আন্তর্জাতিক ডেস্ক
দক্ষিণ এশিয়ায় ক্রমবর্ধমান অস্থিতিশীলতার পেছনে মার্কিন কূটনৈতিক কৌশল এবং গোপন ক্ষমতাকাঠামোর (ডিপ স্টেট) সক্রিয় ভূমিকার অভিযোগ উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ, পাকিস্তান এবং নেপালে সহিংস আন্দোলনের ঘটনা এই অঞ্চলে মার্কিন প্রভাবের একটি নতুন কৌশলের ইঙ্গিত দেয়, যা অনেকের কাছে আরব বসন্তের পুনরাবৃত্তির মতো মনে হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে, বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী লক্ষ্য হতে পারে ভারতের রাজধানী দিল্লি।
মার্কিন-ভারত শুল্কবিরোধ, উত্তেজনার নতুন মাত্রা
শুল্কবিরোধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের দ্বন্দ্ব নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। মার্কিন বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিক সম্প্রতি ব্লুমবার্গ টিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন— “আগামী এক থেকে দুই মাসের মধ্যে ভারত বাধ্য হয়ে আবারও আলোচনার টেবিলে ফিরবে এবং ‘সরি’ বলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করতে চাইবে।” তাঁর এই মন্তব্যের পরপরই ভূ-রাজনীতিতে একের পর এক নাটকীয় পরিবর্তন ঘটতে থাকে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মধ্যে শুল্কবিরোধ সম্প্রতি নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। মার্কিন বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিক ব্লুমবার্গ টিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, “আগামী এক থেকে দুই মাসের মধ্যে ভারত বাধ্য হয়ে আলোচনার টেবিলে ফিরবে এবং ‘সরি’ বলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করতে চাইবে।” তার এই মন্তব্য ভারত-মার্কিন সম্পর্কে নতুন উত্তেজনার জন্ম দিয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রাশিয়া থেকে তেল আমদানির কারণে ভারতীয় পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন। এই পদক্ষেপ ভারতের রপ্তানি বাণিজ্যের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে। ফেডারেশন অফ ইন্ডিয়ান এক্সপোর্ট অর্গানাইজেশনস এই শুল্ককে “অত্যন্ত মর্মান্তিক” আখ্যা দিয়ে সতর্ক করে বলেছে, মার্কিন বাজারে ভারতীয় রপ্তানির ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই শুল্কের কারণে ভারতের রপ্তানি ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ হ্রাস পেতে পারে।
বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও নেপালে সাম্প্রতিক সহিংস আন্দোলনের পেছনে মার্কিন কূটনৈতিক হস্তক্ষেপের ছায়া রয়েছে। কার্নেগি এনডোমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের দক্ষিণ এশিয়া-বিষয়ক পরিচালক মিলান বৈষ্ণব বলেন, “মার্কিন শুল্কনীতি এবং কৌশলগত চাপ দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্যকে প্রভাবিত করছে। এই পদক্ষেপগুলো যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের কয়েক দশকের সম্পর্কে সবচেয়ে বড় চিড় ধরিয়েছে।”
তাইওয়ান-এশিয়া এক্সচেঞ্জ ফাউন্ডেশনের গবেষক সানা হাশমি মনে করেন, মার্কিন কৌশল দক্ষিণ এশিয়ায় অস্থিতিশীলতা তৈরি করছে, যার লক্ষ্য ভারতকে চাপে রাখা। তিনি বলেন, “ভারত-চীন সম্পর্কের উষ্ণতা এবং রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য মার্কিন স্বার্থের বিরুদ্ধে গেছে। এটি মার্কিন নীতির প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখা যেতে পারে।”
এদিকে, মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র ট্যামি ব্রুস জানিয়েছেন, ভারত ও পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক “অপরিবর্তিত” এবং কূটনীতিকরা উভয় দেশের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে, বিশ্লেষকরা মনে করেন, ভারতের ওপর শুল্ক আরোপ এবং পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা মার্কিন কৌশলের একটি অংশ, যার লক্ষ্য ভারতকে কোণঠাসা করা।
নেপালে রাজনৈতিক পতন
সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) সম্মেলনে চীন ও রাশিয়ার নেতাদের সঙ্গে বৈঠককে যুক্তরাষ্ট্র ‘দম্ভ’ আখ্যা দেওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই নেপালে অস্থিরতা চরম আকার ধারণ করে। কাঠমান্ডুসহ বিভিন্ন শহরে সহিংস বিক্ষোভের মুখে প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। আন্দোলনকারীদের হামলায় তার দলের বহু নেতা আহত হয়েছেন। এমনকি এক সাবেক প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রীকে পুড়িয়ে হত্যার অভিযোগও উঠেছে।
আন্দোলনের সময় প্রকাশ্যে মারণাস্ত্র বহন করতে দেখা যায় কয়েকজনকে। বার্তা সংস্থা এএফপি প্রকাশিত ছবিতে অস্ত্রধারীদের গুলি ছোড়ার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।
আরব বসন্তের পুনরাবৃত্তি?
