Insight Desk
প্রকাশ : Sep 17, 2026 ইং
অনলাইন সংস্করণ

বিএনপি সরকারের ‘হরিলুট’: কাজ না করেই টিআর-কাবিখার ৩১৮ প্রকল্পের টাকা উত্তোলন

পটুয়াখালীর বাউফলে গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কার কর্মসূচির ৩১৮টি প্রকল্প ঘিরে বড় ধরনের অনিয়মের তথ্য সামনে এসেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে উপজেলার ১৫টি ইউনিয়নে টিআর-কাবিখার এসব প্রকল্পে বরাদ্দ ছিল ৩ কোটি ৯২ লাখ ৯৯ হাজার ৬০৪ টাকা। প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৩১৮টি প্রকল্পের অর্ধেকের বেশি প্রকল্পে দৃশ্যমান কাজ পাওয়া যায়নি, আবার কিছু প্রকল্পে নামমাত্র কাজ করেই পুরো বরাদ্দ উত্তোলনের দাবি উঠেছে। 

প্রকল্পগুলোর আওতায় মাটির রাস্তা নির্মাণ ও সংস্কার, স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা ও মসজিদের মাঠ ভরাট, বিভিন্ন অবকাঠামো মেরামত এবং গভীর নলকূপ স্থাপনের কথা ছিল। কিন্তু প্রকল্পের তালিকার সঙ্গে মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্রের বড় ধরনের অসঙ্গতির কথা উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। 

ধুলিয়া ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডে ঘুচরাকাঠি আব্দুল জব্বার মৃধা বাড়ির জামে মসজিদ ও ঈদগাহ মাঠ উন্নয়নে ১ লাখ ৩১ হাজার ২৬৫ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। স্থানীয়দের ভাষ্য, ঈদগাহ মাঠটি আগে থেকেই পাকা ছিল এবং সেখানে নতুন করে মাটি ভরাট করা হয়নি। একই স্থানে বায়তুস সালাহ জামে মসজিদের উন্নয়নে আরও ১ লাখ ১৫ হাজার টাকা বরাদ্দের তথ্যও পাওয়া গেছে। ফলে একই এলাকাকে কেন্দ্র করে আলাদা প্রকল্প দেখিয়ে অর্থ বরাদ্দের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। 

বাউফল ইউনিয়নের দক্ষিণ বিলবিলাসে মন্নাত খানের বাড়ি থেকে পল্লী বিদ্যুতের পাকা সড়ক পর্যন্ত মাটির রাস্তা মেরামতের জন্য ২ লাখ টাকা বরাদ্দ থাকলেও প্রকাশিত প্রতিবেদনের সরেজমিন অনুসন্ধানে সাম্প্রতিক সংস্কারকাজের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। একই ইউনিয়নের আলিপুরা গ্রামে রুহুল আমিন হাওলাদারের বাড়ির পশ্চিম পাশ থেকে মির্জা বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা পুনর্নির্মাণে আরও ২ লাখ টাকা বরাদ্দ থাকলেও কাজ না করেই অর্থ তুলে নেওয়ার দাবি উঠেছে। 

আরও বিস্ময়কর তথ্য পাওয়া গেছে বাউফল সদর ইউনিয়নের গোসিংগা গ্রামের একটি প্রকল্পে। আফছেরের গ্যারেজ থেকে পশ্চিমে এসপি পাকা রাস্তা পর্যন্ত মাটির রাস্তা পুনর্নির্মাণে ১ লাখ ৭৭ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু প্রকাশিত অনুসন্ধান অনুযায়ী, আফছেরের গ্যারেজ থেকে পশ্চিম দিকে সংশ্লিষ্ট মাটির রাস্তার অস্তিত্বই পাওয়া যায়নি, সেখানে রয়েছে বাউফল-বগা মহাসড়ক। 

দাসপাড়া ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডে ইসাহাক ফকির বাড়ি থেকে হোনা গাজী খালের পোল পর্যন্ত রাস্তা পুনর্নির্মাণে ২ লাখ ৩০ হাজার টাকা বরাদ্দ থাকলেও কাজ না হওয়ার দাবি করেছেন স্থানীয় বিএনপি নেতা আলী আজম চৌধুরী। বাউফল উপজেলা মৎস্যজীবী দলের সভাপতি মোশারফ হোসেন খান লিটনও বলেছেন, তার জানা মতে ইউনিয়নের অধিকাংশ প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়িত হয়নি এবং কয়েকটিতে নামমাত্র কাজ হয়েছে। 

অনিয়মের প্রশ্ন উঠেছে বাউফল পৌর শহরের প্রকল্প নিয়েও। উপজেলা পরিষদের গেটসংলগ্ন একটি ভবনের চতুর্থ তলায় ‘সাংবাদিক ক্লাব’ মেরামত ও সংস্কারের জন্য ১ লাখ ১৫ হাজার টাকা বরাদ্দ দেখানো হয়েছে। অথচ ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, তাদের ক্লাবের নামে প্রকল্প নেওয়ার বিষয়টি সভাপতি কিংবা তিনি কেউই জানতেন না। 

