নিজস্ব প্রতিবেদক
নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় তার প্রতিষ্ঠিত বা সংশ্লিষ্ট গ্রামীণ পরিবারের বিভিন্ন সংস্থাকে ঘিরে নানা বিতর্ক ও সমালোচনা সামনে এসেছে। সমালোচকদের একাংশ অভিযোগ করছেন, সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর গ্রামীণ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত বিভিন্ন অনুমোদন ও আর্থিক সুবিধা পেয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এসব সিদ্ধান্তকে নীতিগত ও আইনগত প্রক্রিয়ার অংশ বলেই দাবি করছে।
২০২৪ সালের ৮ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে সরকার পরিবর্তনের পর ড. ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেন। এর পরবর্তী সময়ে গ্রামীণ পরিবারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নিয়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আলোচনায় আসে।
কর সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক
সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো গ্রামীণ কল্যাণের কর মামলা। ২০২৪ সালের ৩ অক্টোবর হাইকোর্ট ৬৬৬ কোটি টাকার একটি কর-সংক্রান্ত রায় প্রত্যাহার করে নেয়। এর আগে আদালত ওই অর্থ পরিশোধের নির্দেশ দিয়েছিল। পরবর্তীতে একজন বিচারকের স্বার্থের সংঘাতের বিষয় উল্লেখ করে রায়টি প্রত্যাহার করা হয়।
সমালোচকদের মতে, এই সিদ্ধান্তে প্রতিষ্ঠানটি বড় অঙ্কের অর্থ পরিশোধ থেকে অব্যাহতি পেয়েছে, যা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা বলছেন, আদালতের সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ বিচারিক প্রক্রিয়ার অংশ এবং স্বার্থের সংঘাতের অভিযোগ ওঠায় রায় প্রত্যাহার করা হয়েছে।
এর কিছুদিন পর, ১০ অক্টোবর জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) গ্রামীণ ব্যাংককে পাঁচ বছরের জন্য কর ছাড় দেয়, যা ২০২৯ সাল পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। এনবিআর জানায়, একই ধরনের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যদিও সমালোচকরা এটিকে স্বার্থের সংঘাতের সম্ভাব্য উদাহরণ হিসেবে দেখছেন।
মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তন
এছাড়া গ্রামীণ ব্যাংকে সরকারের শেয়ার ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনার সিদ্ধান্তও আলোচনায় আসে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এর মাধ্যমে ব্যাংকের পরিচালনায় সরকারের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ কমবে। সমালোচকদের দাবি, এতে বেসরকারি প্রভাব বাড়তে পারে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন ও কার্যকারিতা বাড়ানোর লক্ষ্যেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
অন্যান্য অনুমোদন
একই সময়ে গ্রামীণ ইউনিভার্সিটির অনুমোদন, গ্রামীণ এমপ্লয়মেন্ট ম্যানপাওয়ার এক্সপোর্টের লাইসেন্স এবং গ্রামীণ টেলিকমের ডিজিটাল ওয়ালেট অনুমোদনও দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, এসব অনুমোদন নিয়মিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই হয়েছে।
রাজনৈতিক ও জনমত
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এ ধরনের সিদ্ধান্ত স্বাভাবিকভাবেই জনমনে প্রশ্ন তুলতে পারে, বিশেষ করে যখন সরকারের প্রধানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি উপকৃত হয়। তারা বলছেন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হলে এসব সিদ্ধান্তের প্রক্রিয়া জনসমক্ষে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা জরুরি।
অন্যদিকে ড. ইউনূসের সমর্থকরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে গ্রামীণ সংস্থাগুলো সামাজিক ব্যবসা ও দারিদ্র্য বিমোচনে কাজ করছে, এবং আইনি বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে রাজনৈতিকভাবে ব্যাখ্যা করা ঠিক নয়।
সর্বশেষ পরিস্থিতি অনুযায়ী, বিষয়গুলো নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গন ও সামাজিক মাধ্যমে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা ও ভবিষ্যৎ পদক্ষেপের দিকে নজর রয়েছে সবার।
মন্তব্য করুন