Insight Desk
প্রকাশ : Jul 13, 2025 ইং
অনলাইন সংস্করণ

শেষ ধাপে ইউনূসের মিশন, আলোচনায় ‘মাইনাস টু’

নিজস্ব প্রতিবেদক 

নির্বাচনের দাবিতে রাজপথ উত্তপ্ত করা বিএনপি এখন ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কৌশলগত ফাঁদে পড়েছে। ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলার আওতায় ইউনূস গং যে কেবল আওয়ামী লীগ নয়, বিএনপিকেও মাইনাস করতে চাইছে—তা ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। মার্কিন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বাংলাদেশের দুই প্রধান দলকে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করে ক্ষমতা কুক্ষিগত রাখার পথেই এগোচ্ছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, যার নেতৃত্বে রয়েছেন ইউনূস।

সম্প্রতি পুরান ঢাকায় মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনে যুবদলের দুই পক্ষের সহিংসতায় এক ভাঙাড়ির ব্যবসায়ী পাথরের আঘাতে নিহত হন। ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে শুক্রবার (১১ জুলাই) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েটসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করেন। সেখানেই বিএনপি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমানের বিরুদ্ধে অশালীন বক্তব্য ওঠে।

সাবেক এমপি ও সাংবাদিক গোলাম মাওলা রনি বলেন, তারেক রহমানকে নিয়ে যে অশ্লীল অশ্রাব্য স্লোগান দেয়া হচ্ছে তার পরিণতি ভালো হবে না। যারা টিনের চালে কাউয়া তারেক রহমান... কিংবা ১২৩৪ তারেক রহমানের পু... মার কিংবা চাঁদা দেই পল্টনে, চলে যায় লন্ডনে, চাঁদা লাগলে চাঁদা নে, আমার ভাইয়ের জীবন দে ইত্যাদি স্লোগানে যারা বুয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ রাজপথ কাঁপাচ্ছেন তাদের নেতাদেরকে নিয়ে যদি ছাত্রদল-যুবদল অনুরূপ স্লোগান দেয় তবে রাজনীতি কেবল স্লোগানে আবদ্ধ থাকবে না। খুর চাপাতি রামদা রগকাটা, কাঁটা বন্দুক গুলি বোমার অতীত ইতিহাস থেকে একে ৪৭ স্নাইপারের নয়া ঝন ঝনানী শুরু হবে। আর তাতে করে সব চেয়ে খুশি হবে তারা যারা দেশটাকে জঙ্গি বানিয়ে জাতিসংঘের শান্তি রক্ষী পাঠাতে চায়!

এদিকে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ঠাকুরগাঁওয়ের বাসার সামনে ভুয়া ভুয়া স্লোগান দিয়েছে কথিত শিক্ষার্থীরা। ঢাকায় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মিছিলে শোনা গেছে, হাসিনা গেছে যে পথে, খালেদাও যাবে সে পথে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গত জুনে লন্ডনে তারেক রহমানের সঙ্গে ইউনূসের বৈঠকের পর দেশজুড়ে বেড়ে গেছে ‘মব জাস্টিস’ বা দলবদ্ধ প্রতিশোধমূলক সহিংসতা। এতে জড়িয়ে পড়ছেন বিএনপি নেতাকর্মীরাও, যার ফলে দলটির ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত ১০ মাসে ২৫৩টি মব সহিংসতার ঘটনায় ১৬৩ জন নিহত এবং ৩১২ জন আহত হয়েছেন। শুধু ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে ৬৭টি গণপিটুনির ঘটনায় প্রাণ হারান ৬৭ জন, আহত হন আরও ১১৯ জন। ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৪৭৬ জন নারী ও শিশু, যাদের ২৯২ জনই ১৮ বছরের নিচে।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য মতে, ২০২৫ সালের প্রথম চার মাসেই দেশে ১ হাজার ২৪৬টি হত্যাকাণ্ড এবং নারী-শিশু নির্যাতনের ৯ হাজার ১০০টি মামলা হয়েছে। এসময়ে ডাকাতি ও দস্যুতার মামলার সংখ্যা ১ হাজার ১৩৯টি।

