নিজস্ব প্রতিবেদক
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশে অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। মব সন্ত্রাস এবং বিচারবহির্ভূত সহিংসতার ভয়াবহ চিত্র সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। জুনে লন্ডনের ডোরচেস্টার হোটেলে তারেক রহমান ও ড. ইউনূস-এর মধ্যে অনুষ্ঠিত একটি গোপন বৈঠনের পর দেশজুড়ে সহিংসতার ‘সিনক্রোনাইজড টাইমলাইন’ অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
গত বছরের ৫ আগস্ট থেকে ‘মব জাস্টিস’ বা দলবদ্ধ প্রতিশোধমূলক সহিংসতা ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে বলে জানিয়েছে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)।
পরিসংখ্যান বলছে ভয়াবহ বাস্তবতার কথা
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত ১০ মাসে দেশে ২৫৩টি মব সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, যাতে ১৬৩ জন নিহত এবং ৩১২ জন আহত হয়েছেন। শুধু ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে গণপিটুনির ঘটনায় ৬৭ জন নিহত এবং ১১৯ জন আহত হয়েছেন। ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৪৭৬ জন নারী ও শিশু, যাদের মধ্যে ২৯২ জনই ১৮ বছরের কম বয়সী।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য মতে, ২০২৫ সালের প্রথম চার মাসেই দেশে ১,২৪৬টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। একই সময়ে নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা হয়েছে ৯,১০০টি এবং ডাকাতি ও দস্যুতার মামলা ১,১৩৯টি।
পুনরুত্থান ঘটেছে রাজনৈতিক সহিংসতার
পুরান ঢাকায় যুবদলের দুই পক্ষের মধ্যে সহিংসতায় এক ভাঙাড়ির ব্যবসায়ীকে পাথর মেরে হত্যা করা হয় এবং তার মৃতদেহের ওপর নৃত্য করা হয়—এমন বর্বরতা শুধু নিন্দনীয়ই নয়, গণতন্ত্রের জন্য ভয়াবহ সংকেত।
বিএনপির তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকায় ৪,৫০০ জনের বেশি নেতা-কর্মীকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তবুও সহিংসতা থেমে নেই। বহিষ্কৃতদের একজন মাহবুব মোল্লাকে আজ সকালে গুলি করে হত্যা করা হয় এবং মৃত্যু নিশ্চিত করতে তার পায়ের রগ কেটে দেওয়া হয়।
খুলনা মহানগর পুলিশের উপকমিশনার মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, তিনজন অস্ত্রধারী মোটরসাইকেলে এসে এলোপাতাড়ি গুলি করে মাহবুবের মাথা ও শরীরে গুলি করে, পরে রগ কেটে মৃত্যু নিশ্চিত করে।
ধর্মীয় স্থানে হামলা এবং সহিংসতা
১১ জুলাই, খুলনার একটি মসজিদে খুতবার বক্তব্যে ক্ষুব্ধ হয়ে এক ইমামকে কুপিয়ে জখম করা হয়। ধর্মীয় উপাসনালয়ের ভেতরে এমন সহিংসতা নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় পক্ষপাতী প্রতিক্রিয়া
সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখা যাচ্ছে, কিছু দলীয় বট একচোখা সমালোচনায় ব্যস্ত। যারা ‘মব সন্ত্রাসে’ প্রাণ হারানো সাধারণ মানুষের জন্য নয়, বরং দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে। অথচ, “সন্ত্রাস যে করে, তার ঘৃণা যেন তৃণসম দহে”—এই নীতিই হওয়া উচিত ছিল সকলের।
অ্যাটর্নি জেনারেলের বিতর্কিত বক্তব্য
সাবেক বিএনপি নেতা ও বর্তমান অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান বলেন, “মবের ঘটনাগুলো বিচার বিভাগের প্রতি অনাস্থা নয়, বরং গত ১৭ বছরের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ।” তার এই বক্তব্যে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মানবাধিকার কর্মীরা, যাদের মতে, এমন মন্তব্য রাষ্ট্রীয় সহিংসতাকে বৈধতা দেয়।
ইউনূস-তারেক বৈঠকের পর মব সহিংসতার সমন্বিত উত্থান
প্রাক্তন প্রধান নির্বাচন কমিশনার নূরুল হুদার বাসায় হামলা, গলায় জুতার মালা পরানো, বিচারকের উপর হামলা—সবই বিচারব্যবস্থার প্রতি চরম অবজ্ঞার উদাহরণ।
সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে পুলিশকে উপস্থিত দেখা গেলেও তারা কোনো হস্তক্ষেপ করেনি। পরে হুদাকেই গ্রেফতার দেখানো হয়, যা প্রশাসনিক নির্লিপ্ততার উদাহরণ হিসেবে সমালোচিত হচ্ছে।
দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে সহিংসতা
২৯ জুন, নারায়ণগঞ্জে: বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলে নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতিকে বিবস্ত্র করে মারধর। ১৩ মে, ঢাকার আদালতে বিএনপি-সমর্থিত আইনজীবীদের দ্বারা নারী বিচারক মমতাজ বেগমকে ধাওয়া। ২ জুলাই, যশোরে প্রতিবন্ধী রফিকুল ইসলামকে গাছে বেঁধে পিটিয়ে হত্যা। ৩ জুলাই, ফরিদপুরে হা-মীম গ্রুপের এমডি এ কে আজাদের বাড়িতে হামলা। কুমিল্লায় মাদক কারবারি সন্দেহে এক পরিবারের তিনজনকে হত্যা, ধর্ষণের ঘটনায় বিবস্ত্র করে মারধর।
বিশ্লেষকদের মতামত
বিশ্লেষকদের মতে, মব সন্ত্রাস ও বিচারবহির্ভূত প্রতিশোধের পেছনে শুধুই আইন-শৃঙ্খলার অবনতি নয়, বরং একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক প্রকল্প কাজ করছে। বিএনপি ও ড. ইউনূস-এর অন্তর্বর্তী সরকার অংশবিশেষ এই সহিংস সংস্কৃতি ছড়িয়ে দিতে ভূমিকা রাখছে বলে তাদের অভিমত।
বাংলাদেশের রাজনীতি বর্তমানে ভয়াবহ সহিংসতার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। বিচারবহির্ভূত কর্মকাণ্ড ও গণপিটুনির উত্থান কেবল একটি রাজনৈতিক সংকট নয়—এটি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও নাগরিক অধিকার হরণেরও অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠছে।এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে, ভবিষ্যতের গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা আরও দুর্বল হয়ে পড়বে।
মন্তব্য করুন