Insight Desk
প্রকাশ : Jan 31, 2026 ইং
অনলাইন সংস্করণ

কারাগারে চিকিৎসাহীনতায় আওয়ামী লীগ নেতার মৃত্যু: রাষ্ট্রীয় নিষ্ঠুরতার আরেকটি নির্মম অধ্যায়

নিজস্ব প্রতিবেদক| চট্টগ্রাম

নামাজ আদায়ের উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বের হয়েছিলেন প্রায় ৮০ বছর বয়সী এক প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুর রহমান মিয়া। অসুস্থ শরীর, ক্যান্সার আক্রান্ত ফুসফুস, শ্বাসকষ্টে ভোগা একজন মানুষ—যিনি হাঁটতেও পারতেন না। অথচ সেই দিনই তিনি পুলিশের হাতে আটক হন এবং শুরু হয় তার জীবনের শেষ তিন মাসের যন্ত্রণাময় অধ্যায়।

থানায় নেওয়ার পর তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। গুরুতর অসুস্থতা থাকা সত্ত্বেও তিন মাস ধরে তিনি জামিন থেকে বঞ্চিত থাকেন, পাশাপাশি বঞ্চিত হন প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকেও। শেষ পর্যন্ত কারাগারের ভেতরেই স্ট্রোক করেন এবং হাসপাতালে নেওয়ার পর সেখানেই তার মৃত্যু হয়।

আব্দুর রহমান মিয়া ছিলেন চট্টগ্রাম নগরের ২৪ নম্বর উত্তর আগ্রাবাদ ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি। তিনি কোনো প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নন, ছিলেন স্থানীয় পর্যায়ের একজন সাধারণ রাজনৈতিক কর্মী। দীর্ঘদিন ধরে তিনি ফুসফুস ক্যান্সারসহ একাধিক মারাত্মক শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন।

তার পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তারের দিনই তার অবস্থা ছিল সংকটাপন্ন। ছেলে বলেন, “বাবা তখন ঠিকভাবে হাঁটতে পারতেন না, শ্বাস নিতে কষ্ট হতো। সেদিন যদি তাকে হাসপাতালে নেওয়া হতো, হয়তো আজ তিনি বেঁচে থাকতেন।”

তিন মাসে না জামিন, না মানবিকতা

 কারাগারে পাঠানোর পর একাধিকবার জামিন আবেদন করা হয়, কিন্তু প্রতিবারই তা বাতিল হয়। আইনজীবীরা বলেন, একজন ক্যান্সার আক্রান্ত প্রবীণ মানুষের ক্ষেত্রে মানবিক বিবেচনার সুযোগ থাকলেও সেটি প্রয়োগ করা হয়নি।

কারা কর্তৃপক্ষের একটি সূত্র জানায়, তাকে মাঝেমধ্যে মেডিকেল ওয়ার্ডে নেওয়া হলেও ক্যান্সারের মতো জটিল রোগের জন্য প্রয়োজনীয় কোনো বিশেষায়িত চিকিৎসা দেওয়া হয়নি। কিছু সময় পর তাকে আবার সাধারণ বন্দী ওয়ার্ডে ফিরিয়ে আনা হতো।

একজন সিনিয়র আইনজীবীর ভাষায়, “এই দেশে গুরুতর মামলার আসামিরাও জামিন পান। অথচ একজন মৃত্যুপথযাত্রী ক্যান্সার রোগী তিন মাস ধরে কারাগারে পড়ে রইলেন। এটা মানবিকতার চরম ব্যর্থতা।”

স্ট্রোকের পরও মুক্তির সুযোগ মেলেনি

তিন দিন আগে কারাগারে থাকা অবস্থায় তিনি স্ট্রোক করেন। পরে তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু মৃত্যুর আগ পর্যন্তও তার মুক্তির কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি।

চিকিৎসকদের মতে, তার ক্যান্সার ফুসফুস ছাড়িয়ে ইতোমধ্যে মস্তিষ্কে ছড়িয়ে পড়েছিল।

কারা কর্তৃপক্ষ এই ঘটনাকে “স্বাভাবিক মৃত্যু” বলে উল্লেখ করলেও পরিবার ও মানবাধিকারকর্মীরা একে রাষ্ট্রীয় অবহেলার ফল হিসেবে দেখছেন।

