নিজস্ব প্রতিবেদক
কক্সবাজারে আগামী ২৫ আগস্ট অনুষ্ঠিতব্য ‘অংশীজন সংলাপ: রোহিঙ্গা পরিস্থিতি নিয়ে উচ্চ পর্যায়ের সম্মেলন’ এবং জাতিসংঘের উদ্যোগে ৩০ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজনকে কেন্দ্র করে বিতর্ক তীব্র হচ্ছে।
জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং রোহিঙ্গা বিষয়ক হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ ড. খলিলুর রহমান দাবি করেছেন, এই সম্মেলনগুলো রোহিঙ্গা সংকটের ‘স্থায়ী ও প্রকৃত সমাধান’ খুঁজে বের করার পথনির্দেশিকা দেবে। তবে রাজনৈতিক দলগুলো এবং বিশ্লেষকরা এই সম্মেলনকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ব্যর্থতা এবং বিদেশি শক্তির হাতে দেশের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল তুলে দেওয়ার একটি নীলনকশা হিসেবে দেখছেন।
রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। বরং, এই সরকারের আমলে কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো স্পর্শকাতর এলাকাগুলো বিদেশি প্রভাবের কবলে পড়ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি পার্বত্য চট্টগ্রামে স্টারলিংকের সেবা চালু করা হয়েছে, যা স্থানীয় জনগণের মধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। এই উদ্যোগকে অনেকে বিদেশি শক্তির নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর একটি কৌশল হিসেবে দেখছেন। এছাড়া, বন্দর ও করিডোর ইস্যুতে সরকারের অস্বচ্ছ নীতি দেশের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি সৃষ্টি করছে বলে সমালোচকরা মনে করেন।
জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের মিশন অফিস বাংলাদেশে স্থাপনের পরিকল্পনার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক দলগুলো একের পর এক সভা-সমাবেশ করছে। তারা মনে করেন, এটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশি হস্তক্ষেপের পথ প্রশস্ত করবে। একজন বিশিষ্ট রাজনৈতিক নেতা বলেন, “অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিভিন্ন নাটক সাজিয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকার মিশন চালুর পথ তৈরি করছে, যা দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি।”
ড. খলিলুর রহমানের নেতৃত্বে ঢাকায় কূটনীতিকদের ব্রিফিংয়ে ১০৬টি দেশের সমর্থনের কথা বলা হলেও, এই সম্মেলনের প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একজন রাষ্ট্রদূতের বরাত দিয়ে জানা গেছে, কক্সবাজার সম্মেলনের শিডিউল ঘোষণা করা হলেও এর আয়োজনের পেছনে স্থানীয় জনগণের স্বার্থের চেয়ে বিদেশি এজেন্ডা প্রাধান্য পাচ্ছে। সমালোচকরা বলছেন, রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানের নামে কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রামকে বিদেশি শক্তির হাতে তুলে দেওয়ার একটি পরিকল্পিত প্রক্রিয়া চলছে।
রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে বাংলাদেশের প্রচেষ্টা যে আন্তর্জাতিক সমর্থন পাচ্ছে না, তা সত্ত্বেও স্থানীয় পর্যায়ে সরকারের ব্যর্থতা স্পষ্ট। রোহিঙ্গাদের কণ্ঠস্বর তুলে ধরার কথা বলা হলেও, তাদের প্রকৃত সমস্যা সমাধানে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। বরং, এই সম্মেলনগুলোকে কেন্দ্র করে বিদেশি শক্তির প্রভাব বৃদ্ধি এবং স্থানীয় স্বার্থের অবমূল্যায়নের অভিযোগ উঠছে।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো শুধু মানবিক সংকটের কেন্দ্র নয়
সন্ত্রাসী রোহিঙ্গাদের একটি অংশের জন্য ক্যাম্পগুলো পরিণত হয়েছে অস্ত্র ব্যবসার নিরাপদ ঘাঁটিতে। স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রগুলো একের পর এক উল্লেখ করছে রোহিঙ্গাদের জড়িত থাকার কথা। অস্ত্র পাচার, কেনাবেচা, ডাকাতি, অপহরণ – বহু অপরাধের হাতেখড়ি হচ্ছে এই ক্যাম্পগুলোর পাশের পাহাড়ি গুহায়, ভ্রাম্যমাণ আস্তানায়। উদ্ধার হওয়া বিপুল পরিমাণ অস্ত্রের সূত্রও চলে গেছে সেদিকেই। আসামিরা জামিনে বেরিয়ে আবারও ডুবে যাচ্ছে অন্ধকার জগতে।
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই সময়টাতেই অস্ত্র পাচারের মাত্রা বেড়েছে হু হু করে। সংশ্লিষ্ট মহলের শঙ্কা, এই অস্ত্র ব্যবহার করা হতে পারে নির্বাচনী সহিংসতায়। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সুযোগে কারা লাভবান হবে? কারা চালাবে এই অস্ত্র? প্রশ্নগুলো রাতের অন্ধকারের মতো ঘনীভূত হচ্ছে। গত ৩১ মে দমদমিয়ায় উদ্ধার হওয়া দশটি হ্যান্ড গ্রেনেড ও ডেটোনেটর কি কোনো বড় ঘটনার ইঙ্গিতবাহী? গ্রেপ্তার হয়নি কেউ। তারা এখনও ঘুরে বেড়াচ্ছে মুক্ত, পরিকল্পনা করছে পরবর্তী অপকর্ম।
দেশি-বিদেশি অস্ত্রের মিশেলে তৈরি হচ্ছে এক ভয়াবহ অস্ত্র ভান্ডার। মায়ানমার থেকে আসছে ভারী অস্ত্র, মহেশখালী থেকে আসছে দেশীয় তৈরি। এই দুই ধারার মিলনস্থল কক্সবাজারের পাহাড়ি এলাকা। টেকনাফ, উখিয়া – এগুলো শুধু ভৌগোলিক নাম নয়; এরা এখন অস্ত্র পাচারের সমার্থক। কোস্ট গার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার হারুন-অর-রশীদের বর্ণনা অনুযায়ী, পাচারকারীরা কতটা সক্রিয়, কতটা সশস্ত্র, তা সহজেই অনুমেয়। তাদের সামাল দিতে যৌথ বাহিনীকে নামতে হচ্ছে মাঠে, ঝুঁকি নিতে হচ্ছে জীবন বাজি রেখে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জসিম উদ্দীন চৌধুরী সরাসরি বলেছেন, রোহিঙ্গাদের কারণেই অস্ত্রসংক্রান্ত অপরাধ বেড়েছে। ১৬ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি মো. কাউছার সিকদারও একই সুরে বলেছেন সন্ত্রাসী রোহিঙ্গাদের অস্ত্র ব্যবসা ও অপকর্মের কথা। আদালতে মামলা চলছে, জামিনে বেরিয়েছে অভিযুক্তরা। কিন্তু আদালতের চার দেয়ালের বাইরে কি বদলাচ্ছে কিছু? অস্ত্রের পাহাড় কি কমছে, নাকি আরও বাড়ছে?
