Insight Desk
প্রকাশ : Jul 11, 2025 ইং
অনলাইন সংস্করণ

শেখ হাসিনাকে নিয়ে পক্ষপাতদুষ্ট প্রতিবেদন করে মিডিয়া ট্রায়াল চালাচ্ছে বিবিসি

নিজস্ব প্রতিবেদক

নোবেল বিজয়ী ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের অধীনে বাংলাদেশের চলমান মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রেক্ষাপটে, বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস সম্প্রতি ৩৫ মিনিটের একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে, যেটিকে তথাকথিত অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার অংশ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ভিডিওর সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দাবি—প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিক্ষোভকারীদের দমন করতে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছেন। তবে ভিডিওতে উপস্থাপিত তথ্যে নিরপেক্ষতা বা গ্রহণযোগ্যতার চেয়ে পক্ষপাতের ছাপ স্পষ্ট এবং এটি বিবিসির নিজস্ব সাংবাদিকতা নীতিমালারও লঙ্ঘন।

শুধুমাত্র ১৮ সেকেন্ডের একটি অডিও ক্লিপের ওপর ভিত্তি করে এই দাবি করা হয়েছে, যেখানে কথিত কোনো প্রাপক শনাক্ত করা যায়নি। অডিওটি প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক মহলের তৈরি বলেও যুক্তিসংগত সন্দেহ রয়েছে—যারা অতীতে আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা পর্যন্ত চাপিয়েছিল। অভিযোগের উৎস এমন আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর ওপর নির্ভর করে দেওয়া হয়েছে, যাদের বিরুদ্ধে আগে থেকেই বিরোধীদের দমন করার অভিযোগ রয়েছে। এমনকি সরকারঘনিষ্ঠ প্রসিকিউটরদের বেছে নেওয়া হয়েছে, যাদের অতীতে প্রতিপক্ষ দলের হয়ে কাজ করার ইতিহাস আছে।

অডিওর বিশ্লেষণে ব্যবহার করা হয়েছে একটি তৃতীয় পক্ষের মন্তব্য, যারা অডিওটি ‘নকল হওয়া অসম্ভব’—এমন জোরালো বক্তব্য না দিয়ে শুধু বলেছে, এটি "সম্ভবত কৃত্রিম নয়", যা এর নির্ভরযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

ইউনূসপন্থী প্রচারণা ও বিবিসির সহযোগিতা

বিবিসির ভিডিও প্রকাশের পর ড. ইউনূসের দপ্তর আন্তর্জাতিকভাবে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে চাপ সৃষ্টির প্রচারণা শুরু করে, অথচ সেই একই সময়ে মানবাধিকার সংগঠনগুলো মৃত্যুদণ্ড বিলুপ্তি ও চলমান নিপীড়ন বন্ধের আহ্বান জানাচ্ছিল।

প্রতিবেদনে বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থাকে ‘মব রুল’-এর আওতায় বলা হয়েছে, যেখানে বিরোধী কণ্ঠকে দমন করা এখনকার সরকারের বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিবিসি কীভাবে গোপন করেছে প্রসিকিউটরদের রাজনৈতিক পক্ষপাত?

বিবিসি তাদের প্রতিবেদনে ‘আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনজীবী’ টবি কেডম্যানকে উল্লিখিত করেছে, যিনি এখন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশন টিমে যুক্ত আছেন। কেডম্যান বলেন, “এই রেকর্ডিং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, স্পষ্ট এবং উপযুক্তভাবে যাচাই করা হয়েছে।”

তবে বিবিসি ইচ্ছাকৃতভাবে গোপন করেছে কেডম্যানের অতীত ইতিহাস

২০১১ সালের দ্য ডেইলি স্টারের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, কেডম্যান ছিলেন তিনজন ব্রিটিশ আইনজীবীর একজন, যাদের জামায়াত নিয়োগ দিয়েছিল ১৯৭১ সালের অন্যতম জঘন্য যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত গঠনের জন্য—যা যুদ্ধাপরাধ বিরোধী আন্দোলনকারীদের মতে, ছিল যুদ্ধাপরাধের শিকার লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রতি ন্যায়বিচার অস্বীকারের ষড়যন্ত্র

https://www.thedailystar.net/news-detail-173037

 ২০২৩ সালেও তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ ও মানবাধিকার আইন বিষয়ক একটি ব্যারিস্টার চেম্বার গের্নিকা ৩৭-এর পক্ষে জামায়াতের হয়ে কাজ করেছেন। ওয়েবসাইটে এখনো জামায়াতের পক্ষে এক বিবৃতি রয়েছে, যেখানে তারা “বহুত্ববাদ রক্ষার লড়াই” বলেও দলটির কর্মকাণ্ড তুলে ধরে—যদিও সেই বছরেই দলটি প্রকাশ্যে শরিয়া আইন প্রণয়নকে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশে তাদের লক্ষ্য হিসেবে ঘোষণা করে

