Insight Desk
প্রকাশ : Aug 20, 2025 ইং
অনলাইন সংস্করণ

সমুদ্রের মূল্যবান খনিজ সম্পদ লুটতে কক্সবাজারে আসছে নরওয়ের গবেষণা জাহাজ!

নিজস্ব প্রতিবেদক

বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের বিশাল সমুদ্রসীমার মূল্যবান খনিজ সম্পদ, যার মধ্যে রয়েছে ইউরেনিয়াম, থোরিয়াম, এবং সিমেন্ট উৎপাদনের কাঁচামাল ‘ক্লে’, এখন লুটপাটের হুমকির মুখে। আগামী ২১ আগস্ট থেকে ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নরওয়ের অত্যাধুনিক গবেষণা জাহাজ ‘আর ভি ড. ফ্রিডজোফ নানসেন’ বাংলাদেশের সামুদ্রিক জলসীমায় মৎস্যসম্পদ ও ইকোসিস্টেম জরিপের নামে প্রবেশ করছে। 

তবে এই জরিপের আড়ালে অগভীর সমুদ্রের তলদেশে থাকা ইউরেনিয়াম, থোরিয়াম, এবং অন্যান্য মূল্যবান খনিজ সম্পদ লুটের পরিকল্পনা রয়েছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন বিশেষজ্ঞরা। এই উদ্যোগকে কেন্দ্র করে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফরিদা আখতার এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ভূমিকা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন।

৫ আগস্টের পর থেকে দেশে চলছে লুটপাটের মহাযজ্ঞ। এই সময়ে সরকারের নানা সংস্থা নিষ্ক্রিয় থাকায় বিদেশি কোম্পানিগুলো বাংলাদেশের সমুদ্র সম্পদের উপর নজরদারি বাড়িয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৬ সালের ২০ জুলাই বলেছিলেন, “সমুদ্রের এসব মূল্যবান খনিজ সম্পদ দ্রুত আহরণের ব্যবস্থা করতে হবে, নইলে তা বেহাত হয়ে যাবে।” তাঁর এই দূরদর্শী উক্তি এখন বাস্তবে রূপ নিচ্ছে। তাঁর নেতৃত্বে ২০১২ সালে ভারত এবং ২০১৪ সালে মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার সমুদ্রসীমা অর্জন করে। 

এই বিজয়ের ফলে বঙ্গোপসাগরের তলদেশে থাকা তেল, গ্যাস, ইউরেনিয়াম, থোরিয়াম, এবং ভারী খনিজ বালুসহ বিপুল সম্পদের উপর বাংলাদেশের সার্বভৌম অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি সমুদ্র সম্পদের সঠিক ব্যবহার ও সংরক্ষণের জন্য বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট (বিওআরআই) প্রতিষ্ঠার মতো গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন।

বাংলাদেশ ও জার্মানির যৌথ জরিপে জানা গেছে, বঙ্গোপসাগরের ৮০ থেকে ১১০ মিটার গভীরতায় ইউরেনিয়াম, থোরিয়াম, এবং ভারী খনিজ বালু যেমন ইলমেনাইট, গার্নেট, সিলিমানাইট, জিরকন, রুটাইল ও ম্যাগনেটাইটের বিপুল মজুদ রয়েছে। এছাড়া ১৪০০ থেকে ৩৭০০ মিটার গভীরতায় ম্যাঙ্গানিজ ক্রাস্ট, সালফাইড, এবং কোবাল্ট, ভানাডিয়াম, মলিবডেনাম, প্লাটিনাম, সোনা ও রুপার মতো দুষ্প্রাপ্য ধাতু পাওয়া গেছে। অগভীর সমুদ্রে ‘ক্লে’র মজুদ সিমেন্ট শিল্পে বিপ্লব আনতে পারে। কক্সবাজারের নাজিরারটেক থেকে টেকনাফের বদরমোকাম পর্যন্ত ১২০ কিলোমিটার উপকূলীয় এলাকায় ২ কোটি ৪৯ লাখ টনেরও বেশি খনিজ পদার্থের মজুদ রয়েছে, যার মধ্যে মোনাজাইটের মতো তেজস্ক্রিয় পদার্থ পারমাণবিক শক্তি উৎপাদনে ব্যবহার করা যায়। 

