছে। ড. ইউনূস জঙ্গি গোষ্ঠীদের শক্তিশালী করে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষমতায় থাকতে চান এবং এ জন্য বিশ্বের শক্তিশালী জঙ্গি গোষ্ঠীদের বাংলাদেশে অবাধ বিচরণের সুযোগ করে দিতে সেনাবাহিনীকে দুর্বল করার চেষ্টা করছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, সেনাবাহিনীকে দুর্বল করতে পারলেই দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও দুর্বল হবে। এর পাশাপাশি দেশে আন্তর্জাতিক জঙ্গি কানেকশন আরও সক্রিয় হবে।
সেনাবাহিনীকে দুর্বল করতে এরইমধ্যে বিভিন্ন ধরনের উস্কানি দিয়ে যাচ্ছে ইউনূসের সমর্থকেরা। গত মার্চে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণ অঞ্চল) হাসনাত আবদুল্লাহ সেনাবাহিনীর উদ্দেশে বলেছেন, ‘আপনাদের কাজ ক্যান্টনমেন্টে, আপনারা ক্যান্টনমেন্টে থাকুন। আপনাদেরকে আমরা সম্মান জানাই। গত ১৬ বছর জাতীয় রাজনীতিতে যেভাবে নোংরা হস্তক্ষেপ করেছেন, ’২৪-পরবর্তী বাংলাদেশে তা আর করতে দেওয়া হবে না।’
জাতীয় নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেছেন, আমাদের আর্মি ভাইয়েরা, হাতে শুধু অস্ত্র থাকতে হয় না. মাথায় কিছু ঢিলু থাকতে হয়। আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ ক্যান্টনমেন্ট উড়িয়ে দেওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন। ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফুল ওসমান বিন হাদি ক্যান্টনমেন্টের ইট খুলে নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনের নামে অস্ত্র প্রশিক্ষণ
সূত্র বলছে, সন্ত্রাসী রোহিঙ্গাদের একটি অংশের জন্য রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো পরিণত হয়েছে অস্ত্র ব্যবসার নিরাপদ ঘাঁটিতে। সেখানে চলছে সন্ত্রাসীদের প্রশিক্ষণ। স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রগুলো একের পর এক উল্লেখ করছে রোহিঙ্গাদের জড়িত থাকার কথা। অস্ত্র পাচার, কেনাবেচা, ডাকাতি, অপহরণ – বহু অপরাধের হাতেখড়ি হচ্ছে এই ক্যাম্পগুলোর পাশের পাহাড়ি গুহায়, ভ্রাম্যমাণ আস্তানায়। উদ্ধার হওয়া বিপুল পরিমাণ অস্ত্রের সূত্রও চলে গেছে সেদিকেই। আসামিরা জামিনে বেরিয়ে আবারও ডুবে যাচ্ছে অন্ধকার জগতে।
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই সময়টাতেই অস্ত্র পাচারের মাত্রা বেড়েছে হু হু করে। সংশ্লিষ্ট মহলের শঙ্কা, এই অস্ত্র ব্যবহার করা হতে পারে নির্বাচনী সহিংসতায়। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সুযোগে কারা লাভবান হবে? কারা চালাবে এই অস্ত্র? প্রশ্নগুলো রাতের অন্ধকারের মতো ঘনীভূত হচ্ছে।
দেশি-বিদেশি অস্ত্রের মিশেলে তৈরি হচ্ছে এক ভয়াবহ অস্ত্র ভান্ডার। মিয়ানআর থেকে আসছে ভারী অস্ত্র, মহেশখালী থেকে আসছে দেশীয় তৈরি। এই দুই ধারার মিলনস্থল কক্সবাজারের পাহাড়ি এলাকা। টেকনাফ, উখিয়া – এগুলো শুধু ভৌগোলিক নাম নয়; এরা এখন অস্ত্র পাচারের সমার্থক। কোস্ট গার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার হারুন-অর-রশীদের বর্ণনা অনুযায়ী, পাচারকারীরা কতটা সক্রিয়, কতটা সশস্ত্র, তা সহজেই অনুমেয়। তাদের সামাল দিতে যৌথ বাহিনীকে নামতে হচ্ছে মাঠে, ঝুঁকি নিতে হচ্ছে জীবন বাজি রেখে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জসিম উদ্দীন চৌধুরী সরাসরি বলেছেন, রোহিঙ্গাদের কারণেই অস্ত্রসংক্রান্ত অপরাধ বেড়েছে। ১৬ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি মো. কাউছার সিকদারও একই সুরে বলেছেন সন্ত্রাসী রোহিঙ্গাদের অস্ত্র ব্যবসা ও অপকর্মের কথা। আদালতে মামলা চলছে, জামিনে বেরিয়েছে অভিযুক্তরা। কিন্তু আদালতের চার দেয়ালের বাইরে কি বদলাচ্ছে কিছু? অস্ত্রের পাহাড় কি কমছে, নাকি আরও বাড়ছে?