প্রকল্পের কাজের স্থানে নাম, বরাদ্দ, অর্থবছর ও বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষের তথ্যসংবলিত সাইনবোর্ড থাকার কথা থাকলেও বিভিন্ন প্রকল্প এলাকায় তা পাওয়া যায়নি বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে সরকারি অর্থ কোথায়, কীভাবে এবং কতটুকু ব্যয় হয়েছে, তা নিয়েও স্বচ্ছতার প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। 

সংশ্লিষ্ট দপ্তরের একটি সূত্রের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শতাধিক প্রকল্পের কাজ এখনো বাস্তবায়িত হয়নি, যদিও প্রকল্প বাস্তবায়নের নির্ধারিত মেয়াদ ৩০ জুন শেষ হয়েছে। অর্থ উত্তোলন করে প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কাছে রাখার দাবিও করা হয়েছে। তবে এই দাবি কোনো সরকারি তদন্তের মাধ্যমে এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে পাওয়া যায়নি। 

বাউফল উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, প্রকল্পগুলো তার দায়িত্ব গ্রহণের আগে নেওয়া হয়েছিল। তিনি যোগদানের পর যেসব প্রকল্প পরিদর্শন করেছেন, সেখানে কোনো অনিয়ম পাননি। কোথাও কাজ না হয়ে থাকলে বা সুনির্দিষ্ট অনিয়ম পাওয়া গেলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে বলে জানান তিনি। 

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সালেহ আহমেদও জানিয়েছেন, বিধি অনুযায়ী প্রকল্পগুলোর কাজ শেষ হওয়ার কথা। কোনো প্রকল্প বাস্তবায়িত না হলে কাজ সম্পন্ন করানো হবে অথবা সংশ্লিষ্ট প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। 

তবে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা জরুরি, ৩১৮টি প্রকল্পে ৩১৮ কোটি টাকা নয়, মোট বরাদ্দ প্রায় ৩ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। একইভাবে পুরো অর্থ ‘লুটপাট’ হয়েছে, এমন কোনো সরকারি তদন্তের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তও এখনো সামনে আসেনি। বর্তমানে প্রকাশিত তথ্যগুলো মূলত সরেজমিন প্রতিবেদন, স্থানীয়দের বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যক্তিদের বক্তব্যের ওপর ভিত্তি করে উঠে এসেছে।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

রাঙামাটিতে ইউপিডিএফ নেতা মাইকেল চাকমার আট বছরের কারাদণ্ড

1

আগস্টে আমরা পুলিশ মেরে ঝুলিয়ে রেখেছি—সিগন্যাল অমান্য করে উল্

2

খলিলুরে বিএনপিতে অস্বস্তি

3

দেশ ধ্বংস করতে জামায়াত-শিবিরের ছাত্র-জনতার ব্যানার

4

আইসিটির দেওয়া রায় প্রসঙ্গে শেখ হাসিনার আনুষ্ঠানিক বিবৃতি

5

পিটার হাস-ইউনূস মহেশখালী কানেকশন, ভূ-রাজনীতির নতুন খেলা শুরু

6

কাজ কথা বলে, সময় তার সাক্ষী, রূপপুরে দৃশ্যমান উন্নয়নের শক্ত

7

যুক্তরাষ্ট্র চুক্তিতে রাজস্ব ঝুঁকি: বছরে ১,৩২৭ কোটি টাকা শুল

8

গোপালগঞ্জে গুলি চালাল সেনাবাহিনী-পুলিশ, মামলা হচ্ছে আ.লীগ নে

9

বাংলাদেশকে পাকিস্তান বানাতে চায় জামায়াত, বাস্তবায়নে তৎপর গুপ

10

আওয়ামী লীগ আমল বনাম বর্তমান সময়: প্রবৃদ্ধির কি গতি হারিয়েছে?

11

তারাকান্দা থানায় মামলা বাণিজ্যের মহোৎসব, স্থানীয় আওয়ামী লীগ

12

জুলাই ঘোষণাপত্র ইতিহাস বিকৃতির এক নির্লজ্জ প্রয়াস

13

এসেনশিয়াল ড্রাগসে এমডি পদ ঘিরে ৩০ কোটি টাকার চুক্তির অভিযোগ

14

মার্কিন চুক্তি নিয়ে নতুন বিতর্ক: এলপিজি আমদানিতে বছরে ১৮ হাজ

15

অপকর্ম ঢাকতেই বিবিসি অস্ত্র ব্যবহার করলেন ইউনূস!

16

ড. ইউনূসের নেতৃত্বে অর্থনীতি স্থবির, বেকারত্ব ও দারিদ্র্যের

17

মৃত্যুর মিছিল থামছেই না: আওয়ামী লীগ নেত্রী মিনুর লাশ উদ্ধা

18

ফের জাতির সঙ্গে প্রেস সচিবের প্রতারণা: মালয়েশিয়ায় শ্রমিক সুব

19

গোপালগঞ্জের এনসিপি সমাবেশে বহিষ্কৃত এএসআই রঞ্জু, ছিলেন ফায়ার

20