বাংলাদেশে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নতুন করে আলোচনায় এসেছে। আওয়ামী লীগ সরকার সরে যাওয়ার পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দুটি প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। বিষয়টি এখন দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্কের সূচনা করেছে।
চুক্তি দুটি হলো অ্যাকুইজিশন অ্যান্ড ক্রস-সার্ভিসিং এগ্রিমেন্ট (Acquisition and Cross-Servicing Agreement - ACSA) এবং জেনারেল সিকিউরিটি অব মিলিটারি ইনফরমেশন এগ্রিমেন্ট (General Security of Military Information Agreement - GSOMIA)।
সরকারি ব্যাখ্যায় বলা হচ্ছে, এই চুক্তিগুলো মূলত লজিস্টিক সহায়তা এবং সংবেদনশীল সামরিক তথ্য সুরক্ষার কাঠামো নির্ধারণের জন্য করা হয়েছে। তবে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের কারণে বিষয়টি কেবল সামরিক সহযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি এবং বিভিন্ন মহলে এ নিয়ে আলোচনা ও প্রশ্ন উঠছে।
অ্যাকুইজিশন অ্যান্ড ক্রস-সার্ভিসিং এগ্রিমেন্ট (ACSA)-এর আওতায় দুই দেশের সশস্ত্র বাহিনী জ্বালানি, খাদ্য, যন্ত্রাংশ বা পরিবহন সুবিধা পারস্পরিকভাবে ক্রয় বা বিনিময় করতে পারে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এই চুক্তির সঙ্গে কোনো সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের বিষয় জড়িত নয়।
অন্যদিকে জেনারেল সিকিউরিটি অব মিলিটারি ইনফরমেশন এগ্রিমেন্ট (GSOMIA) মূলত শ্রেণিবদ্ধ সামরিক তথ্য সুরক্ষার নীতিমালা নির্ধারণ করে। যৌথ প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা এবং তথ্য বিনিময়ের ক্ষেত্রে তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এর উদ্দেশ্য।
ক্ষমতাচ্যুত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ অভিযোগ করেছে, তাদের সরকার পতনের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব ছিল এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় এই চুক্তি স্বাক্ষর বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের অংশ। দলটির নেতারা বলছেন, বিষয়টি সংসদীয় আলোচনার বাইরে রেখে করা হয়েছে এবং এতে জাতীয় স্বার্থ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে বর্তমানে ক্ষমতায় থাকা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (BNP) বলছে, এসব চুক্তি আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতার প্রচলিত কাঠামোর অংশ। তাদের মতে, শান্তিরক্ষা মিশন, যৌথ প্রশিক্ষণ এবং লজিস্টিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে এ ধরনের সমঝোতা সহায়ক হতে পারে। বিএনপি নেতারা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, এতে কোনো রাজনৈতিক চাপের বিষয় নেই।
বিশ্লেষকদের মতে, বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর আগ্রহ বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল (Indo-Pacific Strategy) এর অংশ হিসেবে এ অঞ্চলে অংশীদারিত্ব জোরদার করতে চায়। একই সঙ্গে চীন (China) বাংলাদেশে বড় বিনিয়োগকারী ও সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহকারী দেশ এবং ভারত (India)ও নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ রাখতে আগ্রহী।
বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে কৌশলগত ভারসাম্য ধরে রাখা।
চুক্তি দুটি কার্যকর হলে ভবিষ্যতে সামরিক সহযোগিতা বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক অব্যাহত থাকবে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। ক্ষমতার পালাবদল, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং আঞ্চলিক ভূরাজনীতির প্রেক্ষাপটে বিষয়টি এখন কেবল প্রতিরক্ষা সহযোগিতার প্রশ্নেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং বৃহত্তর কূটনৈতিক অবস্থান নিয়েও আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে।
মন্তব্য করুন