নিজস্ব প্রতিবেদক
জামায়াতের সহযোগী সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ‘দাবার ঘুঁটি’ বানাচ্ছে—এমন অভিযোগ উঠেছে। এ পরিস্থিতির জন্য শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমেদ খানের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।
গত শুক্রবার দিবাগত রাতে ছাত্রদলের হল কমিটি ঘোষণাকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসে উত্তেজনা দেখা দেয়। রোকেয়া হল, মাস্টারদা সূর্য সেন হল, মুহসীন হল, সুফিয়া কামাল হল ও বঙ্গমাতা হলসহ বিভিন্ন আবাসিক হলে শিক্ষার্থীরা ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিতে বিক্ষোভে নামেন।
সূত্র জানায়, শিবির ঢাবিতে রাজনীতি বন্ধের দাবি তুলে নিজেদের আধিপত্য টিকিয়ে রাখতে চাইছে। এর আগে ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্য বিকৃত করে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়, যা শিক্ষার্থীদের উত্তেজিত করে তোলে। ওই রাতে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন হল থেকে মিছিল বের করে “তুমি কে আমি কে, রাজাকার রাজাকার” স্লোগান দিতে থাকে।
সাংবাদিক আরিফ জেবতিক দাবি করেন, “শিবির এবারই জীবনের প্রথম ঢাবির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। প্রশাসনের ৩৬ পাতা সিভির ভিসি থেকে শুরু করে তথাকথিত সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে তারা ছড়িয়ে আছে। এই দখল তারা ছাড়বে না।”
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, শিবিরের গুপ্ত রাজনীতি ক্যাম্পাসে অব্যাহত থাকলেও অন্য সংগঠনের কার্যক্রমে বাধা দেওয়া হচ্ছে। তাদের ভাষায়, “ঢাবিতে চলছে জামাতি ভিসির মঞ্চ নাটক।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে সহিংসতা, দখলদারিত্ব ও পক্ষপাতের সঙ্গে জড়িত। শিবিরের গোপন কমিটি গঠন ও প্রভাব বিস্তার ক্যাম্পাসে অস্থিরতা বাড়িয়েছে। শিক্ষার্থীরা মনে করেন, উপাচার্যের দুর্বল ভূমিকা এই পরিস্থিতিকে আরও উৎসাহিত করছে। রোকেয়া হলের তালা ভাঙা ও মাস্টারদা সূর্য সেন হলে ফিল্টার ভাঙচুরের মতো ঘটনাগুলো প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ হারানোর উদাহরণ।
যদিও শিক্ষার্থীরা ডাকসুর পুনরুজ্জীবন ও গণতান্ত্রিক ছাত্ররাজনীতির প্রত্যাশা করছে, তবুও এজন্য কঠোর নীতিমালা বাস্তবায়ন, প্রশাসনের স্বচ্ছতা এবং ছাত্র সংগঠনগুলোর সঙ্গে কার্যকর সংলাপের প্রয়োজন বলে মনে করছেন অনেকে।
বর্তমানে ঢাবির চিত্র সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে রাতের নাটকীয়তা ও উপাচার্য ঘেরাওয়ের ঘটনায়। এসব পরিস্থিতি গণমাধ্যমে শিরোনাম হলেও ক্যাম্পাসের শান্তিপূর্ণ শিক্ষাবান্ধব পরিবেশের জন্য তা হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিক্ষার্থীরা মনে করেন, প্রশাসন দ্রুত স্বচ্ছ পদক্ষেপ নিলে এবং গুপ্ত রাজনীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে ঢাবিতে সুষ্ঠু ছাত্ররাজনীতির পথ তৈরি হতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরের এই প্রভাব বিস্তার কেবল শিক্ষাঙ্গনের জন্যই নয়, দেশের সামগ্রিক গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির জন্যও উদ্বেগজনক। তাদের মতে, ছাত্ররাজনীতির ইতিহাসে সহিংসতা ও দখলদারিত্ব নতুন কিছু নয়, কিন্তু প্রশাসনের নীরবতা ও পক্ষপাতের অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
একজন বিশ্লেষক বলেন, “ঢাবি দেশের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির জায়গা। এখানে যদি গুপ্ত রাজনীতি ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর দখলদারিত্ব চলতে থাকে, তবে তা শুধু শিক্ষার মানকেই ক্ষতিগ্রস্ত করবে না, বরং জাতীয় রাজনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।”
তারা মনে করেন, সমাধানের জন্য প্রয়োজন নীতিনির্ধারকদের কঠোর মনোভাব, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং শিক্ষার্থীদের ঐক্যবদ্ধ দাবি। অন্যথায়, ঢাবি সহিংসতা ও নাটকীয়তার মধ্যেই বন্দি হয়ে থাকবে।
মন্তব্য করুন