Insight Desk
প্রকাশ : Sep 11, 2025 ইং
অনলাইন সংস্করণ

৭১-এর প্রতিশোধ নিতে মরিয়া পাকিস্তান-আমেরিকা, সহযোহিতায় ইউনূস-জামায়াত

নিজস্ব প্রতিবেদক

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানের পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় নতুন করে ষড়যন্ত্র চলছে বলে বিভিন্ন সূত্র থেকে তথ্য পাওয়া গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ কৌশলের লক্ষ্য বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে দেশকে অস্থিতিশীল করা এবং পাকিস্তানের প্রভাববলয়ে ফিরিয়ে নেওয়া।

১৯৭১-এ যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্টভাবে পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন এবং তার উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন, মূলত চীনের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের কৌশলগত স্বার্থে। যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানকে সামরিক ও কূটনৈতিক সমর্থন দিয়েছিল। মার্কিন সপ্তম নৌবহরকে বঙ্গোপসাগরে পাঠানো হয়েছিল ভারতের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে, যা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের ভূমিকাকে বাধাগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে ছিল।

জাতিসংঘে পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ করেছিল। ১৯৭১ সালের মার্চে ঢাকায় মার্কিন কনস্যুলেটের কর্মকর্তা আর্চার ব্লাডের ‘ব্লাড টেলিগ্রাম’ এই গণহত্যার বিষয়টি তুলে ধরলেও মার্কিন প্রশাসন তা উপেক্ষা করে। এছাড়া, ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশে কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ সৃষ্টিতে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা ছিল, যখন তারা খাদ্য সহায়তা বন্ধ করে চাপ প্রয়োগ করেছিল। এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বর্তমানে নতুন ষড়যন্ত্রের ভিত্তি তৈরি করছে।

পাকিস্তানের ঘনঘন সফর: কূটনৈতিক ঢাকঢোল

সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তানি মন্ত্রীদের ঢাকা সফর বেড়েছে। ২১ আগস্ট পাকিস্তানের বাণিজ্যমন্ত্রী জাম কামাল খান চার দিনের সফরে এবং ২৩ আগস্ট উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার দুই দিনের সফরে ঢাকায় আসছেন। গত মাসে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ মহসিন রাজা নাকভি ঢাকায় এসে সন্ত্রাসবাদ দমনে দুই দেশের যৌথ কাজের প্রতিশ্রুতি দেন, যা ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। সমালোচকরা প্রশ্ন তুলছেন, সন্ত্রাসী সংগঠনের আশ্রয়দাতা হিসেবে পরিচিত পাকিস্তান কীভাবে বাংলাদেশের সন্ত্রাস নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখবে? এর আগে এপ্রিলে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রসচিব আমনা বালুচ ঢাকায় এসেছিলেন সম্পর্ক পুনরুজ্জীবনের লক্ষ্যে।

রহস্যজনক সামরিক সফর

গত জুনে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর তিন ব্রিগেডিয়ার কক্সবাজারের রামু সেনানিবাসে সফর করেন, যেখানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১০ম পদাতিক ডিভিশনের সদর দপ্তর অবস্থিত। সাবেক এক মেজর জেনারেলের মতে, এই সফর গুপ্ত মিশনের অংশ ছিল। রামু সেনানিবাস আরাকান আর্মির সঙ্গে যোগাযোগ ও সরবরাহ কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত। এই সফরকে অনেকে সামরিক ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখছেন, বিশেষ করে পাকিস্তানের ১৯৭১-এর পরাজয়ের প্রেক্ষাপটে।

পাকিস্তানি গণমাধ্যমের প্রচারণা

পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ক্যাচলাইন’-এ প্রকাশিত এক কলামে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে ভারতের ষড়যন্ত্র হিসেবে উল্লেখ করে বলা হয়েছে, “পূর্ব পাকিস্তানকে তার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার সময় এসেছে।” সাবেক সামরিক কর্মকর্তা আবদুল্লাহিল আমান আজমিকে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, যা বাংলাদেশকে পাকিস্তানের প্রভাবে ফিরিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্য প্রকাশ করে।

অর্থায়ন ও জঙ্গি নেটওয়ার্ক

তদন্তে জানা গেছে, এনসিপি নামের একটি রাজনৈতিক দল জঙ্গি সংগঠনের রাজনৈতিক ফ্রন্ট হিসেবে কাজ করছে। কাতার ও তুরস্কভিত্তিক ইসলামিক ব্যাংকের মাধ্যমে পাকিস্তানি গোয়েন্দারা এই দলকে অর্থায়ন করছে। গত তিন মাসে আঙ্কারা হয়ে করাচিতে ১২ দশমিক ৭ মিলিয়ন ডলার এনসিপির শেল অ্যাকাউন্টে ঢুকেছে। বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীতে জঙ্গি-সহানুভূতিশীল কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর তথ্যও পাওয়া গেছে।

ড. ইউনূসের বিতর্কিত বক্তব্য

অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর ড. মুহাম্মদ ইউনূস দাবি করেছেন, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়নি, বরং পাকিস্তান থেকে ভারতের কবলে চলে গিয়েছিল। তিনি বলেন, “দেশ স্বাধীন হয়েছে ৫ আগস্ট ২০২৪।” তিনি জামায়াতের সঙ্গে মিলে দেশ পুনর্গঠনের কথা বলেছেন, যা ১৯৭১ সালে জামায়াতের পাকিস্তানপন্থী অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ১৯৭১ সালে ৩০ বছর বয়সী তরুণ ইউনূস মুক্তিযুদ্ধে কোনো ভূমিকা রাখেননি, যা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

