নিজস্ব প্রতিবেদক
সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্দেশ্যের কথা বলে পাকিস্তানের উপ প্রধানমন্ত্রী ইসহাক দার ঢাকা সফর করে গেলেও সফরকালে তার রাজনৈতিক ও গোপন তৎপরতার রহস্য এখনো উন্মোচিত হয়নি। ঢাকার কয়েকজন সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা এবং বিশ্লেষক মনে করছেন, এই সফরের আড়ালে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই ব্যক্তি বাংলাদেশে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই ও মুসলিম জঙ্গিদের নেটওয়ার্ক শক্তপোক্ত করার কাজ সমন্বয় করে গেছেন।
ইসহাক দারের ঢাকা সফর ছাড়াও পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তাদের রামু সেনানিবাস পরিদর্শন এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে বৈঠক ও আলোচনাকে পাকিস্তানের গোপন সামরিক ও রাজনৈতিক নকশা হিসেবে দেখছেন তারা। বিগত ১৫ বছর গোপনে গোয়েন্দা তৎপরতা চালালেও বৈরিতার মুখে বারবার হোঁচট খাওয়া আইএসআই মরিয়া এখন বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণ নিতে। বিগত বিএনপি-জামায়াত সরকারের সময় আইএসআইয়ের তৎপরতা আলোকে সামনে বিপদের আশংকা প্রকাশ করেছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা।
তারা বলছেন, ১০ ট্রাক অস্ত্রের চালান, ২১শে আগস্টের গ্রেনেড হামলাসহ বহু নাশকতার সঙ্গে যুক্ত আইএসআই আসন্ন নির্বাচন বানচাল করতে নতুন করে নাশকতার বড় ছক আঁটছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনএসআইয়ের সাবেক একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলছেন, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ঢাকায় আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলা, সিলেট ও হবিগঞ্জে হামলাসহ বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে পাকিস্তানের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেছে। সেসময় গ্রেপ্তারকৃত পাকিস্তানি জঙ্গি ইউসুফ ভাটের জবানবন্দিতে উঠে আসে, পাকিস্তান থেকে গ্রেনেড ও অর্থ সরবরাহ করে জঙ্গি হামলা পরিচালিত হয়েছে। ২০১৫ সালে পাকিস্তানি কূটনীতিকদের জাল নোট চক্র ও জঙ্গি সংগঠনগুলোতে অর্থ সরবরাহের অভিযোগও প্রমাণিত। এ কার্যক্রম শুরু হয়েছিল যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরুর সময় থেকেই।
ওই কর্মকর্তা তৎকালীন পত্রপত্রিকার রিপোর্টের উদ্বৃতি দিয়ে বলেন, জঙ্গি সংগঠন জামাতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি)-এর এক সদস্য ইদ্রিস শেখ গ্রেপ্তার হওয়ার পর জানান, পাকিস্তানি কূটনীতিক আরশাদ তাকে গাড়িতে করে পৌঁছে দেন এবং ৩০ হাজার টাকা (প্রায় ৩৮০ ডলার) দেন।
এছাড়া তিনি একাধিকবার আরশাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন বলেও স্বীকার করেন। এর আগে, পাকিস্তান হাইকমিশনের অ্যাটাশে মোহাম্মদ মাজহার খানকে বাংলাদেশ থেকে প্রত্যাহার করা হয়। গোয়েন্দা সংস্থা প্রমাণ পায় যে, তিনি হিজবুত তাহরির, আনসারুল্লাহ বাংলা টিম এবং জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন সন্ত্রাসী সংগঠনে অর্থ সরবরাহ করেছেন।
শুধু তাই নয়, ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই বাংলাদেশে নানা সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিচালনা করে। এর মধ্যে ছিল গ্রেনেড সরবরাহ, সশস্ত্র প্রশিক্ষণ দিয়ে জঙ্গিদের ফের বাংলাদেশে পাঠানো। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ঢাকায় আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশে গ্রেনেড হামলায় অন্তত ২৪ জন নিহত এবং শতাধিক আহত হন। এ হামলার সঙ্গেও পাকিস্তানের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়। ওই সময় পাকিস্তান থেকেই গ্রেনেড বাংলাদেশে আনা হয়েছিল বলে তদন্তে উঠে আসে।
