অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধনকে ঘিরে সাম্প্রতিক একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তাঁকে লক্ষ্য করে পানি ছোড়া, কটূক্তি এবং ‘জুলাই যোদ্ধা’ পরিচয় নিয়ে বিদ্রূপের ঘটনায় একদিকে নিন্দা জানানো হচ্ছে, অন্যদিকে আওয়ামী লীগপন্থী মহলের একটি অংশ প্রশ্ন তুলছে, গত দুই বছরে সংঘটিত সহিংসতা, রাজনৈতিক প্রতিশোধ, বাড়িঘর ভাঙচুর, কর্মসংস্থান হারানো, নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের অভিযোগের সময় সংস্কৃতি অঙ্গনের পরিচিত মুখগুলো কোথায় ছিলেন?
এই বিতর্কের একটি বড় অংশ এখন ‘প্রতিবাদের নৈতিকতা’ ও ‘নীরবতার দায়’, এই দুই প্রশ্নকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন প্রতিক্রিয়ায় বলা হচ্ছে, বাঁধনের ওপর পানি ছোড়া বা ব্যক্তিগতভাবে হেনস্তা করা সমর্থনযোগ্য নয়। তবে একই সঙ্গে অনেকে দাবি করছেন, এমন প্রতিক্রিয়ার পেছনে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা রাজনৈতিক ক্ষোভ, হতাশা এবং ব্যক্তিগত ক্ষত কাজ করতে পারে।
কেউ লিখছেন, রাজনৈতিক পালাবদলের পর বহু মানুষ দেশ ছেড়েছেন, কেউ পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছেন, কারও বাড়িঘর বা ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কেউ কর্মসংস্থান হারিয়েছেন। আবার কেউ বলছেন, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে হয়রানি, হামলা, গ্রেপ্তার এবং সামাজিক অপমানের অভিজ্ঞতা অনেকের মনে গভীর ক্ষোভ তৈরি করেছে।
এই ক্ষোভ থেকেই একটি প্রশ্ন বারবার সামনে আনা হচ্ছে, যারা আজ প্রকাশ্যে হেনস্তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছেন, তারা কি অতীতের সহিংসতা ও প্রতিহিংসার বিরুদ্ধেও একইভাবে কথা বলেছেন?
আলোচনায় ধানমন্ডি ৩২ নম্বর, রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ওপর হামলা, ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে সহিংসতার অভিযোগ, আটক ব্যক্তিদের চিকিৎসা পরিস্থিতি, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে চাকরি হারানোর অভিযোগ এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া ব্যক্তিত্বকে ঘিরে প্রতিক্রিয়ার প্রসঙ্গও উঠে আসছে।
সমালোচকদের ভাষ্য, সংস্কৃতি অঙ্গনের অনেক ব্যক্তি আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা, কাজের ক্ষেত্র ও সামাজিক অবস্থান পেয়েছেন। কিন্তু রাজনৈতিক পালাবদলের পর আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা, বাড়িঘর ভাঙচুর বা নিপীড়নের অভিযোগের সময় তাদের অনেককে প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করতে দেখা যায়নি, এমন অভিযোগও তুলছেন অনেকে।
অন্যদিকে, বাঁধনের সমর্থকেরা বলছেন, কোনো ব্যক্তির অতীত রাজনৈতিক অবস্থান বা নীরবতা তাকে হেনস্তা করার বৈধতা দিতে পারে না। মতভিন্নতা থাকলেও শারীরিক বা মৌখিক আক্রমণকে স্বাভাবিক করা উচিত নয়।
ফলে পুরো বিতর্কটি এখন কেবল একজন অভিনেত্রীকে ঘিরে সীমাবদ্ধ নেই। এটি আরও বড় একটি রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রশ্নে রূপ নিয়েছে, সহিংসতার বিরুদ্ধে অবস্থান কি সবার ক্ষেত্রে সমান হবে, নাকি রাজনৈতিক পরিচয় অনুযায়ী প্রতিবাদের ভাষা বদলে যাবে?
বর্তমান আলোচনায় সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে একটি বিষয়, পানি ছোড়া বা হেনস্তার ঘটনাকে নিন্দা করা যেমন জরুরি, তেমনি রাজনৈতিক সহিংসতার অভিযোগে নীরবতা, নির্বাচিত প্রতিবাদ এবং দ্বৈত মানদণ্ড নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই বিতর্ক তাই শুধু বাঁধনকে নিয়ে নয়। বরং কে কখন প্রতিবাদ করেন, কার জন্য করেন, আর কার জন্য নীরব থাকেন, সেই বৃহত্তর নৈতিক ও রাজনৈতিক প্রশ্নকেই সামনে এনে দিয়েছে।
মন্তব্য করুন