১৯৭১-এর অতিরিক্ত প্রেক্ষাপট

১৯৭১ সালে পাকিস্তানের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন শুধু কূটনৈতিক ছিল না, তারা পাকিস্তানকে অর্থনৈতিক ও সামরিক সহায়তাও দিয়েছিল। মার্কিন নথি অনুযায়ী, ১৯৭১ সালের এপ্রিলে সিআইএ পূর্ব পাকিস্তানে ক্ষুদ্র মরণাস্ত্র সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছিল, তবে পাকিস্তানকে প্রাণঘাতী অস্ত্র দেওয়া থেকে বিরত থাকে। এছাড়া, যুক্তরাষ্ট্র শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের চেষ্টা করেছিল। ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন রাষ্ট্রদূত জোসেফ ফারল্যান্ড শেখ মুজিবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং শান্তিপূর্ণ সমাধানের আশ্বাস দেন, যদিও তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা।

মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৬৮ সালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার মাধ্যমে পাকিস্তান সরকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবসহ ৩৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনে, যেখানে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর জন্ম ও পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার পরিকল্পনা জড়িত ছিল। ভারত মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ, অস্ত্র ও আশ্রয় দিয়েছিল। তবে, ভারতীয় সেনাবাহিনী ৩ ডিসেম্বর ১৯৭১-এ সরাসরি যুদ্ধে প্রবেশ করে, যখন মুক্তিযোদ্ধারা ইতোমধ্যে দেশের ৭৫% অংশ মুক্ত করেছিল।

ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ

বর্তমানে চীন-ভারত প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং ইসলামাবাদ-দোহা-ইস্তাম্বুল অক্ষের সমর্থনে পশ্চিমা শক্তিগুলোর নীরব সমর্থন এই ষড়যন্ত্রকে শক্তিশালী করছে। পাকিস্তানের সেনাপ্রধান অসিম মুনির সম্প্রতি হোয়াইট হাউসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাতে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ইঙ্গিত দিয়েছে।

বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫৪ বছর পর পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রের এই সমন্বিত প্রচেষ্টা দেশের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি। নিরাপত্তা বাহিনীতে জঙ্গি-সহানুভূতিশীলদের অনুপ্রবেশ, বিদেশি অর্থায়ন এবং পাকিস্তানি গোয়েন্দা কার্যক্রম বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। জনগণ ও সরকারকে এই ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হচ্ছে। 

কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, “পাকিস্তান এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সমন্বিত কৌশল বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য সরাসরি হুমকি। বিদেশি অর্থায়ন ও জঙ্গি নেটওয়ার্ক দেশের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করতে পারে। বাংলাদেশকে নিজের অভ্যন্তরীণ সংহতি বজায় রাখতে হবে এবং সরকারি তদারকি, গোয়েন্দা কার্যক্রম ও জনসচেতনতা জোরদার করতে হবে।”

তদন্তকারীরা আরও উল্লেখ করেন, “ড. ইউনূসের বিতর্কিত বক্তব্য এবং জামায়াতের সাথে সহযোগিতা এই ষড়যন্ত্রকে রাজনৈতিক মাত্রা দিয়েছে। স্বাধীনতার চেতনা ও ইতিহাস রক্ষা করা এখন সময়ের দাবি।”

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ইউনূসের কাছ থেকে মোটা অংকের কমিশন নিয়েছেন তারেক, গ্যাঁড়াকলে

1

২০২৫: সহিংসতা, নির্যাতন ও মানবাধিকার সংকট

2

সেনা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা: আইনবহির্ভূত পদক্ষেপে সার্ব

3

কোটার জায়গায় কোটা রইল, মেধার হলো না জেতা

4

সীতাকুণ্ডে শ্যামাপূজার মণ্ডপে সাংবাদিকের ওপর সাম্প্রদায়িক হা

5

দেশ ছাড়ার পরিকল্পনায় ইউনুস! সাথে থাকছেন কয়েকজন উপদেষ্টা

6

পোপ লিও চতুর্দশের উদ্বেগ: বাংলাদেশে খ্রিস্টান সংখ্যালঘুদের ও

7

গণমাধ্যমে ফের থাবা, জামায়াত বিএনপিকে নিয়ে এবার জনকণ্ঠ দখল এন

8

অক্টোবরে ২৩১ নারী ও কন্যাশিশু সহিংসতার শিকার: উদ্বেগজনক চিত্

9

অর্থনীতির স্থবিরতায় বেকারত্ব বেড়েছে: নতুন বিনিয়োগ ও দক্ষ মান

10

শেষ সময়ে হরিলুট চালাচ্ছে ইউনূস বাহিনী

11

বাংলাদেশের রঙ্গিন বিপ্লব ও জাতিসংঘের প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা

12

আওয়ামী লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করে বাংলাদেশ আসলে কী পেল?

13

ড. ইউনূস সম্পর্কে বিখ্যাত লেখক আহমদ ছফার সতর্কবার্তা

14

অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজনে নির্বাচন কমিশনকে কানাডা প্রবাসী

15

দুদক ধ্বংসে মরিয়া ইউনূস গং

16

মুক্তিযোদ্ধা ছিলাম — এই কথাটাই আজ নিষিদ্ধ করতে চাচ্ছে যারা

17

আসছে বন্যা, হাসছে ইউনূস-এনসিপি, আবারও কি হবে প্রতারণা?

18

মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে আপোষহীন বিভুরঞ্জনকে নাজেহাল হতে হয়েছে

19

ভারতবিদ্বেষের দামি মূল্য: দুবাই ঘুরে আসছে একই ভারতীয় চাল

20