নিজস্ব প্রতিবেদক
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশজুড়ে যে অস্থিতিশীলতা শুরু হয়, তার কেন্দ্রে ছিল সেনাবাহিনীর বিতর্কিত ভূমিকা। সরকার পতনের পরপরই সেনাপ্রধান ওয়াকার উজ্জামান জাতির উদ্দেশে ঘোষণা দেন যে তিনি দেশের সার্বিক নিরাপত্তার দায়িত্ব নিচ্ছেন। তবে ঘোষণার বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন—রাজধানীসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল থেকে সেনাবাহিনী নিজ নিজ অবস্থান ত্যাগ করে, যা ছিল এক ধরনের “স্ট্যান্ড-ডাউন” নির্দেশ।
পরিকল্পিত নিরাপত্তা শূন্যতা ও সহিংসতার বিস্তার
এই সেনা প্রত্যাহারের ফলেই যাত্রাবাড়ী থানাসহ বিভিন্ন স্থানে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। যাত্রাবাড়ীতে পুলিশের ওপর হামলায় প্রাণ হারান ৪৩ জন পুলিশ সদস্য। এরপর আক্রমণ হয় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়িতে—যেখানে আগুন দেওয়া হয় এবং তার ম্যুরাল ভাঙচুর করা হয়। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে সেনাবাহিনীর কিছু সদস্যকে সরাসরি এই ঘটনায় যুক্ত দেখা গেছে।
জঙ্গিদের মুক্তি
নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের প্রধান মুফতি জসীম উদ্দিন রাহমানী ২০২৪ সালের ২৬ আগস্ট সকাল সোয়া ১১টায় গাজীপুরের কাশিমপুর হাই-সিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। তিনি ২০১৩ সাল থেকে কারাবন্দি ছিলেন এবং ব্লগার রাজীব হায়দার হত্যা মামলায় পাঁচ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছিলেন। তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইন, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনসহ মোট চারটি মামলা ছিল। তাকে কারাগার থেকে মুক্ত করে, সেনাবাহিনীর গাড়িতে করেই জনসমক্ষে হাজির করা হয়।
বঙ্গবন্ধুর বাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া ও সংখ্যালঘুদের ওপর বর্বর হামলা
২০২৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি উগ্রপন্থীরা বুলডোজার দিয়ে ধ্বংস করে ধানমন্ডি ৩২ নম্বর বাড়ি। সেনাবাহিনী ঘটনাস্থলে থাকলেও কোনো হস্তক্ষেপ করেনি। এই সময় সারাদেশে আওয়ামী লীগ কার্যালয় ও নেতাকর্মীদের ওপর ধারাবাহিক হামলা চলে। পাশাপাশি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর চালানো হয় নির্মম আক্রমণ—বিশেষত গোপালগঞ্জ, বরিশাল, সুনামগঞ্জ ও নীলফামারীতে। সেনাবাহিনী উপস্থিত থাকলেও কোনো দৃশ্যমান প্রতিরোধ করেনি, বরং কখনও কখনও স্থানীয় প্রতিরোধ গড়ে তোলা পুলিশ ও জনতাকে বাধা দেয়।
এনসিপির পদযাত্রা, গণহত্যা ও সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ক্র্যাকডাউন
১৬ জুলাই গোপালগঞ্জে এনসিপির ‘পদযাত্রা’ চলাকালে সাধারণ মানুষের প্রতিবাদে সেনাবাহিনী সরাসরি গুলি চালায় এবং এনসিপি নেতাদের নিরাপত্তা দিয়ে সরিয়ে নেয়। এছাড়া রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে গ্রেফতার করা হয় হিন্দু ধর্মীয় নেতা চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারীকে। এর প্রতিবাদ দমন করতে সেনাবাহিনী সংখ্যালঘু ধর্মীয় নেতাদের বাড়িতে অভিযান চালায়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সেনাবাহিনীর এই নিস্ক্রিয়তা নিছক কাকতালীয় নয়—বরং কোনো অঘোষিত রাজনৈতিক বা আন্তর্জাতিক সমঝোতার ইঙ্গিত দেয়। প্রশ্ন উঠছে, সেনাপ্রধান ওয়াকার উজ্জামান কি বাইরের শক্তির সঙ্গে কোনো গোপন চুক্তির আওতায় ছিলেন?
বিশ্লেষকেরা মনে করেন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। অনেকের ধারণা, মার্কিন প্রশাসনের সহায়তায় ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে ‘প্রক্সি নেতা’ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। তাকে জাতিসংঘ মহাসচিবের পদে বসানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে পশ্চিমা স্বার্থ রক্ষার কাজে লাগানো হচ্ছে বলে দাবি রয়েছে।
বিশ্লেষকেরা সতর্ক করে বলছেন, যদি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন না হয়, তবে দেশের সার্বভৌমত্ব ও অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা ভয়াবহ ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। এই পরিস্থিতিতে দেশের জনগণকেই হতে হবে সজাগ ও সোচ্চার।
মন্তব্য করুন