নিজস্ব প্রতিবেদক
পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারের সাম্প্রতিক ঢাকা সফর ঘিরে নতুন করে আলোচনার ঝড় উঠেছে। সফরে এসে সাংবাদিকদের প্রশ্নে দার দাবি করেন, একাত্তরের গণহত্যা প্রসঙ্গে এরই মধ্যে দুই দফায় মীমাংসা হয়েছে। একইসঙ্গে তিনি বাংলাদেশকে “হৃদয় পরিষ্কার করে” অতীত ভুলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।
তবে তার এ বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। রাজনৈতিক অঙ্গনেও শুরু হয় বিতর্ক। সাধারণ মানুষ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানালেও, দারের সফরের পর পাকিস্তানপন্থী দল জামায়াত ইসলাম একাত্তরের গণহত্যার দায় আড়াল করতে সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
মুক্তিযুদ্ধের আলোচনায় সন্ত্রাসী হামলা
আজ বৃহস্পতিবার (২৮ আগস্ট) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে “আমাদের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং বাংলাদেশের সংবিধান” শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, আইনজীবী ও মুক্তিযোদ্ধাদের অংশগ্রহণে আয়োজিত এ সভায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, সংবিধানের শ্রেষ্ঠত্ব ও ইতিহাসের গুরুত্ব তুলে ধরা হচ্ছিল।
কিন্তু হঠাৎই লাঠিসোটা হাতে জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা সভাস্থলে হামলা চালায়। তারা হাতাহাতি, ভাঙচুর করে সভা ভেঙে দেয় এবং আলোচনার কার্যক্রম রুদ্ধ করে। এ ঘটনায় মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রবীণ নেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা লতিফ সিদ্দিকীকে উল্টো পুলিশ আটক করে। এ ঘটনায় দেশব্যাপী ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে।
মুক্তিযোদ্ধাদের লাঞ্ছিতকরণ ও দ্বিচারিতা
এটি প্রথম ঘটনা নয়। এর আগে ৫ আগস্ট জামায়াতের দেশবিরোধী কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে শিবির কর্মীদের হাতে হামলার শিকার হন মুক্তিযোদ্ধা ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান। পরে বিএনপি তাকে পদ থেকে তিন মাসের জন্য স্থগিত করে, যা পর্যবেক্ষকদের মতে জামায়াতকে খুশি করার কৌশল।
অন্যদিকে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সম্প্রতি এক টেলিভিশন টকশোতে সরাসরি পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নেন। তিনি বলেন, “গণহত্যার জন্য কোনো দেশই ক্ষমা চায়নি।” এর মাধ্যমে তিনি মুক্তিযুদ্ধকে খাটো করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
পাকিস্তানি প্রভাব ও নতুন করে সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা
পাঁচই আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর থেকে বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্ক নতুনভাবে উষ্ণ হওয়ার ইঙ্গিত মিলছে। পাকিস্তানের বাণিজ্যমন্ত্রী জাম কামাল খানের সফরের পর পরই ঢাকায় আসেন ইসহাক দার। তার সফরে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এবং জামায়াত নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, পাকিস্তান নতুন করে বাংলাদেশে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে। কারণ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—বিএনপি ক্ষমতায় গেলে পাকিস্তানের জন্য ভারতকে অস্থিতিশীল করা সহজ হয়। ২০০৪ সালের কুখ্যাত ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলার প্রমাণও সে দিকেই ইঙ্গিত করে।
পাকিস্তানি প্রচারণা ও জামায়াতের সক্রিয়তা
দারের সফরের আগে পাকিস্তানের কয়েকটি গণমাধ্যম বাংলাদেশকে পুনরায় পাকিস্তানের অংশ হিসেবে উল্লেখ করে প্রবন্ধ প্রকাশ করে। মুক্তিযুদ্ধকে “ভারতীয় ষড়যন্ত্র” হিসেবে তুলে ধরে যুদ্ধাপরাধ অস্বীকারের অপচেষ্টা চালানো হয়।
অন্যদিকে বাংলাদেশে জামায়াত ও শিবিরও সরব হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জামায়াতকে প্রথমবারের মতো সমাবেশের অনুমতি দেওয়ায় ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। একই সঙ্গে ঢাবি ক্যাম্পাসে যুদ্ধাপরাধীদের আড়াল করে প্রদর্শনী করার ঘটনাও তীব্র সমালোচিত হয়।
উদ্বেগ ও ষড়যন্ত্রের আশঙ্কা
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তান, জামায়াত ও শিবিরের নতুন করে সক্রিয়তা একাত্তরের চেতনাকে ভূলুণ্ঠিত করার অপচেষ্টা। সরকারের নীরব ভূমিকা এ উদ্বেগকে আরও ঘনীভূত করছে। স্বাধীনতার ৫৪ বছর পর আবারও বাংলাদেশকে পাকিস্তানের মতো করে গড়ে তোলার এক ভয়াবহ ষড়যন্ত্র চলছে—এমন শঙ্কাই এখন সর্বত্র ভর করছে।
মন্তব্য করুন