Insight Desk
প্রকাশ : Sep 4, 2026 ইং
অনলাইন সংস্করণ

এনসিপি নেতাকে ‘চাঁদা’ না দেওয়ায় তিন মাস ধরে তালাবদ্ধ হরিজন শিশুদের পাঠকেন্দ্র

যে ঘরটিতে থাকার কথা ছিল শিশুদের বই, খাতা আর পড়াশোনার শব্দ, সেখানে প্রায় তিন মাস ধরে ঝুলছে তালা। কুড়িগ্রাম পৌর শহরের হরিজন পল্লীর দরিদ্র শিশুদের জন্য পরিচালিত ‘নিরন্তর ভালোবাসা’ পাঠদানকেন্দ্রটি বন্ধ থাকায় পড়াশোনা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে ৩৬ শিশু। অভিযোগ উঠেছে, এনসিপির শ্রমিক শক্তির এক নেতার দাবি করা টাকা না দেওয়ার পরই কেন্দ্রটির ঘরে তালা দেওয়া হয়।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, হরিজন পল্লীতে প্রায় ৪০০ পরিবারের বসবাস। অথচ সেখানে কোনো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নেই। এলাকার দরিদ্র শিশুদের শিক্ষার সুযোগ তৈরি করতে ব্যক্তি উদ্যোগে চালু হয়েছিল ‘নিরন্তর ভালোবাসা’ পাঠদানকেন্দ্র। কেয়ার বাংলাদেশের সৌহার্দ্য-২ প্রকল্পের মাধ্যমে নির্মিত একটি কমিউনিটি রিসোর্স সেন্টারের কক্ষে চলছিল এর কার্যক্রম।

পাঠকেন্দ্রের পরিচালক শুভ্রজ্যোতি সেন শর্মার অভিযোগ, চলতি বছরের মে মাসের শেষ দিকে এনসিপির শ্রমিক শক্তির নেতা মজনু মিয়া আগের সময়ের ভাড়ার কথা বলে তাঁর কাছে টাকা দাবি করেন। সেই টাকা না দেওয়ার পর পাঠকেন্দ্রের ঘরে তালা দেওয়া হয়। এরপর প্রায় তিন মাস পেরিয়ে গেলেও আর শুরু করা যায়নি শিশুদের পাঠদান।

শুভ্রজ্যোতির ভাষ্য, ২০২৪ সাল থেকে তিনি নিজ উদ্যোগে হরিজন সম্প্রদায়ের শিশুদের পড়াশোনার ব্যবস্থা করে আসছেন। এমনকি পাঠকেন্দ্রের শিক্ষকের বেতনও তিনি নিজের অর্থে বহন করেন। সেখানে পড়াশোনা করা শিশুদের অধিকাংশই এমন পরিবারের সন্তান, যাদের পক্ষে বিকল্পভাবে শিক্ষা বা প্রাইভেট পড়াশোনার ব্যবস্থা করা কঠিন।

তবে টাকা দাবির বিষয়টি ‘চাঁদাবাজি’ বলে মানতে নারাজ মজনু মিয়া। তাঁর দাবি, কেয়ার বাংলাদেশের প্রকল্প শেষ হওয়ার পর স্থানীয়দের নিয়ে গঠিত একটি কমিটি কমিউনিটি রিসোর্স সেন্টারটি পরিচালনা করছে এবং নির্দিষ্ট শর্তে সেখানে পাঠকেন্দ্র চালানোর অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।

মজনুর দাবি অনুযায়ী, ২৯ মাসের মধ্যে প্রথম তিন মাসের জন্য ৩ হাজার টাকা দেওয়া হলেও পরবর্তী ২৬ মাসের অর্থ দেওয়া হয়নি। সেই হিসাবে ২৬ হাজার টাকা চাওয়া হয়েছিল। টাকা চাওয়ার পর পাঠকেন্দ্র কর্তৃপক্ষ নিজেরাই কার্যক্রম বন্ধ করেছে বলে তাঁর দাবি।

কিন্তু এখানেই তৈরি হয়েছে বড় প্রশ্ন।

কেয়ার বাংলাদেশের সাবেক এক কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর কমিউনিটি রিসোর্স সেন্টারটি স্থানীয় মানুষের সামাজিক কর্মকাণ্ডের জন্য বিনামূল্যে ব্যবহারের উদ্দেশ্যেই রেখে দেওয়া হয়েছিল। সেখানে এ ধরনের অর্থনৈতিক লেনদেনের সুযোগ থাকার কথা নয়।

আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন কুড়িগ্রাম পৌরসভা ও গণপূর্ত অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, জায়গাটি সরকারি সম্পত্তি এবং কাউকে লিজ দেওয়া হয়নি। ফলে সরকারি জায়গায় গড়ে ওঠা একটি সামাজিক স্থাপনা ব্যবহারের জন্য কে, কোন কর্তৃত্বে অর্থ দাবি করছেন, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।

যদি জায়গাটি কাউকে লিজই দেওয়া না হয়ে থাকে এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডের জন্য বিনামূল্যে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে রাখা হয়ে থাকে, তাহলে ২৬ হাজার টাকা দাবি করার আইনগত বা প্রশাসনিক ভিত্তি কী, সেটি পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।
আর সেই বিরোধের মূল্য কেন দিতে হবে ৩৬টি শিশুকে?