২০১০ সালে তিউনিশিয়ায় শুরু হওয়া আরব বসন্ত আন্দোলনের ফলে একে একে লিবিয়া, মিশর, ইয়েমেনসহ বহু দেশের সরকার পতন ঘটে। কিন্তু রাজনৈতিক মুক্তির বদলে ওই দেশগুলোর অধিকাংশই আজও অস্থিতিশীলতা, গৃহযুদ্ধ ও অর্থনৈতিক সংকটে নিমজ্জিত। বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ এশিয়ায় বর্তমানে যে আন্দোলনের ঢেউ উঠছে, তার ধাঁচ অনেকটা একই রকম।
বাংলাদেশকে ঘিরে ষড়যন্ত্র
বাংলাদেশকে কেন্দ্র করেও যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল স্পষ্ট হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন অনেক গবেষক। মিয়ানমারের গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্পে চীনের প্রভাব বাড়ার পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র এ অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারে সক্রিয় হয়েছে। রোহিঙ্গা সংকট, মানবিক করিডোর, চট্টগ্রাম বন্দর ও সেন্টমার্টিন দ্বীপকে ঘিরে প্রতিযোগিতা ক্রমেই তীব্র হচ্ছে।
এমনকি বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের কিছু অংশ নিয়ে “খ্রিস্টান রাজ্য” গঠনের ষড়যন্ত্রের আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন কেউ কেউ, যা পূর্ব তিমুরের ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও একাধিকবার এ বিষয়ে সতর্ক করেছিলেন।
একাধিক সূত্র দাবি করছে, নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে “প্রক্সি নেতা” হিসেবে ব্যবহার করছে পশ্চিমা শক্তি। তাঁকে জাতিসংঘ মহাসচিব করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ। এর বিনিময়ে ইউনূসকে বাংলাদেশের ভেতরে রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
নেপালে কাকে দিয়ে খেলল আমেরিকা
বাংলাদেশে গত বছরের ৫ আগস্ট শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সূত্র ধরে বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটে। আন্দোলনের আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চীন সফর করেছিলেন। নেপালের ক্ষেত্রেও একই রকম ঘটনা দেখা যায়—প্রধানমন্ত্রী ওলি চীন সফর শেষে দেশে ফিরতেই তাঁর বিরুদ্ধে আন্দোলন তীব্র হয়।
বাংলাদেশে আন্দোলনের প্রভাবক ছিলেন ড. ইউনূস; আর নেপালে শিক্ষার্থীদের সংগঠিত করেন এনজিওকর্মী সুদান গুরুং। তিনিই শিক্ষার্থীদের অহিংস আন্দোলনের নামে সহিংস পথে ঠেলে দেন।
বিশ্লেষকদের অভিমত
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন ডিপ স্টেট দীর্ঘদিন ধরে এনজিও ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। একদিকে অনলাইনে উস্কানি, অন্যদিকে মাঠ পর্যায়ে আন্দোলন নিয়ন্ত্রণ—এই সমন্বিত কৌশলের মাধ্যমেই তারা সরকার পতন ঘটায়। বাংলাদেশ ও নেপাল উভয় ক্ষেত্রে সেই একই রকম মডেল প্রয়োগ হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
মন্তব্য করুন