এই অস্ত্রের ছায়া শুধু কক্সবাজার বা সীমান্তের মানুষকেই আতঙ্কিত করছে না; তা ছড়িয়ে পড়ছে গোটা দেশজুড়ে। পাচার হওয়া প্রতিটি রাইফেল, প্রতিটি গ্রেনেড, প্রতিটি রাউন্ড গুলি – এগুলো শান্তির শয্যায় পুঁতে রাখা ল্যান্ডমাইনের মতো। কখন, কোথায়, কীভাবে বিস্ফোরিত হবে, কেউ জানে না। রাষ্ট্রের কর্ণধারদের কানে এই বিপদসংকেত কি পৌঁছাচ্ছে? নাকি গুঞ্জরিত হচ্ছে শুধু সংবাদপত্রের পাতায়, টেলিভিশনের পর্দায়? অস্ত্রের এই বন্যা রোধে কার্যকর, দৃশ্যমান, নির্মম পদক্ষেপের সময় এখনই। আগামীকাল খুব দেরি হয়ে যেতে পারে।
রোহিঙ্গা নিয়ে সরকারের দ্বিচারিতা
২০২৫ সালের শুরুতে, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস ঘোষণা দেন যে, মিয়ানমার প্রথম ধাপে ১ লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গাকে ফেরত নেবে । তবে, এই ঘোষণা বাস্তবায়নের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যায়নি। পরবর্তীতে, ইউনূস জানান যে, রাখাইনে সহিংসতার কারণে গত কয়েক মাসে ৮০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে । পরে জানা যায়, এই সংখ্যা এক লাখ ১৩ হাজার। এই পরস্পরবিরোধী বক্তব্যে সরকারের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের বাংলাদেশ সফর এবং রোহিঙ্গা শিবিরে ইফতার অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকে অনেকেই রাজনৈতিক নাটক হিসেবে দেখছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি উঠেছে যে, এই সফর এবং ইউনূসের মন্তব্যের মাধ্যমে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ভুয়া আশ্বাস দেওয়া হয়েছে, যা বাস্তবে কার্যকর হয়নি।
এরপর সামনে এসেছে রাখাইনের মানবিক করিডোর ইস্যু। এই প্রস্তাব নিয়ে দেশে অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ স্পষ্ট। সেনাবাহিনীর একটি অংশও করিডোর স্থাপনের বিরোধিতা করছে, কারণ এটি দেশের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি হতে পারে । একটি বিষয় উল্লেখ্য যে, মিয়ানমার কিংবা আরাকান আর্মি কেউই মানবিক সাহায্য চায়নি। রাখাইন রাজ্যে দুর্ভিক্ষের আশঙ্কার কথা জাতিসংঘের তরফে বলা হলেও মিয়ানমার এমন কোনো আশঙ্কা করছে না। জাতিসংঘের আহ্বানে সাড়া দিয়ে দেশে দেশে করিডর দেওয়া হলেও সেগুলোর পরিণতি ভয়াবহ হয়েছে। এমন পরিস্থিতির মধ্যেও অন্তর্বর্তী সরকার করিডর নিয়ে কী হচ্ছে তা খোলাসা করছে না।
এই করিডোর কাদের দ্বারা পরিচালিত হবে? কোন বাহিনী তা রক্ষা করবে? সীমান্ত নিয়ন্ত্রণে কারা থাকবে? এই প্রশ্নগুলোর কোনো পরিষ্কার জবাব এখনো মেলেনি। একটি খোলা করিডোর অস্ত্র ও মাদকের চোরাচালান, সন্ত্রাসী অনুপ্রবেশ, এবং সীমান্তে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করতে পারে। তদুপরি, এই করিডোর আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক খেলায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা পশ্চিমা বিশ্ব ব্যবহার করতে পারে, যা বাংলাদেশের নিরাপত্তার জন্য দীর্ঘমেয়াদে হুমকিস্বরূপ হতে পারে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, রাখাইন এখন আরাকান আর্মির দখলে। সেখানে মিয়ানমার সেনাবাহিনী, আরাকান আর্মি, এবং সাধারণ রোহিঙ্গা জনগণের মধ্যে সংঘাতের ত্রিমুখী অবস্থা বিরাজ করছে। মানবিক করিডোর খোলার পর তা যদি আরাকান আর্মির হাতে চলে যায়, তাহলে জাতিসংঘের কর্মীরাই বিপন্ন হতে পারেন। আরও ভয়ঙ্কর হলো—এই করিডোর যদি কার্যত রোহিঙ্গাদের পালিয়ে আসার নতুন পথ হয়ে দাঁড়ায়, তবে এটি নতুন রোহিঙ্গা ঢলের জন্ম দেবে, যা বাংলাদেশের পক্ষে আর বহন করা সম্ভব নয়।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রোহিঙ্গা সম্মেলন আয়োজনের এই ধরনের পদক্ষেপ দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলো এবং সচেতন নাগরিকরা এই বিষয়ে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে দেশের স্বার্থ রক্ষা করা যায় এবং বিদেশি হস্তক্ষেপ প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়।
মন্তব্য করুন