Insight Desk
প্রকাশ : Aug 2, 2025 ইং
অনলাইন সংস্করণ

জুলাইকে ব্যবহার করে বাংলাদেশকে লুটে খাচ্ছে ইউনূস ও সমন্বয়কেরা

নিজস্ব প্রতিবেদক 

অন্তর্বর্তীকালীন ইউনূস সরকারের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এখন চাঁদাবাজি, দুর্নীতি ও রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতার কেন্দ্রবিন্দুতে। ‘নৈতিক রাজনীতি’র ধ্বজা তুলে আত্মপ্রকাশ করা এ দলটি এখন সামাজিক ও রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার নতুন নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জুলাই পদযাত্রাকে কেন্দ্র করে ব্যাপক চাঁদাবাজি

জুলাই মাসে আয়োজিত ‘নাগরিক পদযাত্রা’ উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন জেলায় ব্যাপক হারে চাঁদা তোলার অভিযোগ উঠেছে এনসিপির বিরুদ্ধে। কোথাও কোথাও ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচের দাবি করা হলেও, দলটির ঘোষিত ২ কোটি টাকার ‘নাগরিক আমানত’ তহবিলের সঙ্গে এই ব্যয়ের মিল পাওয়া যায়নি। ৬৪ জেলায় সমান খরচ ধরলে মোট ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ৩২০০ কোটি টাকা, যা এক গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
গুলশান-২ এলাকায় আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য শাম্মী আহমেদের বাসায় চাঁদা চাইতে গিয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের তিন নেতা পুলিশের হাতে আটক হন। সরকার দাবি করছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ২ হাজার কোটি টাকার বেশি চাঁদাবাজি হয়েছে।

নাহিদ ইসলামের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা বিতর্কিত চক্র

এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের নেতৃত্বে থাকা দলটি শুধু রাজনৈতিক নয়, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত হুমকিতেও পরিণত হয়েছে। প্রবাসী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের সামির তথ্য অনুযায়ী, গুলশান চাঁদাবাজি মামলায় আটক রিয়াদ ছিলেন নাহিদের প্রত্যক্ষ ছত্রছায়ায়।

এছাড়াও সংগৃহীত চাঁদার অর্থের ভাগ নিচ্ছেন: এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক নুসরাত তাবাসসুম, উত্তরাঞ্চলের মুখপাত্র সারজিস আলম, দক্ষিণাঞ্চলের মুখপাত্র হাসনাত আব্দুল্লাহ, মুখ্য সমন্বয়ক আবদুল হান্নান মাসুদ। 
এছাড়া কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক খান তালাত মাহমুদ রাফির মোবাইল ব্যাংকিং একাউন্টে আগস্ট–অক্টোবর ২০২৪ সময়ে লেনদেন হয়েছে প্রায় ৯২ লাখ টাকা। রাফি বর্তমানে সুইজারল্যান্ডে যাওয়ার প্রস্তুতিতে রয়েছেন বলে জানা গেছে।

“চাঁদার টাকায় রাজনীতি” – ভাইরাল ভিডিওতে ফাঁস

সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, মুখপাত্র সারজিস আলম ৭ লাখ টাকা চাঁদা নিচ্ছেন। আরেকটি চ্যাটে দেখা যায়, একটি আইফোন উপহার নেওয়ার আলাপ। পঞ্চগড়ের শতাধিক গাড়ির শোডাউনও প্রশ্ন তুলেছে অর্থের উৎস নিয়ে।

ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন দাবি করেছেন, চাঁদাবাজি মামলায় জড়িত এনসিপি নেতাদের অনেকেই ‘বন্দরের দায়িত্ব’ পাচ্ছেন – যা রাজনৈতিক লেনদেনের ইঙ্গিত বহন করে।

উপদেষ্টাদের দুর্নীতি 

সরকারি উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে  দুর্নীতির অভিযোগ উঠে আসছে একের পর এক।  রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টার দায়িত্ব পাওয়া নাহিদ ইসলাম, পরে রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) গঠন করলেও, তাঁর নিয়োগ করা ব্যক্তিগত সহকারী আতিক মুর্শেদ এখনো সরকারের তথ্য ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ে কর্মরত।

আতিকের বিরুদ্ধে ১৫০ কোটি টাকার অর্থ বেহাতের অভিযোগ নিয়ে সম্প্রতি গণমাধ্যমে তোলপাড় শুরু হয়। অভিযোগ আছে, তাঁর ঘনিষ্ঠদের ঘিরেই 'নগদ' প্ল্যাটফর্মে একটি দুর্নীতির সিন্ডিকেট গড়ে ওঠে। আতিক মুর্শেদ ‘স্বার্থের সংঘাত’ স্বীকার করলেও নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
 
