নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজনীতির মাঠে চাঁদাবাজির অভিযোগ আর নতুন নয়। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর মোটাদাগে চাঁদাবাজির অভিযোগ শুধু বিএনপির বিরুদ্ধে ছিল। তবে জুলাই আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও তাদের রাজনৈতিক মিত্র জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)–এর নেতারাও চাঁদাবাজিতে পিছিয়ে নেই।
চলতি মাসে ঢাকার যাত্রাবাড়ী থেকে শরিয়তপুর রুটে চলাচল করা “শরিয়তপুর সুপার সার্ভিস” পরিবহন কোম্পানির কাছে ৫ কোটি টাকা অথবা মাসে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। টাকা না দেওয়ায় বাস ভাঙচুর, কর্মচারীদের মারধর এবং যাত্রাবাড়ী থেকে কয়েকদিন বাস চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। প্রতিবাদে পদ্মা সেতুর জাজিরা প্রান্তে সড়ক অবরোধ ও মানববন্ধন হয়। অভিযোগের তীর ছিল যাত্রাবাড়ী থানা যুবদলের এক নেতার দিকে, যাকে ১২ জুলাই বিএনপি থেকে বহিষ্কার করে।
বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১১ মাসে চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব ও হামলার নানা অভিযোগে চার হাজারের বেশি নেতাকর্মীকে বহিষ্কারও করেছে বিএনপি। বিশ্লেষকরা মনে করেন ক্ষমতায় যাওয়ার আগেই বিএনপি যেসব বিতর্কে জড়িয়ে পড়ছে, তাতে দলটির ওপর একটা বড় চাপ তৈরি হয়েছে।
গুলশানে চাঁদাবাজি করতে গিয়ে ধরা ৩ নেতা, বহিষ্কার বৈষম্যবিরোধী থেকে
রাজধানীর গুলশান-২ নম্বর এলাকায় আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি শাম্মী আহমেদের বাসায় চাঁদা দাবি করতে গিয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের তিন নেতা পুলিশের হাতে গ্রেফতার হন। পরে সংগঠনটির পক্ষ থেকে প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে তাদের বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত জানানো হয়।
বহিষ্কৃতরা হলেন— ঢাকা মহানগর আহ্বায়ক ইব্রাহিম হোসেন মুন্না, ঢাকা মহানগর সদস্য মো. সাকাদাউন সিয়াম ও সাদাব। সংগঠনের সভাপতি রিফাত রশিদ এবং সাধারণ সম্পাদক হাসান ইনাম স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, তারা শৃঙ্খলাভঙ্গ করেছেন, এবং তাদের সঙ্গে কোনো সাংগঠনিক সম্পর্ক না রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
দুর্নীতির মদদদাতা ‘বৈষম্যের’ ছায়া: পেছনে ড. ইউনূস?
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রত্যক্ষ মদদে সংগঠনটি এবং তার রাজনৈতিক মিত্র জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এখন রূপ নিয়েছে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও প্রভাব বিস্তারের গোপন সিন্ডিকেটে।
বৈষম্যের বিরুদ্ধে স্লোগান তুলে যে সংগঠন শুরু হয়েছিল শিক্ষার্থী ও সাধারণ নাগরিকের অধিকার রক্ষার দাবিতে—তা আজ নিজেই রূপ নিয়েছে নির্যাতন, ঘুষ বাণিজ্য, তদবির সিন্ডিকেট এবং দখলদার মানসিকতার দুর্গে। রাজধানী থেকে শুরু করে মফস্বল, এমনকি সরকারি দপ্তরেও এই ছাত্র সংগঠনের নেতাদের বিরুদ্ধে উঠে এসেছে টর্চার সেল চালানো, অর্থ আদায়, চাকরি বিক্রির চেষ্টা এবং ভুয়া পরিচয়ে প্রভাব বিস্তারের গুরুতর অভিযোগ।
রাজধানীর গুলশানে আওয়ামী লীগ নেত্রী ও সাবেক সংসদ সদস্য শাম্মী আহমেদের বাসায় চাঁদাবাজির ঘটনায় শনিবার দিবাগত রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে আটক পাঁচজনের ছবিসহ একটি পোস্ট দেন উমামা ফাতেমা।