https://www.g37chambers.com/post/statement-on-behalf-of-jamaat-e-islami

শেখ হাসিনার বক্তব্যকে খণ্ডিত করে উপস্থাপন

বিবিসি ১৭ জুলাই ২০২৪ তারিখে শেখ হাসিনার জাতীয় ভাষণের ৭ মিনিট ৪৫ সেকেন্ডের বক্তব্য থেকে এক মিনিটের কম অংশ কাটছাঁট করে প্রচার করে, যেন সেটি বিক্ষোভ দমনের আহ্বান ছিল। অথচ পুরো বক্তব্যে তিনি নিহতদের প্রতি শোক প্রকাশ করেছিলেন, সাধারণ শিক্ষার্থী ও রাজনৈতিক চক্রান্তকারীদের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রেখেছিলেন এবং আদালতে আইনি লড়াইয়ের কথা বলেছিলেন।

বিবিসি ইচ্ছাকৃতভাবে আইনজীবীদের সেই উদ্বেগগুলো উপেক্ষা করেছে—যারা ৫ আগস্টের আগেই আন্দোলনকারীদের পক্ষে লড়েছেন এবং যাদের অতীতে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে রাজনৈতিক সংযোগের প্রমাণ রয়েছে।

বিবিসি বাংলার একটি ভিডিও প্রতিবেদনেও হিযবুত তাহরীরের একজন কর্মকর্তাকে দেখা গেছে, যিনি স্বীকার করেছেন যে, সাধারণ শিক্ষার্থীর ছদ্মবেশে তারা সহিংসতায় অংশ নিয়েছেন—যা শেখ হাসিনার সেই দাবির পক্ষে প্রমাণ সরবরাহ করে যে, এই বিক্ষোভে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর সম্পৃক্ততা ছিল; অথচ বিবিসির সর্বশেষ প্রামাণ্যচিত্রে এ তথ্যটিও অনুপস্থিত।

বিবিসির এই ভিডিও বিশ্লেষণ, উদ্ধৃতির নির্বাচন এবং তথ্য উপস্থাপনা এককথায় পক্ষপাতদুষ্ট, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং স্বাধীন সাংবাদিকতার মূল নীতির লঙ্ঘন। এটি বর্তমান সরকারের প্রতিপক্ষ গোষ্ঠীর হাতিয়ার হয়ে উঠেছে, যারা বিচারপ্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক প্রতিশোধে পরিণত করতে চায়।

বরং পাঠকদের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করে বিবিসি এসব প্রসিকিউটরদের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছে, তারা শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে অডিও রেকর্ডিংটিকে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করতে চায়।

চলুন খুঁজে দেখা যাক, কী কী গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিবিসি বিশ্ববাসীর কাছে গোপন রেখেছে—যেগুলোর ভিত্তিতে বলা যায়, এসব প্রসিকিউটরদের উদ্দেশ্য ন্যায্য বিচার নয়, বরং আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে একটি প্রহসনমূলক বিচার আয়োজন করা।

এর আগে ডয়চে বাংলা-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ৫ আগস্ট আন্দোলনকারীদের পক্ষে কাজ করা একাধিক আইনি বিশেষজ্ঞ জামায়াত বা আওয়ামী বিরোধীদের বেছে বেছে প্রসিকিউটর করার ঘটনায় সমালোচনা করেছেন।  

অতএব, দুই ক্ষেত্রেই বিবিসি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে প্রসিকিউটরদের বিতর্কিত পটভূমি গোপন করেছে এবং একইসঙ্গে তাদের বক্তব্য ব্যবহার করেছে অডিও ক্লিপের সত্যতা প্রমাণ করার প্রচেষ্টায়, যা স্পষ্টতই বিচার প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার একটি প্রয়াস।

প্রশ্নবিদ্ধ ১৮ সেকেন্ডের অডিও

প্রথমত, বিবিসি ব্যর্থ হয়েছে অডিওর সম্ভাব্য প্রাপক বা সংলাপের প্রেক্ষাপট তুলে ধরতে, যা এটিকে সন্দেহজনক করে তোলে। দ্বিতীয়ত, অডিওর সত্যতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে তারা বাংলাদেশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)-এর ওপর নির্ভর করেছে—যেটি ইতিমধ্যেই সরকারের অনুগত কর্মকর্তা দ্বারা পরিচালিত বলে অভিযোগ আছে।

তৃতীয়ত, বিবিসি নিজে ইয়ারশট নামক একটি অডিও ফরেনসিক ফার্মের মন্তব্য তুলে ধরেছে, যারা বলেছে এটি “সম্ভবত কৃত্রিম নয়”—কিন্তু ‘অসম্ভব’ শব্দটি ব্যবহার করেনি, যা এই বিশ্লেষণকে দুর্বল করে।

জুলাই-আগস্টে বিক্ষোভের সময় পুলিশের ওপর হামলা, জেল ভেঙে সন্ত্রাসীদের পালানো, অস্ত্র লুট ও একাধিক প্রাণহানির ঘটনাগুলো বিবিসির প্রতিবেদনে উপেক্ষিত। বিশেষ করে যাত্রাবাড়ী থানা ঘিরে বিক্ষোভে সহিংসতা চলছিল জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকেই। শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার পরও বিক্ষোভ অব্যাহত ছিল—যা থেকে পরিষ্কার হয় যে সহিংসতার দায় শুধুমাত্র তার নির্দেশের ওপর চাপানো যুক্তিহীন।

