আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ দল ও সহযোগী সংগঠনের সাত শীর্ষ নেতাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পর রায় ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। আওয়ামী লীগপন্থি বিভিন্ন ব্যক্তি ও সমর্থক রায় প্রত্যাখ্যান করে অতীতের রাজনৈতিক বিচার, কারাবরণ ও নিপীড়নের ইতিহাস সামনে আনছেন। তাদের বক্তব্য, কারাগার কিংবা মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়ে রাজনৈতিক আদর্শ ও সংগ্রামকে থামিয়ে দেওয়ার নজির ইতিহাসে খুব কমই রয়েছে।
গত ১৫ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ ওবায়দুল কাদেরসহ সাতজনকে ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ড দেন। অন্য ছয়জন হলেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান। সাতজনের অনুপস্থিতিতেই বিচার সম্পন্ন হয়। তাদের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবীরা মামলায় অংশ নেন।
ইতিহাস সামনে এনে ‘দমে না যাওয়ার’ বার্তা
রায়ের পর আওয়ামী লীগপন্থিদের বক্তব্য ও প্রতিক্রিয়ায় বারবার উঠে আসছে ইতিহাস। বিশেষ করে শেখ মুজিবুর রহমানের দীর্ঘ কারাজীবন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা এবং পাকিস্তান আমলে তার বিরুদ্ধে পরিচালিত বিচারপ্রক্রিয়ার প্রসঙ্গ টেনে বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে রাজনৈতিক তুলনা করা হচ্ছে।
বিশ্ব রাজনীতির উদাহরণ হিসেবে দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী নেতা নেলসন ম্যান্ডেলার দীর্ঘ কারাবাসের কথাও সামনে আনা হচ্ছে। এসব ঘটনার ঐতিহাসিক ও আইনি প্রেক্ষাপট বর্তমান মামলার চেয়ে আলাদা হলেও আওয়ামী লীগপন্থিদের রাজনৈতিক বক্তব্যের মূল কথা হচ্ছে, কঠোর সাজা বা কারাবরণ কোনো রাজনৈতিক আন্দোলনের সমাপ্তি নিশ্চিত করে না।
শেখ হাসিনার পর সাত শীর্ষ নেতা
এর আগে ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাকে ২০২৪ সালের আন্দোলন দমনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। শেখ হাসিনা ওই রায় প্রত্যাখ্যান করে বিচারকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও পক্ষপাতদুষ্ট বলে দাবি করেছিলেন।
এর প্রায় ১০ মাস পর ওবায়দুল কাদেরসহ সাত নেতার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় এলো। ট্রাইব্যুনালের রায়ে ওবায়দুল কাদের, বাহাউদ্দিন নাছিম, মোহাম্মদ আলী আরাফাত, শেখ ফজলে শামস পরশ ও মাইনুল হোসেন খান নিখিলের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের ৫০ শতাংশ বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের ২৯ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দেন। রাষ্ট্রপক্ষের দাবি ছিল, অভিযুক্তরা জুলাই আন্দোলন দমনে উসকানি, নির্দেশনা, ষড়যন্ত্র এবং সহিংসতায় ভূমিকা রেখেছিলেন। অন্যদিকে রাষ্ট্রনিযুক্ত আসামিপক্ষের আইনজীবীরা রায়ের পর জানান, তারা সাক্ষীদের জেরা ও যুক্তিতর্কের মাধ্যমে আসামিদের খালাসের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন। দুই আইনজীবীই রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
রায় ঘিরে বিপরীত রাজনৈতিক অবস্থান
রাষ্ট্রপক্ষ রায়টিকে জুলাই আন্দোলনের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ড ও মানবতাবিরোধী অপরাধের জবাবদিহির অংশ হিসেবে দেখছে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগপন্থি মহলে বিচারপ্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে এবং রায়কে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে। রায়ের প্রতিবাদে ১৫ সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে আওয়ামী লীগপন্থি আইনজীবীদের একটি অংশ নীরব কর্মসূচিও পালন করেন।
রায় তাই শুধু আদালতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। এটি এখন রাজনৈতিক বক্তব্য, পাল্টা বক্তব্য এবং ইতিহাসের ভিন্ন ব্যাখ্যার অংশ হয়ে উঠেছে। আওয়ামী লীগপন্থিদের প্রতিক্রিয়ায় যে বার্তাটি সবচেয়ে বেশি সামনে আসছে তা হলো, মৃত্যুদণ্ডের রায়কে তারা রাজনৈতিক সংগ্রামের সমাপ্তি হিসেবে দেখছেন না। বরং অতীতের ইতিহাস টেনে বর্তমান সংকটের মধ্যেও ‘দমে না যাওয়ার’ বার্তা দিচ্ছেন তারা।
মন্তব্য করুন