নিজস্ব প্রতিবেদক
মার্কিন শুল্ক ছাড়ের নামে বাংলাদেশকে কী দেওয়া হচ্ছে আর কী নেওয়া হচ্ছে—এই প্রশ্নটা সবার কাছ থেকে লুকিয়ে রাখার চেষ্টা চলছে। সরকার, মিডিয়া, এমনকি যারা এই "সাফল্য" উদযাপন করছেন, তারাও এড়িয়ে যাচ্ছেন গোপন শর্তগুলোর কথা। কিন্তু জনগণ কি এতটাই বোকা যে তারা বুঝবে না, যুক্তরাষ্ট্র কখনও ফ্রি লাঞ্চ দেয় না?
গতকাল থেকে মার্কিন বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের শুল্ক কমানোর খবরটা যেভাবে প্রচার করা হচ্ছে, তাতে মনে হচ্ছে যেন হঠাৎ করেই আমেরিকা বাংলাদেশের উপর অকৃপণ অনুগ্রহ বর্ষণ করেছে। কিন্তু বাস্তবতা কি আসলেই তাই? নাকি এই "অনুগ্রহ"-এর পেছনে লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, এমনকি ভূ-রাজনৈতিক সার্বভৌমত্বকে ধীরে ধীরে খর্ব করার এক সুপরিকল্পিত নীলনকশা?
যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস ঘাটলেই দেখা যায়, তারা কখনও বিনা শর্তে কোনো দেশকে বাণিজ্যিক সুবিধা দেয়নি। ফিলিপাইন থেকে লাতিন আমেরিকা—সর্বত্রই শুল্ক ছাড় বা সাহায্যের নামে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে নানাবিধ শর্ত, যার শেষ পরিণতি হয়েছে সেই দেশগুলোর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ওপর মার্কিন আধিপত্য প্রতিষ্ঠা। বাংলাদেশ কি সেই পথেই হাঁটতে চলেছে?
এই শুল্ক কমানোর পেছনে যে 'নন-ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্ট (এনডিএ)' -এর কথা বলা হচ্ছে, সেটা আসলে কী? সাধারণ ভাষায় বলতে গেলে, এটি একটি গোপন চুক্তি, যেখানে বাংলাদেশ এমন কিছু শর্ত মেনে নিয়েছে, কিন্তু সেগুলো জনগণের জানার অধিকারের বাইরে রাখা হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে—কোনো গণতান্ত্রিক দেশে এভাবে জনগণকে অন্ধকারে রাখার অধিকার সরকারের আছে কি?
দেখা যাচ্ছে যে, এই চুক্তির আড়ালে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিপুল পরিমাণ সামরিক সরঞ্জাম কিনতে বাধ্য হচ্ছে। ৬ বিলিয়ন ডলারের বোয়িং বিমান কেনার কথাও আলোচনায় রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় কি সত্যিই এতগুলো বোয়িং বিমানের প্রয়োজন? নাকি এটি শুধুই মার্কিন অস্ত্র লবিকে খুশি করার একটি কৌশল?
আরও চিন্তার বিষয় হলো কৃষিখাত। বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত ভারত, ব্রাজিল বা রাশিয়া থেকে তুলা, গম, সয়াবিন তেল আমদানি করে আসছিল প্রতিযোগিতামূলক দামে। কিন্তু এই চুক্তির পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে এই পণ্যগুলো আমদানি করতে হবে, যা কিনতে গিয়ে বাড়তি পরিবহন খরচ যোগ হবে। কৃষক ও সাধারণ ভোক্তাদের উপর এই বাড়তি খরচের বোঝা চাপানোর অর্থ কী?
চট্টগ্রাম বন্দর ও বেসরকারি কনটেইনার ডিপোতে মাশুল বাড়ানোর সিদ্ধান্তও এই প্রেক্ষাপটে সন্দেহের উদ্রেক করে। রপ্তানিকারকদের জন্য এটা এক বিশাল আঘাত। প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকতে গিয়ে বাংলাদেশি পণ্যের দাম বাড়বে, যা শেষ পর্যন্ত ইউএস মার্কেটে আমাদের অবস্থানকে দুর্বল করবে। তাহলে এই শুল্ক কমানোর আসল লাভ কী?
সবচেয়ে বড় কথা, জনগণ জানতে চায়—এই চুক্তির শর্তগুলো কী? কেন সেগুলো গোপন রাখা হচ্ছে? যদি সত্যিই এতে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা হয়, তাহলে সরকার এত গোপনের কী কারণ দেখছে? নাকি আসল সত্যিটা এতই কঠিন যে তা জনগণ জানলে সরকারের পক্ষে তা সামাল দেওয়া সম্ভব হবে না?
মন্তব্য করুন