এমন প্রেক্ষাপটে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ, এনসিপি ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশকে দিয়ে পিআরও পদ্ধতিতে নির্বাচনের দাবি তুলিয়েছে ইউনূসপন্থীরা। বিএনপিকে ‘রাষ্ট্রবিরোধী’ ও ‘বিদেশি এজেন্ট’ বলে আখ্যা দিয়ে রাজনীতির মূলধারা থেকে সরিয়ে দিতে সক্রিয় ইউনূসপন্থী রাজনৈতিক শক্তি।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এনসিপি এককভাবে জনগণের সমর্থন আদায় করতে পারবে না—এটা বুঝেই বিএনপিকে আলোচনায় টেনে এনে চার্টারে স্বাক্ষর করিয়ে ইউনূস তার অনির্বাচিত শাসনকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করছেন।

এদিকে, বিএনপির ছাত্রসংগঠন ছাত্রদলেও দেখা যাচ্ছে ভাঙনের ছাপ। মিটফোর্ড ঘটনার পর অনেকেই পদত্যাগ করেছেন। এরমধ্যে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য পারভেজ রানা প্রান্ত ‘নৈতিকতা ও সাংগঠনিক দুর্বলতা’র কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেন। একইভাবে, আহসানউল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন এক নেতা, যিনি ফেসবুকে একটি আবেগঘন পোস্টের মাধ্যমে এ সিদ্ধান্ত জানান।

২০২৪ সালের জুলাই মাসেও বাংলাদেশ ছাত্রলীগ থেকে ১২৪ জন নেতা পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছিলেন। তখন শিবির সংশ্লিষ্টতা ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের অভিযোগ ওঠে। ছাত্রদল থেকেও শিবির সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৫ জন নেতাকর্মীকে সাংগঠনিক পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তবে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। 

সবমিলিয়ে, দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা, সহিংসতা ও দলীয় বিভক্তির মধ্যে ড. ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত শাসকচক্রের ‘মাইনাস টু’ কৌশল বিএনপি ও আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ রাজনীতিকে কোন পথে নিয়ে যাবে—তা এখন বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। এরইমধ্যে বাংলাদেশে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে জাতীয় নির্বাচন নিয়ে যে বিতর্ক দানা বেঁধেছে, তাতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি ও নিরাপত্তা ইস্যু। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার এখনও পর্যন্ত নির্দিষ্ট কোনো রোডম্যাপ ঘোষণা করেনি।

বাংলাদেশে নির্বাচন আয়োজন নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বাড়িয়ে তুলেছে জাতিসংঘের ঘোষিত তিন বছর মেয়াদী প্রকল্প "ব্যালট"। এর লক্ষ্য একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করা হলেও, বিশ্লেষকদের মতে, প্রকল্পটি বাস্তবিক অর্থে নির্বাচন প্রক্রিয়া বিলম্বিত করার পাঁয়তারা।

বিশ্লেষক ও কূটনৈতিক সূত্রের দাবি, এই অনিশ্চয়তা শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ফসল নয়, বরং একটি বৃহৎ আন্তর্জাতিক পরিকল্পনার অংশ। যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত এজেন্ডা বাস্তবায়নের লক্ষ্যেই অধ্যাপক ইউনূসের সরকারকে ক্ষমতায় বসানো হয়েছে। আর আমেরিকার এজেন্ডা বাস্তাবায়ন না হওয়া পর্যন্ত তিনি ক্ষমতা ছাড়বেন না। 
২০১৮ সালে মিয়ানমারে অং সান সু চির সরকার চীনের সঙ্গে কিয়াউকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্পে চুক্তি করে। এই চুক্তির পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র রাখাইন রাজ্যে অস্থিরতা সৃষ্টির পরিকল্পনায় নামে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা। পরবর্তী সময় রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নিধনযজ্ঞ, তাদের বাংলাদেশে স্থানান্তর এবং মানবিক করিডোর স্থাপনের পরিকল্পনা ছিল সেই মার্কিন কৌশলের অংশ। আর এ জন্য মার্কিনিদের দরকার চট্টগ্রাম বন্দরের নিয়ন্ত্রণও। এখন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সেই প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন করছে বলে। 
ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ড. ইউনূস হচ্ছেন বাংলাদেশের "অং সান সুচি"। যে সুচিকে মার্কিনিরা ক্ষমতায় এনেছিল চীনকে ঠেকাতে, কিন্তু পরে ব্যর্থ হলে তাকে সরিয়ে কারাবন্দি করে। এবার সেই একই মডেলে ইউনূসকে বসানো হয়েছে ক্ষমতায়। যদি মার্কিন স্বার্থ পূরণ না হয়, তাহলে তার ভবিষ্যৎও হবে সুচির মতো।
সূত্র বলছে, ড. ইউনূসকে জাতিসংঘ মহাসচিব বানানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বাইডেন প্রশাসন। বিনিময়ে তাকে ব্যবহার করা হচ্ছে এক উচ্চপর্যায়ের প্রক্সি যুদ্ধে, যার মূল লক্ষ্য—বাংলাদেশে অস্থিরতা সৃষ্টি, মিয়ানমারে বিদ্রোহীদের সহযোগিতা এবং চীনের "বেল্ট অ্যান্ড রোড" পরিকল্পনা ব্যাহত করা।