আতিক মুর্শেদের স্ত্রী জাকিয়া সুলতানা জুঁই ২০২৫ সালের ২০ মে নগদ লিমিটেডে ‘ম্যানেজার–কমপ্লায়েন্স’ পদে নিয়োগ পান। তাঁর তিন মাসের প্রবেশনসহ মাসিক বেতন নির্ধারিত হয় ১ লাখ ৩৫ হাজার টাকা। এই নিয়োগের তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফাঁস হওয়ার পর ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়।
অপরদিকে, ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া নিজের সহকারী মোয়াজ্জেম হোসেনকে ঘিরে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে আলোচনায়। মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, টেন্ডার বাণিজ্যসহ শতকোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। এ নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে এবং তাঁর বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা চাওয়া হয়েছে।

উল্লেখ্য, মোয়াজ্জেম ছিলেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক, যা গত বছরের গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেয়। বিশ্লেষকরা বলছেন, উপদেষ্টারা তাঁদের সহকারী বা ঘনিষ্ঠদের মাধ্যমে দুর্নীতি চালান—নিজেরা দায় এড়াতে। এবারও হয়তো একই কৌশল অনুসৃত হয়েছে।

মাহফুজ আলম ও তার ভাইয়ের নামে অস্ট্রেলিয়ায় পাচার তদন্ত

তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মাহফুজ আলম ও তার ভাই এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক মাহবুব আলম মাহির বিরুদ্ধে সাড়ে ৬ কোটি টাকার আর্থিক লেনদেন নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে অস্ট্রেলিয়ার গোয়েন্দা সংস্থা AUSTRAC। অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট বনি আমিন সামাজিক মাধ্যমে এ অভিযোগ তুলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছেন।

চাঁদাবাজি, ‘ডট গ্যাং’ এবং ক্ষমতার রাজনীতি

চট্টগ্রাম অঞ্চলে এনসিপি-সংশ্লিষ্ট ছাত্রনেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে স্থানীয় কিশোর গ্যাং দিয়ে এলাকা নিয়ন্ত্রণ ও চাঁদাবাজির। ধানমন্ডিতে এক প্রকাশকের কাছ থেকে চাঁদা তুলতে গিয়ে ধরা পড়া তিন নেতা পরে মুক্তি পান এনসিপির মুখ্য সমন্বয়কের হস্তক্ষেপে।

পুরনো বিতর্কের জবাব নেই, বন্যা ত্রাণ অর্থেরও হিসাব নেই

এনসিপির দাবি অনুযায়ী দলটি গণচাঁদা দিয়ে চলে, কিন্তু এ পর্যন্ত কোনো অর্থনৈতিক বিবরণী প্রকাশ করা হয়নি। ২০২৩ সালের বন্যা ত্রাণের জন্য সংগৃহীত ১৬–১৭ কোটি টাকার হিসাব আজও অনুপস্থিত।

সরকারি ছত্রছায়ায় কল্পিত ‘কিংস পার্টি’”

ভিপি নুরুল হক নুর বলেছেন, এনসিপি সরকারের সমর্থনে পরিচালিত হচ্ছে, যা ইতিহাসে ‘কিংস পার্টি’ হিসেবে পরিচিত, যেগুলো সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে উঠে এবং পরে বিলুপ্ত হয়ে যায়। এটি নতুন বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং ফ্যাসিস্ট শাসনের ধারাবাহিকতার মতো। 

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক মুখপাত্র উমামা ফাতেমা গুলশানে চাঁদাবাজির ঘটনায় আটক পাঁচ নেতাকর্মী নিয়ে ফেসবুকে লিখেছেন, “এই চাঁদাবাজির খবরে সবাই অবাক হওয়ার ভান করছে, যা হাস্যকর। এটি তাদের প্রথম ধরা পড়া, কিন্তু এদের শেকড় অনেক গভীরে।” 

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, এনসিপির মতো দল সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে উঠলে তা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে দুর্বল করে। এটি জনগণের আস্থা হ্রাস করে এবং রাজনৈতিক প্রতিযোগিতাকে অসম ন করে দেয়। কেউ কেউ বলেন, এ ধরনের দল স্বল্পমেয়াদে সরকারের স্বার্থ রক্ষা করলেও দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করে।