তবে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে এই সম্পদের সঠিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ফরিদা আখতারের নেতৃত্বে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) সহযোগিতায় নরওয়ের জাহাজ দিয়ে জরিপের উদ্যোগ নিয়েছে। এই জরিপে মৎস্য মজুদ ও ইকোসিস্টেম পর্যবেক্ষণের কথা বলা হলেও, খনিজ সম্পদের তথ্য সংগ্রহের বিষয়টি স্পষ্ট নয়। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, এই জরিপের আড়ালে বিদেশি কোম্পানিগুলো বাংলাদেশের সমুদ্রসীমার খনিজ সম্পদের তথ্য সংগ্রহ করে তা লুটপাটের পরিকল্পনা করতে পারে। ২০১৮ সালে একই জাহাজ বঙ্গোপসাগরে জরিপ চালিয়েছিল, কিন্তু সেই তথ্যের স্বচ্ছতা ও ব্যবহার নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় তেল-গ্যাস ও খনিজ সম্পদ আহরণে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও দক্ষ মানবসম্পদের অভাব রয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গৃহীত বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউটের মতো উদ্যোগ এই ঘাটতি পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারতো। তবে বর্তমান সরকারের নিষ্ক্রিয়তা এবং বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে অস্বচ্ছ চুক্তির কারণে এই সম্পদ বেহাত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে। গত ৮ বছরে সরকার বিদেশি কোম্পানিগুলোকে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য ব্লক ইজারা দিলেও ধীরগতির কারণে কোনো উল্লেখযোগ্য সাফল্য আসেনি।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব নাজিমউদ্দিন চৌধুরী বলেছিলেন, “সাগরে কী আছে তা আমরা এখনো ভালোভাবে জানি না। মানসম্পন্ন জরিপ চালাতে হবে।” কিন্তু বর্তমানে এই জরিপের নামে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে সম্পদের তথ্য তুলে দেওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ৫ আগস্টের পর থেকে সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতা এবং নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে বিদেশি লুটেরা কোম্পানিগুলো বাংলাদেশের সমুদ্র সম্পদের উপর নজর রাখছে।

সঙ্গত কারণেই দাবি উঠছে, সরকারের উচিত সমুদ্র সম্পদ রক্ষায় জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে স্বচ্ছ ও সমন্বিত নীতি গ্রহণ করা। শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্বে শুরু হওয়া সমুদ্র গবেষণা ও সম্পদ আহরণের উদ্যোগগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও দক্ষতা অর্জন করা। সমুদ্রের এই অপার সম্পদ বাংলাদেশের অর্থনীতিকে বিশ্বের শীর্ষে নিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রাখে, কিন্তু তা রক্ষায় সরকারের তৎপরতা ও স্বচ্ছতা অতীব জরুরি।

কক্সবাজার এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো স্পর্শকাতর এলাকাগুলোতে বিদেশি প্রভাব বৃদ্ধির অভিযোগ উঠেছে।  সূত্র জানায়,  কক্সবাজারের নাজিরারটেক থেকে টেকনাফ পর্যন্ত ১২০ কিলোমিটার উপকূলীয় এলাকায় ২ কোটি ৪৯ লাখ টনেরও বেশি খনিজ সম্পদ রয়েছে, যার মধ্যে মোনাজাইটের মতো তেজস্ক্রিয় পদার্থ পারমাণবিক শক্তি উৎপাদনে ব্যবহার করা যায়। বঙ্গোপসাগরে ইউরেনিয়াম, থোরিয়াম, এবং সিমেন্ট উৎপাদনের কাঁচামাল ‘ক্লে’-এর বিশাল মজুদ রয়েছে। 

কক্সবাজারে আগামী ২৫ আগস্ট অনুষ্ঠিতব্য ‘অংশীজন সংলাপ: রোহিঙ্গা পরিস্থিতি নিয়ে উচ্চ পর্যায়ের সম্মেলন’ এবং জাতিসংঘের উদ্যোগে ৩০ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজনকে কেন্দ্র করে বিতর্ক তীব্র হচ্ছে। 

জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং রোহিঙ্গা বিষয়ক হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ ড. খলিলুর রহমান দাবি করেছেন, এই সম্মেলনগুলো রোহিঙ্গা সংকটের ‘স্থায়ী ও প্রকৃত সমাধান’ খুঁজে বের করার পথনির্দেশিকা দেবে। তবে রাজনৈতিক দলগুলো এবং বিশ্লেষকরা এই সম্মেলনকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ব্যর্থতা এবং বিদেশি শক্তির হাতে দেশের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল তুলে দেওয়ার একটি নীলনকশা হিসেবে দেখছেন। 

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। বরং, এই সরকারের আমলে কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো স্পর্শকাতর এলাকাগুলো বিদেশি প্রভাবের কবলে পড়ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি পার্বত্য চট্টগ্রামে স্টারলিংকের সেবা চালু করা হয়েছে, যা স্থানীয় জনগণের মধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। এই উদ্যোগকে অনেকে বিদেশি শক্তির নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর একটি কৌশল হিসেবে দেখছেন। এছাড়া, বন্দর ও করিডোর ইস্যুতে সরকারের অস্বচ্ছ নীতি দেশের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি সৃষ্টি করছে বলে সমালোচকরা মনে করেন।

সমালোচকরা অভিযোগ করেন যে, এই সম্মেলনগুলো এবং সংশ্লিষ্ট নীতিগুলো এই মূল্যবান সম্পদগুলো বিদেশি শক্তির হাতে তুলে দেওয়ার একটি কৌশল হতে পারে। এই অভিযোগগুলো সরকারের স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতার অভাবের কারণে আরও তীব্র হয়েছে।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান: বাঙালির আত্মপরিচয়, স্বাধীনতা ও

1

ইউনূসের প্রতিশ্রুতি ভাঙলেন খলিল; স্ত্রীকে ট্রাস্টি বানিয়ে ই

2

জেলায় জেলায় বিএনপি–জামায়াত সংঘর্ষ

3

সাদাপাথর লুটের আসামি এখন সরকারি সফরের সঙ্গী, বদল কি আসলেই এস

4

জামাতি স্টাইলে এবার জাপার কার্যালয়ে আগুন দিল গণঅধিকার পরিষদ

5

ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গ্রামীণ সংস্থাগুল

6

পাকিস্তানের পক্ষে আইএসআইয়ের সঙ্গে কাজের অভিযোগ

7

শি, মোদি, পুতিনের ঐক্যের বার্তা, ইউনূসের কপালে চিন্তার ভাঁজ

8

পিনাকি-ইলিয়াস ও ইউনূসের নির্দেশে ভিপি নূরের ওপর ভয়াবহ হামলা

9

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে জঙ্গিবাদের ছায়া কি আবার

10

সংখ্যালঘু নিরাপত্তা ও সরকারের জবাবদিহিতা

11

খাটের ওপর পড়ে ছিল ঝালকাঠি জেলা আওয়ামী লীগের নেত্রীর মরদেহ

12

শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনই প্রমাণ করবে তিনি স্বৈরাচার ছিলেন ন

13

স্বাধীন বাংলাদেশে আবারো 'রাজাকার' স্লোগান, জামায়াত-এনসিপির

14

যুক্তরাষ্ট্র–বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা চুক্তি: রাজনীতিতে নতুন বিতর

15

কোটায় অস্ত্রের লাইসেন্স আসিফ মাহমুদের?

16

প্যারিসে ফ্রান্স আওয়ামী লীগের আয়োজনে “মার্চ ফর বাংলাদেশ” কর্

17

সাবেক শিবির নেতাকে গ্রেপ্তারের জেরে ডিবি কর্মকর্তার ওপর নৃশং

18

জামায়াত নেতাকে নিয়ে সটকে পড়লেন স্বার্থপর ইউনূস, বিপাকে এনসিপ

19

মৌলবাদীদের উত্থানের কারণে বন্ধ বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক চর্চা

20