বিশ্লেষকেরা বলছেন,  বঙ্গোপসাগরের দখল, রোহিঙ্গা করিডোর এবং কৌশলগত বন্দর ব্যবহার ঘিরে বাংলাদেশ হয়ে উঠেছে চীন-যুক্তরাষ্ট্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার অন্যতম ক্ষেত্র। এই অবস্থায় একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন না হলে দেশের সার্বভৌমত্ব ও স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়তে পারে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান উইলসন সেন্টারের সাউথ এশিয়া ইনস্টিটিউটের পরিচালক মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে এগিয়ে নেওয়া কিংবা রাষ্ট্রগঠনে অর্থব্যয়ে তাদের আগ্রহ “নিতান্তই কম”।’

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

১০ মাসেই অনিয়ম-দুর্নীতির রেকর্ড গড়ল ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরক

1

খলিলুরে বিএনপিতে অস্বস্তি

2

মব–শাসনের রক্তাক্ত বাস্তবতা, বিষবৃক্ষের ফল কুড়াচ্ছে সমাজ

3

গ্যাঁড়াকলে ইউনূস, পলাতে চাইলেও মিলছে না অনুমতি

4

জুলাই সনদে সই করবে না গণফোরাম ও বামপন্থি চার দল

5

ভোট নয়—এবার বাঁচার লড়াই: সজীব ওয়াজেদ জয়

6

থানায় প্রশ্নপত্রের ট্রাংক খোলা: রাজশাহীতে এইচএসসির একটি প্রশ

7

বাংলাদেশে সহিংসতার মাধ্যমে সরকার পতনে সহায়তা করে জাতিসংঘ!

8

আইসিটির দুই প্রসিকিউটরের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ

9

শিক্ষা কাঠামোকে নষ্ট করে দেশ ধ্বংসে মেতেছে ইউনূস গং

10

মুক্তিযোদ্ধা ছিলাম — এই কথাটাই আজ নিষিদ্ধ করতে চাচ্ছে যারা

11

ট্রাম্পের বার্তায় কূটনৈতিক শুভেচ্ছা নাকি চাপের ইঙ্গিত?

12

চাঁদপুরে ঢাকাগামী শিক্ষকবাহী লঞ্চ আটকে দিল পুলিশ, আন্দোলন অব

13

প্রতি মিনিটে ১২ ভোট? ইসির পরিসংখ্যান ঘিরে প্রশ্ন

14

২০২৪–এর পর জামায়াত–শিবিরের নতুন সহিংস প্যাটার্ন: এমসি কলেজে

15

ইউনূস সরকারের ছত্রছায়ায় জঙ্গিবাদে শিশু-কিশোররাও, দেশে বাড়ছে

16

‘ছয় মাসের বেশি টিকবে না—এসব শুনতে শুনতে ১০ বছর কাটিয়ে দিলাম’

17

পরিবর্তন হলো মাধ্যমিক-উচ্চ মাধ্যমিকের শপথ

18

মিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা, হাজার ডলারের আক্রমণ আধুনিক যুদ্ধে

19

রাজপথে স্বতঃস্ফূর্ত মিছিল আওয়ামী লীগের, অবৈধ ইউনুস সরকারের প

20