পদ বিক্রি: নিয়োগের বাজারজাতকরণ চলছে রাষ্ট্রযন্ত্রে

বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামোয় গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো এখন কার্যত উন্মুক্ত নিলামে বিক্রি হচ্ছে। এসপি বদলি থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি নিয়োগ পর্যন্ত বিভিন্ন পদে নিয়োগের জন্য বিপুল অঙ্কের টাকার লেনদেন হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এই প্রক্রিয়া রাষ্ট্রযন্ত্রের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।

সূত্রের মতে, প্রশাসনের বিভিন্ন পদে নিয়োগ ও বদলির জন্য নির্দিষ্ট মূল্য নির্ধারিত হয়েছে, যা নিম্নরূপ: এসপি বদলিতে ৫ থেকে ২০ কোটি টাকা। ডিসি নিয়োগে ৫ থেকে ১০ কোটি টাকা। তবে কক্সবাজারের মতো গুরুত্বপূর্ণ জেলায় এই মূল্য ২০ কোটি টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়। চট্টগ্রাম বন্দর চেয়ারম্যান নিয়োগে ২০০ কোটি টাকা। ঢাকা-চট্টগ্রাম ওয়াসায় ১০০ থেকে ২০০ কোটি টাকা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি নিয়োগে ৫ থেকে ২০ কোটি টাকা। কারা অধিদপ্তর, কাস্টমস, সচিব পদে বদলি-পদোন্নতিতে ২০ থেকে ১০০ কোটি টাকা। উপদেষ্টা/সহকারী উপদেষ্টা নিয়োগে ১০০ থেকে ২০০ কোটি টাকা ধার্য করেছে ছায়া সরকার নামে এনসিপির নেতারা।

ড. ইউনূসের ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠা এনসিপির চারপাশে যে ধোঁয়াশা ছিল, এখন তা ঘন হয়ে উঠেছে। দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, রাজনৈতিক চক্রান্ত এবং আন্তর্জাতিক অর্থ পাচারের অভিযোগ এখন প্রমাণ দাবি করছে। রাষ্ট্রের অর্থনীতি, প্রশাসন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভারসাম্য ঝুঁকির মুখে ফেলছে এই দল ও তাদের সহযোগীরা। এখনই উপযুক্ত তদন্ত এবং কঠোর পদক্ষেপ না নিলে এই সংকট আরও গভীরতর হবে।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও গণভোট বিতর্ক আদালতে চ্যালেঞ্জ

1

ক্ষমতার সঙ্গে দল বদল কোটালীপাড়ায় সুযোগসন্ধানী রাজনীতির নগ্

2

সহিংসতায় ছায়াচ্ছন্ন নির্বাচন

3

বিএফ ইউজের ২০২৬ সালের প্রস্তাবিত কমিটি নিয়ে সাংবাদিক মহলে আ

4

তল্লাশি’র নামে হয়রানি? কিশোরগঞ্জে হিন্দু গ্রামে সেনাবাহিনীর

5

রবিবার রেমিট্যান্স শাট ডাউন পালনের আহ্বান শেখ হাসিনা সংগ্রাম

6

দেশের মাটিতে ফিরেও স্বস্তিতে নেই রেমিট্যান্স যোদ্ধারা

7

বিপাকে চীনের সামরিক রপ্তানি মডেল

8

যুক্তরাষ্ট্র–বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা চুক্তি: রাজনীতিতে নতুন বিতর

9

মব–শাসনের রক্তাক্ত বাস্তবতা, বিষবৃক্ষের ফল কুড়াচ্ছে সমাজ

10

জামিন মিলেও স্বাধীনতা নেই: গায়েবী মামলার ফাঁদে আটকে মৃত্যুপথ

11

সত্য বলার লাইসেন্স কি এখন শুধু প্রেস সচিবের হাতে?

12

জামায়াতের নারী-বিদ্বেষ বিতর্কে ফের ‘হ্যাক’ নাটক

13

চাঁদাবাজ রিয়াদ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ছাত্র প্রতিনিধি

14

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে জঙ্গিবাদের ছায়া কি আবার

15

চাইলাম কি আর পাইলাম কি—এই তো লাল স্বাধীনতা

16

ট্রাম্পের বার্তায় কূটনৈতিক শুভেচ্ছা নাকি চাপের ইঙ্গিত?

17

শিক্ষকদের আন্দোলনে উত্তপ্ত শাহবাগ, রাজধানীর যান চলাচলে স্থবি

18

গোপালগঞ্জের এনসিপি সমাবেশে বহিষ্কৃত এএসআই রঞ্জু, ছিলেন ফায়ার

19

ভয়ের মাঝে একুশের চেতনা, ২০২৬-এর ফেব্রুয়ারি

20