এই জঙ্গি হামলার হোতা কারা, তাদের পরিচয় কী, আওয়ামী লীগকে নেতৃত্ব শূন্য করে তাদের কী লাভ হতো? হামলায় ব্যবহার হওয়া গ্রেনেডগুলোর জোগানদাতা কারা? গ্রেনেডগুলো কোথা থেকে, কীভাবে এসেছিল? কে কীভাবে ওই গ্রেনেডগুলো জঙ্গিদের হাতে পৌঁছায়? এসব প্রশ্নের জবাব পাওয়া যায় পাকিস্তানি জঙ্গি ভাটের কাছ থেকে। তার সাংগঠনিক নাম আব্দুল মাজেট ভাট ওরফে আব্দুল মজিদ, প্রকৃত নাম আবু ইউসুফ ভাট। বাংলাদেশে সুদূরপ্রসারী জঙ্গি কর্মকাণ্ড পরিচালনার ‘অ্যাসাইনমেন্ট’ নিয়ে এদেশে আসেন তিনি। ইউসুফ ভাট বিয়ে করেন বাংলাদেশে। বাংলা ভাষা বলা ও লেখাও শিখে নেন।
ইউসুফ ভাট জবানবন্দিতে বলে, ‘মাওলানা তাজউদ্দিনকে গ্রেনেড ও গুলি (পাকিস্তান থেকে ঢাকায় আসা) ভারতে পাঠানোর যে দায়িত্ব দেওয়া হয়, তার জন্য বিভিন্ন সময় তাকে আমাদের সংগঠনের পক্ষ থেকে ৬/৭ লাখ টাকা দেওয়া হয়। কিন্তু সেসব গ্রেনেড ও গুলি সে পাঠায়নি। একপর্যায়ে সে জানায়, ভারত সীমান্তে যে লোক গ্রেনেড ও গুলির সরবরাহ গ্রহণ করতো, সে বিএসএফের হাতে ধরা পড়ায় সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়।
২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ঢাকার বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের জনসভায় যে গ্রেনেড হামলা হয়েছে, তাতে তাজউদ্দিনের কাছে থাকা গ্রেনেড, যা মুজাফফর শাহ্ তাকে দিয়েছিল, ব্যবহার করা হয়েছে।’
২০০৪ সালের ২১ মে সিলেটে তৎকালীন ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর গ্রেনেড হামলা, ওই বছরের ২১ জুন সুনামগঞ্জে আওয়ামী লীগ নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের সমাবেশে গ্রেনেড হামলা, ৭ আগস্ট সিলেটে তৎকালীন মেয়র বদরুদ্দিন আহমেদ কামরানের ওপর গ্রেনেড হামলা এবং ২০০৫ সালের ২৭ জানুয়ারি হবিগঞ্জে গ্রেনেড হামলা চালিয়ে সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়াকে হত্যায় ব্যবহার হওয়া গ্রেনেডের বিষয়েও তথ্য দেন ইউসুফ ভাট।
কেন শেখ হাসিনার ওপর হামলা—এ বিষয়ে ইউসুফ ভাট তার জবানবন্দিতে স্পষ্ট করে বলেন:
১. ভারতকে অস্থিতিশীল রাখতে হলে ধর্মভিত্তিক জঙ্গিদের পছন্দের সরকার প্রয়োজন। এক্ষেত্রে শেখ হাসিনাকে পছন্দ নয় তাদের।
২. ধর্মনিরপেক্ষ হওয়ায় শেখ হাসিনাকে ইসলামপন্থীদের শত্রু মনে করে জঙ্গিরা।
৩. শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকলে ইসলামবিদ্বেষী বুদ্ধিজীবীরা প্রশ্রয় পায়।
৪. শেখ হাসিনাকে হত্যা করা গেলে আওয়ামী লীগ টুকরো টুকরো হয়ে যাবে। ফলে আওয়ামী লীগ আর ক্ষমতায় যেতে পারবে না। এতে করে বাংলাদেশ ও ভারতে জঙ্গি কর্মকাণ্ড পরিচালনায় সুবিধা হবে।
৫. পাকিস্তানের চিরশত্রু শেখ হাসিনা। ওই দেশের গোয়েন্দা সংস্থা, মূলধারার রাজনৈতিক দল ও ধর্মভিত্তিক জঙ্গি সংগঠনগুলো শেখ হাসিনাকে পছন্দ করে না।
৬. বাংলাদেশের জঙ্গিপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোও শেখ হাসিনার বিরোধী।
৭. বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন হয়েছে বা ক্ষমতায় অংশীদারিত্ব করেছে, এমন কিছু রাজনৈতিক দলও শেখ হাসিনাকে অপছন্দ করে। তাদের স্বার্থ ও জঙ্গিদের স্বার্থ এক।
৮. ধর্মভিত্তিক জঙ্গিদের পাশাপাশি ভারতে সক্রিয় বিভিন্ন জঙ্গি গোষ্ঠীরও শত্রু শেখ হাসিনা।
বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ অস্ত্র ও গোলাবারুদের চালান আটক করা হয় ২০০৪ সালের পহেলা এপ্রিল রাতে। দুটি বড় ট্রলারে করে এসব অস্ত্র সমুদ্রপথে আনা হয় চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার বা সিইউএফএল জেটিতে। পর্যবেক্ষকদের অনেকই মনে করেন, বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধারের সেই ঘটনা ভারতের সাথে তৎকালীন বিএনপি সরকারের মধ্যে শীতল সম্পর্কের সূচনা করেছিল। এ ঘটনার সঙ্গে ইউসুফ ভাটের জবানবন্দির সঙ্গে মিলে যায়। পাকিস্তানের এসব কার্যক্রম কেবল বাংলাদেশ নয়, সীমান্তপারের সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদকেও প্রভাবিত করেছে, যা দেশটির দীর্ঘদিনের ‘সন্ত্রাস রপ্তানিকারক’ পরিচয়কে স্পষ্ট করে।
সম্পর্ক আবারও স্বাভাবিক করার প্রয়াস
