বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে ৭ মার্চের ভাষণ এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। ১৯৭১ সালের এই ভাষণ শুধু একটি রাজনৈতিক বক্তব্য ছিল না, বরং তা ছিল বাঙালি জাতির মুক্তির সংগ্রামের স্পষ্ট দিকনির্দেশনা। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের এই ভাষণ পরবর্তী সময়ে মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি ও সংগঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
১৯৭৪ সালে সাপ্তাহিক বিচিত্রায় প্রকাশিত এক লেখায় সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭১ সালের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধি তুলে ধরেন। সেই লেখায় তিনি উল্লেখ করেন যে, ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে দেওয়া ৭ মার্চের ভাষণ তাদের কাছে কার্যত একটি “গ্রিন সিগন্যাল” হিসেবে মনে হয়েছিল।
জিয়াউর রহমান তার লেখায় উল্লেখ করেন, বঙ্গবন্ধুর সেই ভাষণের পর তারা নিজেদের প্রস্তুতি ও পরিকল্পনাকে আরও সুসংগঠিত করার উদ্যোগ নেন। রাজনৈতিক নেতৃত্বের আহ্বান তখনকার সশস্ত্র প্রতিরোধের প্রস্তুতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করেছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন।
১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দান, যা বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান নামে পরিচিত, সেখানে লাখো মানুষের উপস্থিতিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করেন। ভাষণের এক পর্যায়ে তিনি ঘোষণা করেন, ❝এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম❞।
যদিও সেদিন আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়া হয়নি, তবে ইতিহাসবিদদের মতে এই ভাষণের মধ্যেই স্বাধীনতার সংগ্রামের সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা ছিল। ভাষণের মাধ্যমে জনগণকে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানানো হয় এবং প্রতিরোধ গড়ে তোলার বার্তা দেওয়া হয়।
জিয়াউর রহমান তার লেখায় আরও উল্লেখ করেন, ২৫ মার্চের গণহত্যার পরপরই সশস্ত্র বিদ্রোহের পরিস্থিতি তৈরি হয়। সেই সময়ে রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছিল বলেও তিনি উল্লেখ করেন। পাশাপাশি তিনি ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের নির্বাচন এবং ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনের ধারাবাহিক রাজনৈতিক সংগ্রামের কথাও তুলে ধরেন, যা বাঙালি জাতির স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে ক্রমে শক্তিশালী করে তোলে।
উল্লেখযোগ্য একটি বিষয় হলো, সেই লেখায় জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘জাতির জনক’ হিসেবেও উল্লেখ করেছিলেন। ইতিহাসবিদদের মতে, এই উল্লেখটি স্বাধীনতা সংগ্রামের সময়কার রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল।
বিশ্লেষকদের মতে, মুক্তিযুদ্ধের সময়কার লেখা, বক্তব্য ও দলিলগুলো সেই সময়ের রাজনৈতিক ও সামরিক বাস্তবতা বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবে বিবেচিত হয়। জিয়াউর রহমানের ওই লেখাটিও তেমন একটি দলিল, যেখানে ৭ মার্চের ভাষণের প্রভাব ও তাৎপর্যের একটি সমসাময়িক দৃষ্টিভঙ্গি উঠে এসেছে।
৭ মার্চের ভাষণ আজও বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম প্রেরণার উৎস। সময়ের ব্যবধানে এর ব্যাখ্যা ও মূল্যায়ন নানা দৃষ্টিকোণ থেকে করা হলেও একটি বিষয়ে ঐকমত্য রয়েছে—এই ভাষণ বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতার পথে এগিয়ে যাওয়ার সাহস, আত্মবিশ্বাস এবং সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছিল।
মন্তব্য করুন