Insight Desk
প্রকাশ : Jul 20, 2025 ইং
অনলাইন সংস্করণ

গোপালগঞ্জে গুলি চালাল সেনাবাহিনী-পুলিশ, মামলা হচ্ছে আ.লীগ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে!

নিজস্ব প্রতিবেদক

গোপালগঞ্জে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) একটি সমাবেশ ও পদযাত্রা ঘিরে প্রাণঘাতী সংঘর্ষে কমপক্ষে ৭ জন নিহত হয়েছেন, আহত হয়েছেন অন্তত অর্ধশতাধিক। সেনাবাহিনী ও পুলিশের গুলিতে এই প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে বলে সরকার নিজেই স্বীকার করেছে। সংঘর্ষের জেরে পুরো শহরে এখনও চলছে ১৪৪ ধারা, টানা তিন দিন ধরে জারি রয়েছে কারফিউ।

গত বুধবার দুপুরে গোপালগঞ্জ পৌরপার্কে এনসিপির শান্তিপূর্ণ সমাবেশ শেষে গাড়িবহর মাদারীপুরের পথে রওনা দেয়। পথিমধ্যে স্থানীয়দের বিক্ষোভের মুখে পড়ে বহরটি। এসকে সালেহিয়া মাদ্রাসার কাছে পৌঁছালে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। সেনা ও পুলিশের গুলিতে সাধারণ পথচারীরাও প্রাণ হারান বলে জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা।

নিহতরা ‘অরাজনৈতিক’, মরদেহের হয়নি ময়নাতদন্ত

নিহতদের পরিবার দাবি করেছে, তাদের প্রিয়জনরা কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। নিহত রিকশাচালক রমজান মুন্সী, কলেজছাত্র দীপ্ত সাহা, কিশোর রমজান কাজী, সোহেল রানা মোল্লা ও ইমন তালুকদার – এদের কারও বিরুদ্ধে আগে কোনো রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

অভিযোগ রয়েছে, নিহতদের মরদেহের ময়নাতদন্তও করা হয়নি। যদিও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে, বিলম্বে হলেও ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করা হবে। তবে দীপ্ত সাহার মরদেহ দাহ করে ফেলার পর কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, তা পরিষ্কার নয়।

সেনাবাহিনীর গুলির কথা স্বীকার, মামলা হচ্ছে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে

স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী রোববার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের জানান, “যেখানে যে পরিস্থিতি, সেখানে সেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এই বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট, সেনাবাহিনী ও পুলিশই গুলি চালিয়েছে।

তবে অবাক করার মতো বিষয় হলো—যেখানে গুলি চালিয়ে প্রাণনাশ করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, সেখানে দায় দেওয়া হচ্ছে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে। সংঘর্ষের চারদিন পর পর্যন্ত অন্তত চারটি হত্যা মামলায় আসামি করা হয়েছে অজ্ঞাতনামা ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ জন আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীকে।

গোপালগঞ্জ সদর থানার ওসি মির মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান রোববার রাতে এসব মামলার তথ্য নিশ্চিত করেছেন। আরও একটি হত্যা মামলার প্রস্তুতি চলছে। তবে ওই সংঘর্ষের ঘটনায় প্রথম চার মৃত্যুর ঘটনার চার দিনের মাথায় চারটি হত্যা মামলা করা হয়েছে। প্রতি মামলাতেই আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের অজ্ঞাতপরিচয় ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ নেতাকর্মীসহ দুষ্কৃতিকারীকে আসামি করা হয়েছে।

পুলিশ সূত্র জানায়, গোপালগঞ্জ সদর থানার এসআই আইয়ুব হোসেন বাদী হয়ে কিশোর রমজান কাজী হত্যার ঘটনায় মামলা করেছেন। এজাহারে বলা হয়েছে, এনসিপি নেতাকর্মীরা গত বুধবার দুপুরে শান্তিপূর্ণ সমাবেশ শেষে পৌর পার্ক থেকে দুপুরে মাদারীপুরের উদ্দেশে গাড়িবহর নিয়ে রওনা দেন। তারা গোপালগঞ্জ শহরের এসকে সালেহিয়া মাদ্রাসার কাছে পৌঁছালে ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাসহ দুষ্কৃতিকারীরা গাড়িবহরে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে হামলা চালায়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের বাধা দেয়। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর গুলি চালায়। এ সময় রমজান কাজী (১৭) গুলিবিদ্ধ হয়ে মারাত্মক আহত হন। স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে গোপালগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

অপর তিন মামলার বর্ণনা ও আসামির সংখ্যা একইরকম। দীপ্ত সাহার (২৭) মৃত্যুর ঘটনায় সদর থানার এসআই শামীম হোসেন বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা করেছেন। এজাহারে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগ ও সহযোগি সংগঠনের নেতাকর্মীসহ দুষ্কৃতিকারীরা দুপুর আড়াইটার দিকে সেনাবাহিনী ও পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। এ সময় কলেজ মসজিদের পাশে মিলন ফার্মেসীর সামনের দীপ্ত সাহা গুরুতর আহত হন। হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