তিন দিনের সফর সম্প্রতি ঢাকায় এসেছিলেন পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার। ১৩ বছর পর এটি ছিল পাকিস্তানের কোনো পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফর। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বাংলাদেশ-পাকিস্তান এক করার মিশন নিয়ে ঢাকায় এসেছেন ইসহাক দার। এ সফরে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারের সফরের আগে পাকিস্তানের গণমাধ্যম ও কিছু অনলাইন পোর্টালে বাংলাদেশকে পুনরায় পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত করার দাবি তোলা হয়েছে। তারা মুক্তিযুদ্ধকে ভারতীয় ষড়যন্ত্র হিসেবে তুলে ধরছে এবং পাকিস্তানি সেনাদের যুদ্ধাপরাধ অস্বীকার করছে।
এদিকে জামায়াতে ইসলামী নেতারাও বিভিন্ন জায়গায় বাংলাদেশকে পাকিস্তান বলে উল্লেখ করছেন এবং শিবির পাকিস্তানে প্রতিনিধি পাঠিয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে তারা যুদ্ধাপরাধীদের আড়াল করে প্রদর্শনী করায় সমালোচনা হয়। অন্যদিকে, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার এসব উসকানিমূলক মন্তব্যে কোনো প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে না। বিশ্লেষকরা বলছেন, এর ফলে পাকিস্তানের কাছে ক্ষমা চাওয়ার দাবিটা কার্যত প্রহসনে পরিণত হচ্ছে।
সম্প্রতি জামায়াতকে প্রথমবারের মতো সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশের অনুমতি দেওয়া হয়, যা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়। বিদায়ী পাকিস্তানি রাষ্ট্রদূতের হঠাৎ প্রস্থান এবং ব্যক্তিগত কেলেঙ্কারিও আলোচনায় এসেছে। সামগ্রিকভাবে পাকিস্তান, জামায়াত ও শিবির আবারও বাংলাদেশে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে, আর সরকারের নীরব অবস্থান তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে বলে সমালোচকরা মনে করছেন।
স্বাধীনতার ৫৪ বছর পর আবারও বাংলাদেশকে পাকিস্তান বানানোর ভয়াবহ ষড়যন্ত্র চলছে—এমন তথ্য সামনে আসছে বিভিন্ন সূত্র থেকে। সাম্প্রতিক কূটনৈতিক ও সামরিক যোগাযোগ, বিদেশি অর্থায়ন এবং ইসলামাবাদের রাজনৈতিক-গোয়েন্দা কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে তীব্র উদ্বেগ।
বাংলাদেশে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দুই দেশের বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে উদ্যোগী হয় পাকিস্তান। গত মাসে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ মহসিন রাজা নাকভি ঢাকায় এসেছিলেন। তখন তিনি জানান, সন্ত্রাসবাদ দমনে পাকিস্তান-বাংলাদেশ একসঙ্গে কাজ করবে। এ নিয়ে সমালোচনাও হয় ব্যাপক।
অনেকেই বলেন, যেখানে পাকিস্তানে সন্ত্রাসী বিভিন্ন সংগঠন বেশ সক্রিয় তারা কীভাবে আরেক দেশের সন্ত্রাস নিয়ন্ত্রণে কাজ করবে? এর আগে দুই দেশের বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক পুনরুজ্জীবনের লক্ষ্যে গত এপ্রিলে ঢাকায় এসেছিলেন পাকিস্তানের পররাষ্ট্রসচিব আমনা বালুচ। এত গেল কূটনৈতিক দৌড়ঝাঁপ।
গত জুনে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর তিন ব্রিগেডিয়ার ঢাকা সফরে আসেন এবং সরাসরি কক্সবাজারের রামু সেনানিবাসে যান, যেখানে ১০ম পদাতিক ডিভিশনের সদর দপ্তর অবস্থিত। সাবেক এক বাংলাদেশি মেজর জেনারেল বলেন, “তারা নিঃসন্দেহে গুপ্ত মিশনে ছিলেন, না হলে হঠাৎ রামুর মতো সংবেদনশীল ঘাঁটি সফরের কারণ কী?”
রামু সেনানিবাস বর্তমানে আরাকান আর্মির সঙ্গে যোগাযোগ ও সরবরাহকেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত। ফলে এ সফরকে অনেকেই স্বাভাবিক কূটনৈতিক ভ্রমণের বাইরে এক ধরণের গোপন সামরিক নকশা হিসেবে দেখছেন। বিশ্লেষকদের মতে, স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রতিশোধ নিতেই বাংলাদেশ জঙ্গিরাষ্ট্র বানাতে চায় পাকিস্তান। আর এ জন্য তারা সবসময়ই বিএনপি জামায়াতকে কাজে লাগিয়েছে।
সম্প্রতি এক টকশোতেও এমনই কথা বলেছেন সাংবাদিক আনিস আলমগীর। তিনি বলেন, জঙ্গী ছাড়া পাকিস্তান থেকে আমদানির কিছু নেই।
মন্তব্য করুন