আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন
বিশ্ব রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে একটি অঘোষিত সূত্র কাজ করেছে যার প্রযুক্তি উন্নত, যার অস্ত্র দামী, তার সামরিক প্রাধান্যও অটুট। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সেই ধারণার প্রধান প্রতীক। স্টেলথ যুদ্ধবিমান, বহুমাত্রিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা, স্যাটেলাইট-নির্ভর টার্গেটিং সব মিলিয়ে মার্কিন অস্ত্র মানেই ছিল প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের প্রতীক।
কিন্তু আধুনিক যুদ্ধের ময়দানে এখন এক নতুন সমীকরণ দৃশ্যমান: মিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বিপরীতে হাজার ডলারের আক্রমণ।ইরান স্বল্পমূল্যের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে “ব্যয়-সামঞ্জস্যের যুদ্ধ” কৌশল সামনে এনেছে।
উদাহরণ হিসেবে শাহেদ ১৩৬ যার আনুমানিক মূল্য কয়েক হাজার ডলার। অথচ এই ধরনের ড্রোন ঠেকাতে প্রায়ই অত্যন্ত ব্যয়বহুল ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে হয়। ফলে সামরিক সংঘর্ষ শুধু কৌশলগত নয়, অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায়ও পরিণত হচ্ছে।
ইসরায়েল–ইরান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ইস্রায়েল-এর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, বিশেষত আয়রন ডোম এর কার্যকারিতা ও ব্যয় নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রতিটি ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের খরচ উল্লেখযোগ্য বিপরীতে আক্রমণকারী ড্রোন বা রকেটের খরচ তুলনামূলকভাবে অতি সামান্য।
প্রশ্ন উঠছে এই অসম ব্যয়ভার দীর্ঘমেয়াদে টেকসই কি?
তবে এখানে একপাক্ষিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সহজ নয়।
দামী অস্ত্র মানেই শুধু আক্রমণ বা প্রতিরক্ষা নয় এর সঙ্গে জড়িত গোয়েন্দা সক্ষমতা, নেটওয়ার্ক-কেন্দ্রিক যুদ্ধব্যবস্থা এবং নির্ভুলতা। ন্যাটো–এর সদস্য দেশগুলো এখনো মার্কিন প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল, কারণ তা শুধু তাৎক্ষণিক প্রতিরক্ষা নয়, দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সুবিধাও নিশ্চিত করে।
আসলে যুদ্ধের চরিত্র বদলাচ্ছে। আগের মতো কেবল “গুণগত শ্রেষ্ঠত্ব” নয়, এখন “পরিমাণগত চাপ”ও গুরুত্বপূর্ণ। কম খরচে, দ্রুত উৎপাদনযোগ্য এবং সংখ্যায় বেশি অস্ত্র দিয়ে প্রতিপক্ষের ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে চাপে ফেলা সম্ভব এটাই নতুন বাস্তবতা। একে অনেকেই প্রযুক্তির এক ধরনের “গণতন্ত্রীকরণ” বলছেন, যেখানে সীমিত সম্পদ নিয়েও বড় শক্তির মোকাবিলা করা যায়।
বলা যায়, মিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা আর হাজার ডলারের আক্রমণের এই দ্বন্দ্বই আধুনিক যুদ্ধের নতুন সমীকরণ।
ভবিষ্যতের সংঘাতে হয়তো দেখা যাবে দামী উচ্চপ্রযুক্তির অস্ত্র ও স্বল্পমূল্যের গণউৎপাদিত অস্ত্র পাশাপাশি ব্যবহৃত হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত বিজয় নির্ভর করবে কেবল প্রযুক্তির দামে নয়, বরং কৌশল, অভিযোজনক্ষমতা এবং অর্থনৈতিক স্থায়িত্বের ওপর।
মন্তব্য করুন