নিজস্ব প্রতিবেদক
গত ৫ আগস্ট ২০২৪ থেকে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর নির্যাতন, মন্দিরে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলায় শারদীয় দুর্গোৎসবের প্রস্তুতির সময় হামিন্দপুর গ্রামের কামারপাড়া সর্বজনীন দুর্গা মন্দির চত্বরে পাঁচটি প্রতিমায় অগ্নিসংযোগের ঘটনা এই সংকটের সর্বশেষ উদাহরণ। এই ঘটনায় দুর্গা, লক্ষ্মী, কার্তিক, গণেশসহ পাঁচটি প্রতিমা ও বিভিন্ন সরঞ্জাম পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায় ও পুলিশের তথ্যমতে, মন্দির কমিটি নিয়ে দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্বের জেরে এই ঘটনা ঘটেছে। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটি শুধু স্থানীয় দ্বন্দ্ব নয়, বরং জঙ্গিবাদী শক্তির উত্থান ও সরকারের পৃষ্ঠপোষকতার ফল।
সাদুল্লাপুর থানার ওসি তাজউদ্দীন খন্দকার জানান, সোমবার গভীর রাত ১টার দিকে এই অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। মন্দির কমিটির সাবেক সভাপতি অনুকূল চন্দ্র রনু অভিযোগ করেন, সামাজিক বিরোধের কারণে একটি পক্ষ অস্থায়ী মন্দিরে প্রতিমা তৈরির কাজ শুরু করেছিল, যা আগুনে পুড়ে গেছে। তিনি প্রতিপক্ষের হাত আছে বলে সন্দেহ করছেন। বর্তমান সভাপতি কুন্তূল চন্দ্র দাস বলেন, “প্রতিমা অরক্ষিত অবস্থায় তৈরি হচ্ছিল, তবে কে বা কারা আগুন দিয়েছে তা এখনো নিশ্চিত নয়।” স্থানীয় শিক্ষক দীপ্তি রানী জানান, এই ঘটনায় এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়েছে এবং জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি উঠেছে।
গত এক বছরে বাংলাদেশে ২ হাজারের বেশি মন্দিরে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। ফরিদপুর, লক্ষ্মীপুর, ময়মনসিংহ, সিরাজগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, মৌলভীবাজার, নোয়াখালীসহ বিভিন্ন জেলায় এই হামলাগুলো ঘটেছে। উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলোর মধ্যে রয়েছে:
গত ৩০ জুলাই ফরিদপুরে খাসকান্দি সর্বজনীন কালী ও দুর্গা মন্দিরে কালীমূর্তির হাত, শিবের সাপের লেজসহ বিভিন্ন অংশ ভাঙচুর করা হয়। মন্দিরটি অরক্ষিত ছিল, এবং কোনো সিসিটিভি না থাকায় দোষীদের শনাক্ত করা কঠিন হয়েছে। গত ১৪ মার্চ লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে মহামায়া মন্দিরে সরস্বতী প্রতিমা ভাঙচুর করা হয়। সিসিটিভি ফুটেজে মুখোশধারী এক যুবককে দেখা গেছে। ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জে ২০০ বছরের পুরোনো মহাশ্মশান ও মন্দির উচ্ছেদের চেষ্টা এবং ভাঙচুরের প্রতিবাদে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা মানববন্ধন করেছেন।
তারা অভিযোগ করেন, ইউএনও মো. এরশাদুল আহমেদ মন্দির ভেঙে গরুর হাট নির্মাণের পরিকল্পনা করছেন। ১৩ অক্টোবর মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে ১৪টি পূজামণ্ডপে হামলা ও ভাঙচুর হয়। মাত্র দুটি মামলা রেকর্ড হলেও অধিকাংশ অভিযোগ আমলে নেওয়া হয়নি। গত ২৮ জুন ঢাকার খিলক্ষেতে শ্রীশ্রী সর্বজনীন দুর্গা মন্দির ভাঙচুরের ঘটনায় হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ মানববন্ধন করে।
বিশ্লেষকদের মতে, ৫ আগস্ট ২০২৪-এ ড. মোহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে জঙ্গিবাদী গোষ্ঠী, বিশেষ করে জামায়াতে ইসলাম ও ছাত্র শিবিরের তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। গত এক বছরে প্রায় ১৫ হাজার হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে পাঁচশতাধিক নারী ও তরুণী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এই সহিংসতার পেছনে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সাম্প্রদায়িকতা বিশেষজ্ঞ বলেন, “৫ আগস্ট ২০২৪-এর পর বাংলাদেশে জঙ্গিবাদী শক্তির উত্থান স্পষ্ট। জামায়াতে ইসলাম ও হিজবুত তাহরীরের মতো সংগঠনগুলো সরকারের প্রশ্রয়ে সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতন ও ধর্মীয় স্থানে হামলা চালাচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের নিষ্ক্রিয়তা এই সংকটকে আরও গভীর করছে।”
হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি নির্মল রোজারিও বলেন, “এই সরকার মুখে সম্প্রীতির কথা বললেও, বাস্তবে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেই। মন্দির ভাঙচুর ও সংখ্যালঘুদের উপর হামলা দেশকে জঙ্গি রাষ্ট্রে পরিণত করছে। সরকারকে এর জন্য ক্ষমা চাইতে হবে এবং দোষীদের বিচার করতে হবে।”
হিন্দু সম্প্রদায় ও বিশ্লেষকরা অভিযোগ করছেন, অন্তর্বর্তী সরকার সাম্প্রদায়িক সহিংসতা রোধে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। মৌলভীবাজারে ১৪টি মন্দিরে হামলার ঘটনায় মাত্র দুটি মামলা রেকর্ড হয়েছে। ফরিদপুর, কিশোরগঞ্জ, সিরাজগঞ্জে হামলার পর তদন্ত হলেও দোষীদের গ্রেপ্তারে অগ্রগতি নেই। ময়মনসিংহে মহাশ্মশান উচ্ছেদের চেষ্টা স্থানীয় প্রশাসনের সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন ফ্রন্টের সদস্য সচিব বিজয় মিত্র শুভ বলেন, “প্রশাসনকে আমরা বারবার অবহিত করেছি, কিন্তু কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। সরকারের উদাসীনতায় সাম্প্রদায়িক শক্তি আরও উৎসাহিত হচ্ছে।”
সনাতন ধর্মাবলম্বীরা ও সংখ্যালঘু নেতারা দ্রুত তদন্ত, দোষীদের গ্রেপ্তার এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি পুনরুদ্ধারের দাবি জানিয়েছেন। তারা বলছেন, মন্দির ও মহাশ্মশানের মতো ঐতিহ্যবাহী স্থান সংরক্ষণ করা এবং সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব।
হিন্দু মহাজোটের সহসভাপতি নিউটন অধিকারী বলেন, “এই সরকার সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতন চালাচ্ছে। দেশে সব ধর্মের মানুষের নিরাপদ বসবাস নিশ্চিত করতে হবে।”
বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার এই উত্থান দেশের ধর্মীয় সম্প্রীতি ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের জন্য গভীর হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হলে, বাংলাদেশ আরও অস্থিতিশীলতার দিকে ধাবিত হবে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।
মন্তব্য করুন