নিজস্ব প্রতিবেদক
তিন দিনের সফরে ঢাকায় এসেছেন পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার। ১৩ বছর বাংলাদেশ সফর করছেন পাকিস্তানের কোনো পররাষ্ট্রমন্ত্রী। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বাংলাদেশ-পাকিস্তান এক করার মিশন নিয়ে ঢাকায় এসেছেন ইসহাক দার।
এ সফরে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। সূত্র বলছে, ভারতকে অস্থিতিশীল করা ও বাংলাদেশকে আবারও পাকিস্তানের মিশনের অংশ হিসেবে ঢাকায় এসেছেন ইসহাক। কারণ বিএনপি ক্ষমতায় গেলে পাকিস্তানের জন্য ভারতকে অস্থিতিশীল করা সহজ হয়। যার প্রমাণ ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলা।
বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ অস্ত্র ও গোলাবারুদের চালান আটক করা হয় ২০০৪ সালের পহেলা এপ্রিল রাতে। দুটি বড় ট্রলারে করে এসব অস্ত্র সমুদ্রপথে আনা হয় চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার বা সিইউএফএল জেটিতে। পর্যবেক্ষকদের অনেকই মনে করেন, বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধারের সেই ঘটনা ভারতের সাথে তৎকালীন বিএনপি সরকারের মধ্যে শীতল সম্পর্কের সূচনা করেছিল।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইশাক দারের সফরের আগে পাকিস্তানের গণমাধ্যম ও কিছু অনলাইন পোর্টালে বাংলাদেশকে পুনরায় পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত করার দাবি তোলা হয়েছে। তারা মুক্তিযুদ্ধকে ভারতীয় ষড়যন্ত্র হিসেবে তুলে ধরছে এবং পাকিস্তানি সেনাদের যুদ্ধাপরাধ অস্বীকার করছে।
এদিকে জামায়াতে ইসলামী নেতারাও বিভিন্ন জায়গায় বাংলাদেশকে পাকিস্তান বলে উল্লেখ করছেন এবং শিবির পাকিস্তানে প্রতিনিধি পাঠিয়েছে। ঢাবি ক্যাম্পাসে তারা যুদ্ধাপরাধীদের আড়াল করে প্রদর্শনী করায় সমালোচনা হয়।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার এসব উসকানিমূলক মন্তব্যে কোনো প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে না। বিশ্লেষকরা বলছেন, এর ফলে পাকিস্তানের কাছে ক্ষমা চাওয়ার দাবিটা কার্যত প্রহসনে পরিণত হচ্ছে।
সম্প্রতি জামায়াতকে প্রথমবারের মতো সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশের অনুমতি দেওয়া হয়, যা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়। বিদায়ী পাকিস্তানি রাষ্ট্রদূতের হঠাৎ প্রস্থান এবং ব্যক্তিগত কেলেঙ্কারিও আলোচনায় এসেছে।
সামগ্রিকভাবে পাকিস্তান, জামায়াত ও শিবির আবারও বাংলাদেশে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে, আর সরকারের নীরব অবস্থান তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে বলে সমালোচকরা মনে করছেন।
স্বাধীনতার ৫৪ বছর পর আবারও বাংলাদেশকে পাকিস্তান বানানোর ভয়াবহ ষড়যন্ত্র চলছে—এমন তথ্য সামনে আসছে বিভিন্ন সূত্র থেকে। সাম্প্রতিক কূটনৈতিক ও সামরিক যোগাযোগ, বিদেশি অর্থায়ন এবং ইসলামাবাদের রাজনৈতিক-গোয়েন্দা কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে তীব্র উদ্বেগ।
পাকিস্তানি মন্ত্রীদের ঘনঘন ঢাকা সফর
সূত্র বলছে, মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে ঢাকায় আসছেন পাকিস্তানের দুই মন্ত্রী। পাকিস্তানের বাণিজ্যমন্ত্রী জাম কামাল খান ২১ আগস্ট চার দিনের সফরে ঢাকায় আসবেন। আর দেশটির উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার দুই দিনের সফরে ঢাকায় আসবেন ২৩ আগস্ট।
বাংলাদেশে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দুই দেশের বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে উদ্যোগী হয় পাকিস্তান। গত মাসে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ মহসিন রাজা নাকভি ঢাকায় এসেছিলেন। তখন তিনি জানা, সন্ত্রাসবাদ দমনে পাকিস্তান-বাংলাদেশ একসঙ্গে কাজ করবে। এ নিয়ে সমালোচনাও হয় ব্যাপক।