সদর থানার এসআই আবুল কালাম আজাদ বাদী হয়ে সোহেল রানা মোল্লা (৩০) হত্যার ঘটনায় মামলা করেন। এজাহারে বলা হয়েছে, লঞ্চ ঘাট এলাকায় আ্ওয়ামী লীগ ও দুষ্কৃতকারীদের গুলিতে সোহেল রানা আহত হন। তাকে হাসপাতালে নিলে মৃত ঘোষণা করা হয়। একইদিন লঞ্চ ঘাট এলাকার পুরাতন সোনালী ব্যাংকের সামনে আ্ওয়ামী লীগসহ দুষ্কৃতিকারীদের গুলিতে ইমন তালুকদার (১৭) নিহত হ্ওয়ার ঘটনায় হত্যা মামলা করেছেন এসআই শেখ মিজানুর রহমান। দুই মামলাতেই ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ জনকে আসামি করা হয়েছে।

এ ছাড়া বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান রিকশাচালক রমজান মুন্সী (৩২)। এই ঘটনাতেও একটি হত্যা মামলা হবে। রমজান মুন্সী ছাড়া অপর চারজনের মরদেহের সুরতহাল প্রতবেদন তৈরি বা ময়নাতদন্ত করা হয়নি। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানিয়েছে, বিলম্বে হলেও ময়নাতদন্ত করা হবে। যদিও দীপ্ত সাহার লাশ দাহ করে ফেলায় সেক্ষেত্রে কী সিদ্ধান্ত হবে জানা যায়নি।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, এখানে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, যেখানে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর গুলিতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে, সেখানে দায় চাপানো হচ্ছে একটি রাজনৈতিক দলের ওপর। এটা বিচার প্রক্রিয়া এবং ন্যায়বিচারের প্রশ্নে ভয়ানক ইঙ্গিত দেয়। ময়নাতদন্ত না করে মরদেহ দাফন কিংবা দাহ করা হলে ভবিষ্যতে এই ঘটনার বিচার প্রক্রিয়াও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে।”

তারা আরও বলছেন, সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেই গুলির কথা স্বীকার করেছেন। তাহলে মামলা কেন অন্যদিকে ঘোরানো হচ্ছে, সেটা খতিয়ে দেখা জরুরি।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

প্রতি মিনিটে ১২ ভোট? ইসির পরিসংখ্যান ঘিরে প্রশ্ন

1

ধানের শীষের মনোনয়ন না পেলে, স্বতন্ত্র পার্থী হিসেবে নির্বাচন

2

ময়মনসিংহে রোজাদারের মাঝে ইফতার বিতরণ, ইফতার ও দোয়া মাহফিল

3

বিতর্কিত রাকসু নির্বাচন: মাসুদ হত্যা মামলার প্রধান আসামি সাল

4

ক্ষমতার দাপটে খুনোখুনি এখন রাউজানের নিত্যদিনের সঙ্গী

5

পেকুয়ার কৃতি সন্তান ও জনপ্রিয় যুবলীগ নেতা মোঃ আজমগীর'কে পিবি

6

উন্নয়নের নামে ব্যক্তি ও পরিবারকেন্দ্রিক নামকরণ: উন্নয়নের নাম

7

তারেক রহমান ও মির্জা আব্বাস দুটি আসন পাচ্ছে ঢাকায়

8

যোগ্যতায় রিটেন পাস করতে হবে, ভাইভায় ইনশাআল্লাহ সাহায্য করবো’

9

নারী কেলেঙ্কারি নিয়ে নিশ্চুপ বিতর্কিত মার্কিন নাগরিক আলী রিয়

10

তিন বাহিনীকে নিয়ে জাতির সঙ্গে ইউনুসের প্রেস উইংয়ের মিথ্যাচ

11

ইউনূসের ফাঁদে পা দিল বিএনপি

12

এক সময় মানবাধিকারের মুখপাত্র আসদুজ্জামান এখন মবের হোতা?

13

এসেনশিয়াল ড্রাগসে এমডি পদ ঘিরে ৩০ কোটি টাকার চুক্তির অভিযোগ

14

গণভোট, রাষ্ট্রীয় পক্ষপাত এবং অবৈধ ও অসাংবিধানিক ইউনুস সরকার:

15

খলিল-তারেকের গোপন বৈঠক: করিডোর ইস্যুর আড়ালে দেশ ধ্বংসের নীলন

16

অপকর্ম আড়ালেই ভরসা “গুজব যন্ত্রে”: সক্রিয় ইউনূস গোষ্ঠী

17

ভর্তি জালিয়াতির অভিযোগে ঘেরা শিবিরপন্থি সাব্বির রাকসুর এজিএস

18

গণভোটের অংশগ্রহণ নিয়ে প্রশ্ন

19

ইউনূস সরকার মানবাধিকার রক্ষায় ব্যর্থ : এইচআরডব্লিউ

20