নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশ যখন একটি জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন এই প্রক্রিয়াকে ঘিরে দেশজুড়ে বিতর্ক ও সন্দেহ বাড়ছে। অনেকেই একে ভুয়া ও সাজানো নির্বাচন হিসেবে অভিহিত করছেন, বিশেষ করে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে নির্বাচনের বাইরে রাখার ঘটনায়।
এ প্রেক্ষাপটে, নির্বাসিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পুত্র এবং আওয়ামী লীগের আইসিটি বিষয়ক উপদেষ্টা সাজীব ওয়াজেদ জয় ব্লুমবার্গকে দেওয়া এক ফোন সাক্ষাৎকারে নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে কঠোর প্রশ্ন তুলেছেন।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্তে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা গণতান্ত্রিক নীতির পরিপন্থী এবং এতে লাখো ভোটারের মতামত ও অধিকার উপেক্ষিত হচ্ছে। তাঁর মতে, এমন একটি নির্বাচনের ফল কখনোই জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না এবং এটি দেশের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা আরও বাড়াবে।
সাজীব ওয়াজেদ বলেন, “এই নির্বাচন কোনোভাবেই দেশের সংকট সমাধান করতে পারবে না। ফলাফল সবসময়ই প্রশ্নবিদ্ধ থাকবে এবং এটি মৌলিকভাবে অবৈধ হিসেবে বিবেচিত হবে।”
তিনি আরও দাবি করেন, ‘জাতীয় নিরাপত্তা’র অজুহাতে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা একটি রাজনৈতিক কৌশল মাত্র। এর মাধ্যমে একটি বড় অংশের জনগণকে রাজনৈতিক অংশগ্রহণ থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটকে আরও তীব্র করবে।
অর্থনৈতিক ও সামাজিক ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ
সাজীব ওয়াজেদ সতর্ক করে বলেন, বর্তমান রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা দেশের অর্থনীতিকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ফেলছে। তৈরি পোশাক খাত, যা বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকা শক্তি, তা ক্রমেই চাপের মুখে পড়ছে। উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, সরবরাহ ব্যবস্থার ব্যাঘাত এবং বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে দুর্বল করছে।
তিনি আরও বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক কিছুটা কমলেও, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা শিল্প ও ব্যবসা খাতের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অতীত নিয়ে আত্মসমালোচনা
বিরল আত্মসমালোচনার অংশ হিসেবে সাজীব ওয়াজেদ স্বীকার করেন, ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনের কিছু দাবি যৌক্তিক ছিল এবং সে সময় আওয়ামী লীগ সরকার জনমতের সঙ্গে যথাযথ যোগাযোগ রাখতে ব্যর্থ হয়েছিল। তাঁর মতে, সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া জরুরি।
চরমপন্থা ও সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা
তিনি আরও উদ্বেগ প্রকাশ করেন যে, বর্তমান রাজনৈতিক শূন্যতায় উগ্র ও চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব বাড়তে পারে। এতে নারীদের অধিকার ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন।
মানুষ দ্রুত হতাশ হয়ে পড়বে
সরকারের ভবিষ্যৎ পথচলা সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে সাজীব ওয়াজেদ বলেন, “অর্থনীতি উন্নতি করবে না, আইনশৃঙ্খলার পরিস্থিতি ভালো হবে না, এবং মানুষ খুব দ্রুত হতাশ হয়ে পড়বে—বিশেষ করে যদি নির্বাচনটি প্রশ্নবিদ্ধ হয়।”
তিনি আরও বলেন, অনেক মানুষ ইতোমধ্যেই আগের সময়ের তুলনামূলক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে স্মরণ করছে এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে নিজেদের অনিশ্চিত মনে করছে। নির্বাচন বর্জনের আহ্বানের সঙ্গে সামঞ্জস্য।
সাজীব ওয়াজেদের বক্তব্য আওয়ামী লীগের দেশব্যাপী নির্বাচন বর্জনের আহ্বানের সঙ্গে মিল রয়েছে। দলটির দাবি, এই নির্বাচন একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নয়, বরং ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনকে বৈধতা দেওয়ার একটি কৌশল মাত্র।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি একটি বড় রাজনৈতিক দল ও বিপুলসংখ্যক ভোটারকে বাদ দিয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তবে তা দেশের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার পরিবর্তে আরও রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক চাপ এবং সামাজিক বিভাজন সৃষ্টি করতে পারে।
মন্তব্য করুন