এই অস্ত্রের ছায়া শুধু কক্সবাজার বা সীমান্তের মানুষকেই আতঙ্কিত করছে না; তা ছড়িয়ে পড়ছে গোটা দেশজুড়ে। পাচার হওয়া প্রতিটি রাইফেল, প্রতিটি গ্রেনেড, প্রতিটি রাউন্ড গুলি – এগুলো শান্তির শয্যায় পুঁতে রাখা ল্যান্ডমাইনের মতো। কখন, কোথায়, কীভাবে বিস্ফোরিত হবে, কেউ জানে না। রাষ্ট্রের কর্ণধারদের কানে এই বিপদসংকেত কি পৌঁছাচ্ছে? নাকি গুঞ্জরিত হচ্ছে শুধু সংবাদপত্রের পাতায়, টেলিভিশনের পর্দায়? অস্ত্রের এই বন্যা রোধে কার্যকর, দৃশ্যমান, নির্মম পদক্ষেপের সময় এখনই। আগামীকাল খুব দেরি হয়ে যেতে পারে।
রোহিঙ্গা নিয়ে সরকারের দ্বিচারিতা
২০২৫ সালের শুরুতে, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস ঘোষণা দেন যে, মিয়ানমার প্রথম ধাপে ১ লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গাকে ফেরত নেবে। তবে, এই ঘোষণা বাস্তবায়নের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যায়নি। পরবর্তীতে, ইউনূস জানান যে, রাখাইনে সহিংসতার কারণে গত কয়েক মাসে ৮০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। পরে জানা যায়, এই সংখ্যা এক লাখ ১৩ হাজার। এই পরস্পরবিরোধী বক্তব্যে সরকারের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের বাংলাদেশ সফর এবং রোহিঙ্গা শিবিরে ইফতার অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকে অনেকেই রাজনৈতিক নাটক হিসেবে দেখছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি উঠেছে যে, এই সফর এবং ইউনূসের মন্তব্যের মাধ্যমে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ভুয়া আশ্বাস দেওয়া হয়েছে, যা বাস্তবে কার্যকর হয়নি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, রাখাইন এখন আরাকান আর্মির দখলে। সেখানে মিয়ানমার সেনাবাহিনী, আরাকান আর্মি, এবং সাধারণ রোহিঙ্গা জনগণের মধ্যে সংঘাতের ত্রিমুখী অবস্থা বিরাজ করছে। মানবিক করিডোর খোলার পর তা যদি আরাকান আর্মির হাতে চলে যায়, তাহলে জাতিসংঘের কর্মীরাই বিপন্ন হতে পারেন। আরও ভয়ঙ্কর হলো—এই করিডোর যদি কার্যত রোহিঙ্গাদের পালিয়ে আসার নতুন পথ হয়ে দাঁড়ায়, তবে এটি নতুন রোহিঙ্গা ঢলের জন্ম দেবে, যা বাংলাদেশের পক্ষে আর বহন করা সম্ভব নয়।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, সেনাবাহিনীকে দুর্বল করার চেষ্টা যদি সত্যিই কেউ করে থাকে, তবে এটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত হুমকিস্বরূপ। ইতিহাসে দেখা গেছে, যে কোনো রাষ্ট্রে সামরিক শক্তিকে বিভাজন বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হলে তা দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও জনসাধারণের বিশ্বাসকে ক্ষুণ্ণ করতে পারে। যদি বাহিনীর কার্যকারিতা বা মানসিক স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তা দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতাকে দুর্বল করে। বাহিনীর অভ্যন্তরীণ একতা ও নৈতিকতা বজায় রাখা দেশের নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য।
মন্তব্য করুন