বিবিসি যেভাবে উপস্থাপন করেছে যেন সহিংসতা শুধুই পুলিশের দ্বারা পরিচালিত, তা সম্পূর্ণ একপক্ষীয়। তারা বলেনি যে পুলিশ কর্মকর্তাদের হত্যা, ফাঁসি দিয়ে ঝুলিয়ে রাখা, জেল ভেঙে প্রায় ১০০ জন সন্ত্রাসী পালানো ও অস্ত্র লুট হয়েছিল—যা জুলাই-আগস্ট জুড়ে চলেছিল।

যাত্রাবাড়ী থানা ঘিরে সহিংসতা সম্পর্কে বিবিসি যা দেখিয়েছে তাও অসম্পূর্ণ। দেশের বহু সংবাদমাধ্যম দেখিয়েছে—এই এলাকায় জুলাই মাসের মাঝামাঝি থেকেই বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ চলছিল। বিবিসি নিজের ভিডিওতেই দেখিয়েছে শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে যাওয়ার পরও বিক্ষোভকারীরা যাত্রাবাড়ী থানায় অবস্থান করছিলেন—এতে বিক্ষোভের উদ্দেশ্য নিয়েই প্রশ্ন ওঠে।

৪৫০টিরও বেশি থানা শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার পরও আক্রান্ত হয়েছিল—যা ‘সহিংসতার জন্য প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ’ এই যুক্তিকে আরও দুর্বল করে।

উল্লেখ্য, যাত্রাবাড়ী ছিল অন্যতম প্রধান সংঘর্ষের কেন্দ্রবিন্দু, যেখানে বিক্ষোভকারীরা সহিংস হয়ে ওঠে এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিরাও তাতে যোগ দেন—যা বাংলাদেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলেও বিবিসি তা সুবিধামতো এড়িয়ে গেছে। বরং যা বিবিসি তাদের প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করেনি তা হলো—একটি ধারাবাহিকতা, যেখানে শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পরও ৪৫০টির বেশি থানায় হামলা হয়েছে, যা কার্যত সেইসব গোষ্ঠীর বর্ণনার সঙ্গে মিলে যায় যারা এই আন্দোলনকে উৎসাহিত করেছিল।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

নারীদের নিয়ে কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য দিয়ে ফের আলোচনায় স্বাধীনতাব

1

তবে কি আরেক পিলখানা হত্যাযজ্ঞ দেখতে যাচ্ছে বাংলাদেশ?

2

অতিরিক্ত সচিব পদোন্নতিতে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ, তালিকায় প্রেস

3

তবে কি সেনাবাহিনীর নিষ্ক্রিয়তায় ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে দেশ

4

মিডিয়াকে হুমকি গণতন্ত্রের পরিপন্থি

5

ভোট না দেওয়ার পাঁয়তারা করছেন ইউনূস, নতুন অস্ত্র পিআর পদ্ধতিত

6

কারচুপি ও দায়মুক্তির রাজনীতি—কঠোর হুঁশিয়ারি শেখ হাসিনার

7

অপকর্ম ফাঁস হওয়ার ভয়ে সারজিসের তৈলাক্ত স্ট্যাটাস

8

ষড়যন্ত্রের নীল নকশা ফাঁস: গুজব-মব দিয়ে রাষ্ট্রপতিকে সরাতে চা

9

উপদেষ্টা আসিফের মদদে কুমিল্লায় হিন্দু নারী গণধর্ষণের শিকার!

10

শিক্ষা কাঠামোকে নষ্ট করে দেশ ধ্বংসে মেতেছে ইউনূস গং

11

ভোরে কাতার এয়ারওয়েজে দেশ ছাড়লেন আলোচিত ব্যক্তি ইউনুস

12

হুমকিতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা, পাকিস্তানি কনফেডারেশনের নতুন ষ

13

অস্ট্রেলিয়ার ২০ লাখ ডলারের ব্যালট প্রকল্পে বাংলাদেশে অন্তর্

14

বিএনপির মন্ত্রী: ড. খলিলুর রহমানকে ঘিরে নতুন বিতর্ক

15

বৈষম্যবিরোধীরাই দেখাল, আন্দোলনে রোহিঙ্গা ও বিহারীদের ভূমিকা

16

৭১-এর প্রতিশোধ নিতে মরিয়া পাকিস্তান-আমেরিকা, সহযোহিতায় ইউনূস

17

বাংলাদেশের মানবাধিকার সংকট: কণ্ঠরোধ, স্বাধীনতা হরণ, সর্বত্র

18

নির্বাচনের ফল ঘোষিত, আস্থার সংকটে বাংলাদেশ

19

⁨সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অভিযোগ: ইসকনের বিরুদ্ধে উগ্র হিন্দুত্ব

20