একজন মানবাধিকারকর্মী বলেন, “কারাগারে চিকিৎসার অভাবে কারও মৃত্যু হলে সেটাকে স্বাভাবিক বলা যায় না। এটি সরাসরি রাষ্ট্রের দায়িত্বহীনতার প্রতিফলন।”

রাজনৈতিক হয়রানি ও কারাগারে মৃত্যুর ধারাবাহিক চিত্র

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সময়ে রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার বাড়ছে, কিন্তু মানবিক বিবেচনায় জামিন ও চিকিৎসার সুযোগ ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। বিষয়টি শুধু বিরোধী দল নয়, ক্ষমতাসীন দলের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে।

একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, “এই মৃত্যু প্রমাণ করে—এখন আইনের শাসনের চেয়ে ক্ষমতার শাসন বেশি কার্যকর হয়ে উঠছে। আপনি যত অসুস্থই হন, রাষ্ট্র চাইলে আপনাকে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিতে পারে।”

নামাজ থেকে কফিন—একটি নির্মম রাষ্ট্রীয় বাস্তবতা

তিন মাস আগে আব্দুর রহমান মিয়া মসজিদে নামাজ পড়তে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে থানায়, থানায় থেকে কারাগারে—আর শেষ পর্যন্ত পরিবারের কাছে ফিরে এসেছেন কফিনে।

এই ঘটনা শুধু একজন ব্যক্তির মৃত্যুর গল্প নয়; এটি একটি ভয়াবহ বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি—যেখানে একজন অসুস্থ প্রবীণ মানুষকে বাঁচার সুযোগ না দিয়ে রাষ্ট্রের উদাসীনতা তাকে ধীরে ধীরে মৃত্যুর কোলে ঠেলে দেয়।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

হাসিনার চেয়েও বিএনপি কে বেশি ভয় পাচ্ছে জামায়াত-এনসিপি :গোলাম

1

রামিসার রক্তে ক্ষুব্ধ দেশ, দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাইলেন মাশরাফ

2

মবের পর এবার হত্যাকাণ্ডকে বৈধতা দিল ইউনূসের প্রেস উইং

3

গ্যাঁড়াকলে ইউনূস, পলাতে চাইলেও মিলছে না অনুমতি

4

কূটনৈতিক স্থাপনায় হামলা, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ বিব্রত

5

ইউনূসের আশকারায় মবের রাজ হাসনাত, রুখবে কে?

6

সেনাবাহিনীতে আরও ৬ কর্মকর্তার রদবদল

7

হাতিয়ায় পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ১২ বছরের শিশুকে ধর্ষণের অ

8

বগুড়ায় পৈতৃক বাড়িতে আগুন: বিএনপিকে দায়ী করলেন পিনাকী

9

শেখ হাসিনার দেশে ফেরার সম্ভাবনা কিভাবে ত্বরান্বিত হলো?

10

মব–শাসনের রক্তাক্ত বাস্তবতা, বিষবৃক্ষের ফল কুড়াচ্ছে সমাজ

11

ন্যায়বিচারের ধ্বংসলীলা: ইউনূসের নির্দেশে দেশে বইছে ভুয়া মা

12

ফ্রান্সে অবস্থানরত ডা. পিনাকী ভট্টাচার্যের অনলাইন কার্যক্রমে

13

ধর্ম ব্যবসা থেকে ভোট ব্যবসা, জামায়াতে ইসলামীর আদর্শিক পতনের

14

পেরেকের কেজি ১২০, আর জনগণের ধৈর্য শূন্যের কোঠায়!

15

মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগে ইউনূসপন্থীদের, নি

16

নারী নিয়ে বিতর্কিত পোস্ট: সমালোচনায় জামায়াত আমির, পরবর্তীতে

17

সেনাবাহিনীকে দুর্বল করতে ইউনূস ব্রিগেডের নীলনকশা

18

দুই বছরেও উদ্ধার হয়নি ১,৩১১ আগ্নেয়াস্ত্র, বেহাত আড়াই লাখের ব

19

বিমানবাহিনীতে জঙ্গি নেটওয়ার্কের চেষ্টা? পেশোয়ার থেকে এল নতুন

20