হরিজন সম্প্রদায় দেশের দীর্ঘদিনের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীগুলোর একটি। স্থানীয়দের দাবি অনুযায়ী, এই পল্লীতে প্রায় ৪০০ পরিবার বসবাস করলেও কোনো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নেই। এমন পরিস্থিতিতে ব্যক্তি উদ্যোগে চালু হওয়া একটি পাঠকেন্দ্র তাদের শিশুদের শিক্ষার অন্যতম সুযোগ হয়ে উঠেছিল।

সেই পাঠকেন্দ্রের দরজায় তিন মাস ধরে তালা ঝুলে থাকা তাই শুধু একটি ঘর নিয়ে বিরোধ নয়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে এমন শিশুদের ওপর, যাদের অনেকেরই বিকল্প শিক্ষার সুযোগ সীমিত।

জাতীয় নাগরিক পার্টির যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক ও জাতীয় জনজাতি জোটের আহ্বায়ক ভিমপাল্লী ডেভিড রাজুও বিষয়টির দ্রুত সমাধানের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। শিশুদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি এবং কেন্দ্রটি বন্ধ থাকা দুঃখজনক বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।

৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত, বৈষম্যহীন বাংলাদেশ এবং পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলে দেওয়ার কথা বারবার বলা হয়েছে। সেই বাস্তবতায় নতুন রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে যুক্ত একজন নেতার বিরুদ্ধে টাকা দাবির অভিযোগ ওঠা এবং সেই বিরোধের মধ্যে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিশুদের শিক্ষাকেন্দ্র মাসের পর মাস বন্ধ থাকার ঘটনা স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি করে।

অভিযোগটি অবশ্যই তদন্তসাপেক্ষ। মজনু মিয়া চাঁদা দাবির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং অর্থ চাওয়ার ভিন্ন ব্যাখ্যাও দিয়েছেন। তাই তদন্ত ছাড়া তাঁকে চাঁদাবাজ হিসেবে চিহ্নিত করা উচিত হবে না। কিন্তু সরকারি জায়গা যদি কাউকে লিজ দেওয়া না হয়ে থাকে, তাহলে সেখানে অর্থ আদায়ের অধিকার কার এবং কীভাবে সেই অর্থের পরিমাণ নির্ধারণ করা হলো, তার স্বচ্ছ ব্যাখ্যা প্রয়োজন।

সবচেয়ে বড় বিষয়, দুই পক্ষের বিরোধ যাই হোক, শিশুদের পড়াশোনা বন্ধ রাখা তার সমাধান হতে পারে না।

তিন মাস ধরে ৩৬টি শিশুর পাঠদান বন্ধ। তাদের অপরাধ কী? তারা কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য নয়, কোনো আর্থিক বিরোধের পক্ষও নয়। তারা শুধু পড়তে চেয়েছিল।

নতুন বাংলাদেশের কথা বলা হচ্ছে, বৈষম্য দূর করার কথা বলা হচ্ছে। অথচ সেই বাংলাদেশেই একটি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ৩৬ শিশুর পাঠকেন্দ্রে তিন মাস ধরে তালা। এখন প্রশ্ন, টাকার বিরোধের চেয়ে এই শিশুদের শিক্ষার অধিকার কি এতটাই কম গুরুত্বপূর্ণ?

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

জামায়াত-শিবিরের নতুন কৌশল, ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে পুলিশি হয়রানি

1

জঙ্গিবাদে সম্পৃক্ততার অভিযোগে জামায়াত আমিরের ছেলে ডা. রাফাত

2

ক্লাস্টার মিসাইল: যুদ্ধের কৌশল, মানবিক বিপর্যয় ও বৈশ্বিক রা

3

ধর্মের দোহাই দিয়ে দেশজুড়ে মবের ছড়াছড়ি

4

চাইলাম কি আর পাইলাম কি—এই তো লাল স্বাধীনতা

5

আওয়ামী লীগ আমল বনাম বর্তমান সময়: প্রবৃদ্ধির কি গতি হারিয়েছে?

6

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-ইরান হামলা পাল্টা হামলা

7

বাংলাদেশকে পাকিস্তান বানাতে ভয়াবহ ষড়যন্ত্র

8

ঢাকার স্কুলে বিমান বিধ্বস্ত: শেখ হাসিনার শোক ও সহযোগিতার আহ

9

ভেনিসে সজীব ওয়াজেদ জয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি নিয়ে তুমুল

10

জুলাই আন্দোলন: সামনে থেকে নেতৃত্ব দেয় জামায়াত

11

বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের নিষেধাজ্ঞা মৌলিক মানবাধিকার লঙ্ঘন

12

চাঁদাবাজদের গডফাদার নাহিদের রয়েছে জঙ্গি কানেকশন

13

ইতিহাস কি সত্যিই বৃত্তাকার, নাকি আমরাই ভুলে যাই বারবার?

14

এবার দুর্নীতি করে ধরা খেল জুলাই আন্দোলনের মাস্টারমাইন্ড মাহফ

15

জুলাই সনদে বড় গলদ কমেছে ১১ লাখ ভোট

16

এনসিপি নেতা মুনতাসিরের হুঁশিয়ারি: ‘জুলাইয়ের গাদ্দারদের সব বে

17

সময় ফুরিয়ে আসছে সরকারের, আরও বেপোরোয়া হয়ে উঠছে এনসিপি

18

রাজনীতির উত্তাপের মাঝেও বিদ্যুতে ভারতের ওপর নির্ভরশীল বাংলাদ

19

১৭ আগস্ট সিরিজ বোমা হামলা: আওয়ামী লীগ নিধন ও নির্বাচন লুটের

20