অনেকেই বলেন, যেখানে পাকিস্তানে সন্ত্রাসী বিভিন্ন সংগঠন বেশ সক্রিয় তারা কীভাবে আরেক দেশের সন্ত্রাস নিয়ন্ত্রণে কাজ করবে? এর আগে দুই দেশের বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক পুনরুজ্জীবনের লক্ষ্যে গত এপ্রিলে ঢাকায় এসেছিলেন পাকিস্তানের পররাষ্ট্রসচিব আমনা বালুচ। এত গেল কূটনৈতিক দৌড়ঝাঁপ।
পাকিস্তানি গণমাধ্যমের আক্রমণাত্মক বার্তা
পাকিস্তানভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য ক্যাচলাইন–এর এক কলামে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে ভারতের ষড়যন্ত্র হিসেবে আখ্যা দিয়ে লেখা হয়েছে, “এখন সময় এসেছে পূর্ব পাকিস্তানকে তার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার।”
লেখক সরাসরি উল্লেখ করেছেন, বাংলাদেশের প্রাক্তন সামরিক কর্মকর্তা আবদুল্লাহিল আমান আজমিকে আবারও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ করা উচিত। এমন বক্তব্যের মধ্য দিয়ে বোঝা যাচ্ছে—পাকিস্তানের একাংশ বাংলাদেশকে এখনো একটি হারানো ভূখণ্ড হিসেবে দেখছে।
পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তাদের রহস্যজনক বাংলাদেশ সফর
গত জুনে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর তিন ব্রিগেডিয়ার ঢাকা সফরে আসেন এবং সরাসরি কক্সবাজারের রামু সেনানিবাসে যান, যেখানে ১০ম পদাতিক ডিভিশনের সদর দপ্তর অবস্থিত। সাবেক এক বাংলাদেশি মেজর জেনারেল বলেন, “তারা নিঃসন্দেহে গুপ্ত মিশনে ছিলেন, না হলে হঠাৎ রামুর মতো সংবেদনশীল ঘাঁটি সফরের কারণ কী?”
রামু সেনানিবাস বর্তমানে আরাকান আর্মির সঙ্গে যোগাযোগ ও সরবরাহকেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত। ফলে এ সফরকে অনেকেই স্বাভাবিক কূটনৈতিক ভ্রমণের বাইরে এক ধরণের গোপন সামরিক নকশা হিসেবে দেখছেন।
এনসিপি ও জঙ্গি নেটওয়ার্কের অদৃশ্য ভূমিকা
অভ্যন্তরীণ সূত্র বলছে, এনসিপি নামের একটি রাজনৈতিক দল গোপনে জঙ্গি সংগঠনগুলোর রাজনৈতিক ফ্রন্ট হিসেবে কাজ করছে। তদন্তে উঠে এসেছে—কাতার ও তুরস্কভিত্তিক ইসলামিক ব্যাংকের মাধ্যমে পাকিস্তানি গোয়েন্দারা এই দলকে অর্থায়ন করছে। গত তিন মাসে শুধু আঙ্কারা হয়ে করাচিতে ১২.৭ মিলিয়ন ডলার ঢুকেছে এনসিপির শেল অ্যাকাউন্টে।
অভ্যন্তরীণ গোপন নথি থেকে জানা যায়, বাংলাদেশের কয়েকটি নিরাপত্তা বাহিনীতে কৌশলগত বদলি হয়েছে, যেখানে জঙ্গি সহানুভূতিশীল কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হচ্ছে। এখনকার ভূরাজনীতিতে চীন-ভারত প্রতিদ্বন্দ্বিতা বড় ভূমিকা রাখছে। ইসলামাবাদ-দোহা-ইস্তাম্বুল অক্ষকে সমর্থন দিচ্ছে কিছু পশ্চিমা শক্তি, যাদের আগের অবস্থান ছিল সম্পূর্ণ জঙ্গিবাদবিরোধী।
এমনকি যুক্তরাষ্ট্র-পাকিস্তান সম্পর্কও আবার ঘনিষ্ঠ হচ্ছে। পাকিস্তানের সেনাপ্রধান অসিম মুনির সম্প্রতি হোয়াইট হাউসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজে অংশ নিয়েছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন পাকিস্তানি কর্মকররাদের সাম্প্রতিক সফর ও প্রচারণা কেবল কূটনৈতিক নয়; এর পেছনে স্পষ্টভাবে একধরনের ঐতিহাসিক রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিং চলছে, যেখানে বাংলাদেশকে আবারও পাকিস্তানের প্রভাববলয়ে টানার চেষ্টা রয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বাহিনীর ভেতরে জঙ্গি-সহানুভূতিশীল শক্তির অনুপ্রবেশ। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই ষড়যন্ত্রকে শক্তিশালী করছে ভূরাজনীতির নতুন সমীকরণ—বিশেষ করে চীন-ভারত প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও পশ্চিমাদের নীরব সমর্থন।
মন্তব্য করুন