নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা
মব সহিংসতা ও গণহত্যা
২০২৫ সালে দেশে মব সহিংসতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে যায়। মানবাধিকার সংগঠন Ain o Salish Kendra (ASK)–এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বছরে মোট ১৯৭ জন নিহত হয়েছেন মব সহিংসতায়। সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি হয়েছে ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম ও কুমিল্লায়। এ ছাড়া শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন, যার মধ্যে নারী ও সংখ্যালঘুদেরও উল্লেখযোগ্য সংখ্যা রয়েছে। অনেক ঘটনার ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা লক্ষ্য করা গেছে।
সংখ্যালঘু নির্যাতন
হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর অন্তত ৪২টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ৩৩টি বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত, ৩৬টি বসতঘরে অগ্নিসংযোগ, চারটি মন্দিরে হামলা এবং ৬৪টি প্রতিমা ভাঙচুর হয়েছে। একজন নিহত ও অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছেন। সবচেয়ে নৃশংস ঘটনা হলো ময়মনসিংহের ভালুকায় দিপু চন্দ্র দাসকে পিটিয়ে পেট্রোল দিয়ে পুড়িয়ে হত্যা করা।
ধর্ষণ ও নারীর প্রতি সহিংসতা
দেশে মোট ৭৪৯টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে; এর মধ্যে ৫৬৯টি একক ও ১৮০টি দলবদ্ধ ধর্ষণ। ধর্ষণের ফলে অন্তত ৩৬ নারী নিহত হয়েছেন এবং সাতজন আত্মহত্যা করেছেন। যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন ১৯৩ জন নারী। পারিবারিক সহিংসতার ৫৬০টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যার ফলে ১৬৮ জন নারী আত্মহত্যা করেছেন।
সাংবাদিক দমন ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত
২০২৫ সালে সাংবাদিক ও সমালোচনামূলক মত প্রকাশকারীরা ব্যাপক হয়রানির শিকার হয়েছেন। মোট ৩৮১ জন সাংবাদিক হামলা, মামলা ও হয়রানির শিকার হয়েছেন; ২৩ জনকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দ্বারা হয়রানি করা হয়েছে, ২০ জনকে মৃত্যু হুমকি দেওয়া হয়েছে। তিনজন সাংবাদিক হত্যা হয়েছেন এবং চারজনের দেহ রহস্যজনকভাবে উদ্ধার হয়েছে। ১৮ ডিসেম্বর প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার পত্রিকার কার্যালয়ে হামলা ও অগ্নিসংযোগ ঘটেছে।
রাজনৈতিক সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ড
২০২৫ সালে অন্তত ৪৭১টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ১২১ জন নিহত এবং ৫,১৮৯ জন আহত হয়েছেন। সংঘর্ষের মধ্যে আওয়ামী লীগ-বিএনপি এবং বিএনপি-জামায়াত জোটের সম্পৃক্ততা বেশি দেখা গেছে।
চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি
বছরজুড়ে চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বেড়ে গেছে। ব্যবসায়ী, পরিবহনকারী ও সাধারণ নাগরিকদের কাছ থেকে চাঁদা নেওয়া হয়েছে। চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির কারণে সামাজিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক কার্যক্রমে ভীতি সৃষ্টি হয়েছে।
শিশু অধিকার লঙ্ঘন ও সীমান্ত হত্যা
২০২৫ সালে ১,০২৩ শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং ৪১০ শিশু বিভিন্ন সহিংসতায় প্রাণ হারিয়েছেন। সীমান্ত এলাকায় অন্তত ৩৪ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন; এর মধ্যে ২৪ জন বিএসএফের গুলিতে এবং ১০ জন নির্যাতনের ফলে মারা গেছেন।
২০২৫ সাল মানবাধিকার, নারীর নিরাপত্তা, সংখ্যালঘু ও শিশু অধিকার, সাংবাদিক স্বাধীনতা এবং সামাজিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে উদ্বেগজনক বছর হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। বিচারবহির্ভূত হত্যা, রাজনৈতিক সহিংসতা, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি এবং আইনের শাসনের অভাব দেশের নাগরিকদের মৌলিক অধিকার বিপন্ন করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত পদক্ষেপ ছাড়া পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
মন্তব্য করুন