হাসপাতালের আইসিইউ থেকে মায়ের জানাজা—হাতকড়া যেন পিছু ছাড়ছে না আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের। এবার জয়পুরহাটের ক্ষেতলালে সৎমায়ের জানাজা ও দাফনে অংশ নিতে প্যারোলে মুক্তি পাওয়া জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক রাশেদুল ইসলামকে হাতকড়া পরা অবস্থাতেই মায়ের শেষ বিদায়ে অংশ নিতে হয়েছে। ঘটনাটির ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর মানবিকতা ও বন্দিদের মর্যাদা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
রাশেদুল ইসলাম ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনকে কেন্দ্র করে করা একটি নাশকতার মামলায় গত ২২ আগস্ট থেকে কারাগারে রয়েছেন। মঙ্গলবার তাঁর সৎমা রহিমা বিবি মারা গেলে পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁকে সীমিত সময়ের জন্য প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয়। পুলিশি পাহারায় বাড়িতে নেওয়া হলেও মায়ের মরদেহের পাশে অবস্থান, জানাজা এবং দাফন—পুরো সময় তাঁর হাতে হাতকড়া ছিল। দাফন শেষে তাঁকে আবার কারাগারে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।
এ ঘটনা বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগও কম। সাম্প্রতিক সময়ে কারাবন্দী আওয়ামী লীগ নেতাদের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হাতকড়া পরিয়ে রাখার একাধিক ঘটনা সংবাদমাধ্যমে এসেছে। পটুয়াখালীর আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান খান কারাগারে অসুস্থ হওয়ার পর দীর্ঘদিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। ঢাকা মেডিকেলের আইসিইউতে তাঁর হাতকড়া পরা অবস্থার ছবি আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। দেড় মাসের বেশি সময় লাইফ সাপোর্টে থাকার পর গত আগস্টে তাঁর মৃত্যু হয়।
এর আগেও সাবেক শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূনের হাসপাতালে হাতকড়া পরা অবস্থার ছবি তাঁর মৃত্যুর পর ছড়িয়ে পড়লে সমালোচনা তৈরি হয়েছিল। একই সঙ্গে কারাগার ও হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনাগুলো নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। চলতি বছরের জুলাইয়ে প্রকাশিত প্রথম আলোর একটি বিশ্লেষণেও স্বল্প সময়ের মধ্যে কারাগার ও হেফাজতে একাধিক মৃত্যুর ঘটনা এবং মৃতদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের আওয়ামী লীগের সঙ্গে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি আলোচনায় আনা হয়।
একজন অভিযুক্ত ব্যক্তি অপরাধী কি না, সেটি নির্ধারণের দায়িত্ব আদালতের। রাজনৈতিক পরিচয় তাঁর মৌলিক মানবিক মর্যাদা কেড়ে নেওয়ার ভিত্তি হতে পারে না। একজন বন্দিকে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তার মধ্যে রাখা রাষ্ট্রের দায়িত্ব; একই সঙ্গে তাঁর চিকিৎসা, মর্যাদা এবং মানবিক অধিকার নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
রাশেদুল ইসলামের ক্ষেত্রে তিনি প্যারোলে মুক্ত হলেও সার্বক্ষণিক পুলিশি পাহারায় ছিলেন বলে জয়পুরহাটের পুলিশ সুপার জানিয়েছেন। কারা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জানাজার সময় তাঁর হাতে হাতকড়া থাকার বিষয়টি পুলিশের এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে। ফলে প্রশ্ন উঠছে—কঠোর পুলিশি নিরাপত্তার মধ্যেও মায়ের মরদেহের পাশে দাঁড়ানো এবং জানাজায় অংশ নেওয়ার সময় হাতকড়া খুলে দেওয়ার মতো ন্যূনতম মানবিক সুযোগ কি দেওয়া যেত না?
আইসিইউতে অসুস্থ বন্দির হাতে হাতকড়া, কারাগারে রাজনৈতিক পরিচয়ের বন্দিদের মৃত্যু নিয়ে প্রশ্ন, আর এখন মায়ের জানাজাতেও হাতকড়া—ঘটনাগুলো একসঙ্গে সামনে এলে রাষ্ট্রের আচরণ ও মানবিকতার মানদণ্ড নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।
সবশেষে প্রশ্নটি রাজনৈতিক মতাদর্শের নয়, মানবিক মর্যাদার: আওয়ামী লীগ করা কি এমন অপরাধ হয়ে দাঁড়িয়েছে যে একজন মানুষ মায়ের শেষ বিদায়ের সময়টুকুতেও হাতকড়া থেকে মুক্তি পাবেন না?
মন্তব্য করুন