উমামা গত বছরের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক ছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি সংগঠনের মুখপাত্র হন। গত মাসে তিনি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন থেকে সরে দাঁড়ান।
পোস্টে তিনি লেখেন, এই চাঁদাবাজির খবর দেখে আশেপাশের সবাই এত অবাক হওয়ার ভান করছেন, বিষয়টা কিছুটা হাস্যকর বটে। বলতে হবে, এই প্রথম কোনো চাঁদাবাজি করতে গিয়ে তারা পুলিশের হাতে ধরা খেল। ঠিকমতো খোঁজ নিলে বুঝবেন, এঁদের শেকড় অনেক গভীরে।
এখান থেকে স্পষ্ট যে। এতসব অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের পেছনে ছায়ার মতো কাজ করছে একটি বড়সড় পৃষ্ঠপোষকতা। অভিযোগ রয়েছে, ইউনূসপন্থী উপদেষ্টারা এবং ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক মহলের প্রভাব কাজে লাগিয়ে সংগঠনটির কিছু নেতা–কর্মী এখন ‘দুর্নীতি ও দখলের লাইসেন্সধারী’ হয়ে উঠেছে।
গত ১২ জুন, গাইবান্ধায় সাধারণ শিক্ষার্থীরা ব্যানার নিয়ে রাস্তায় নামে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের চাঁদাবাজির প্রতিবাদে শহরের ডিবি রোডে তারা মানববন্ধন করে। ৮ মে রংপুরে বৈষম্যবিরোধী নেতাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি-টেন্ডার বাণিজ্যের অভিযোগ তুলে পদত্যাগ করেন সংগঠনের জেলা কমিটির সদস্য মাহমুদুর রহমান লিওন। তিনি অভিযোগ করেন, সংগঠনের জেলা আহ্বায়ক ও সদস্যসচিব চাঁদাবাজি, মামলার তদবির ও সরকারি প্রকল্পে দুর্নীতিতে জড়িত।
টঙ্গীতে এক কারখানায় বিশৃঙ্খলার ঘটনায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের এক নেতা গ্রেফতার হন। একাধিক ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, তিনি স্থানীয়দের কাছ থেকে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন।
ঢাকার মিরপুরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একটি অফিসে ব্যবসায়ীদের ধরে এনে মারধর, ব্ল্যাঙ্ক চেকে স্বাক্ষর ও স্টাম্পে সই নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এতে নেতৃত্ব দেন সংগঠনের ঢাকা মহানগর যুগ্ম আহ্বায়ক সাদমান সানজিদ ও রিফাতুল হক শাওন। তাদের সঙ্গে শাহ আলী থানার সদস্যসচিব পারভেজসহ আরও অনেকে জড়িত।
ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, অভিযুক্তরা নিজেদের এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের ছোট ভাই পরিচয় দিয়ে দফতরে প্রভাব বিস্তার করে। তাদের ছবি ব্যবহার করে মিরপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে। ব্যবসায়ী ও বাসিন্দাদের উপর হামলা, লুটপাট এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগও পাওয়া গেছে।
এই সব ঘটনায় প্রমাণ হয়, “বৈষম্যের বিরুদ্ধে” বলা আন্দোলন আসলে ক্ষমতা, প্রভাব, ও পৃষ্ঠপোষকতার আশ্রয়ে এক ধরনের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দখলদারিত্বে পরিণত হয়েছে।এতে করে সত্যিকারের আন্দোলন, সাধারণ শিক্ষার্থী ও জনগণের ওপর প্রভাব ফেলছে ভয়াবহভাবে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, তথাকথিত বৈষম্যের বিরুদ্ধে কথা বলা সংগঠনটি আদতে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও ক্ষমতার আশ্রয়ে একটি দুর্নীতিবাজ চক্রে পরিণত হয়েছে। সাধারণ ছাত্র ও নাগরিকদের আন্দোলনের ব্যানারে তারা গড়ে তুলেছে অর্থনৈতিক দখলদারিত্ব, ভয়ভীতির সংস্কৃতি ও প্রশাসনিক জবরদখল। প্রশ্ন উঠছে—দলের পেছনে থাকা ড. ইউনূসের মতো মূল পৃষ্ঠপোষকরা এই অপকর্মের দায় এড়াতে পারেন?