নিজস্ব প্রতিবেদক
ডাকসু নির্বাচন হওয়া এবং না হওয়া নিয়ে সোমবার হঠাৎ অনিশ্চয়তা তৈরির পর ক্যাম্পাস এখন উত্তাল এক শিক্ষার্থীকে ‘গণধর্ষণের’ হুমকির প্রতিবাদে। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমেও এই প্রতিবাদ অনেকটা জায়গা জুড়ে আছে। ‘গণধর্ষণের’ এই হুমকিদাতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরই ছাত্র। যাকে উদ্দেশ্য করে হুমকি দেওয়া হয়েছে তিনিও একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। হুমকিটি ছিল এরকম, ‘হাইকোর্টের বিপক্ষে এখন আন্দোলন না করে আগে একে গণধর্ষণের পদযাত্রা করা উচিত।’
হুমকিপ্রাপ্ত ছাত্রী ডাকসু নির্বাচনে একটি প্যানেল থেকে মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন সম্পাদক পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। কয়েকদিন আগে তিনি ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট প্যানেলের সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদপ্রার্থী এস এম ফরহাদের প্রার্থিতা চ্যালেঞ্জ করে রিট মামলা করেছিলেন। রিট করার কারণ হিসেবে তিনি গণমাধ্যামে জানান, ‘ফরহাদের অবস্থান বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে।
এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে ছাত্রশিবির সমর্থিত ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট প্যানেলের মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন-বিষয়ক সম্পাদক প্রার্থী ফাতিমা তাসনিম জুমা জানিয়েছেন, তিনিও শিবিরের বট আইডির বুলিংয়ের শিকার হয়েছেন। গতকাল সোমবার (১ সেপ্টেম্বর) রাতে ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে এমন কথা জানান তিনি।
পোস্টে ফাতিমা তাসনিম জুমা বলেন, ‘শিবিরের বট আইডির এটাক (অ্যাটাক) আমিও কম খাই নাই। মোটামুটি সবার রুট লেভেলই সেইম, বাম বাদে। এদিকে একটা দলের মনসুরার মতো পোস্টেড নেত্রী সেবাদাসী বললে কোনো প্রতিবাদ হয় না; কিন্তু কে কাকে সমর্থন করসে সেটা নিয়ে তারে নেতা বানাইয়া ফাঁসি চাওয়া যাবে।’
এদিকে জাহাঙ্গীরনগরে জাকসু নির্বাচনেও শিবিরের হাতে সাইবার বুলিংয়ের শিকার হওয়ার অভিযোগ তুলেছেন ছাত্র ইউনিয়ন (অদ্রি-অর্ক), জাহাঙ্গীরনগর সাংস্কৃতিক জোট ও ইন্ডেজেনাস স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশন সমর্থিত ‘সম্প্রীতির ঐক্য’ প্যানেল থেকে সহসাধারণ সম্পাদক (এজিএস-নারী) প্রার্থী ফারিয়া জামান নিকি। তাকেও ক্যাম্পাসে নানা ধরনের ইঙ্গিতপূর্ণ কথা-বার্তা বলা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এমন পরিস্থিতি শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বা জাহাঙ্গীরনগর নয় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে নারীদের হেয় ও চরিত্র হননের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে শিবিরের বিরুদ্ধে। নারী প্রার্থীরা জানান, তাদের উদ্দেশে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য, অশ্লীল ছবি ও ভিডিও তৈরি করে হুমকি দিচ্ছে। তাদের প্রার্থীদের বাড়িতে গিয়েও হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ছাত্র সংসদ নির্বাচনের নারী প্রার্থীরা প্রথম থেকেই নানা ধরনের বুলিংয়ের শিকার হচ্ছিলেন। এর আগেও নারী প্রার্থীরা জানিয়েছিলেন যে, আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু হওয়ার আগে থেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যেমে বিভিন্ন নারী প্রার্থীর বিরুদ্ধে আপত্তিজনক মন্তব্য, গুজব ও ব্যক্তিগত আক্রমণ চলছিল। নারী প্রার্থীরা মানসিক চাপ বোধ করছেন, নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। এটি তাদের নির্বাচনী প্রচারেও বাধা তৈরি করছে। তারা এসব বিষয়ে প্রধান রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে অভিযোগও জানিয়েছেন। কিন্তু সেগুলো খুব বেশি বন্ধ হয়নি। কারণ, সম্ভবত এগুলো শুধু মৌখিক আচরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা। এর বিপরীতে কোনো শাস্তি কিংবা পদক্ষেপ না নেওয়া।
এছাড়া চট্টগ্রামে গণতান্ত্রিক ছাত্রজোটের ওপর হামলার সময়, “সংগঠনের এক নারী কর্মীকে লাথি মারার ভিডিও” সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়, যা ব্যাপক সমালোচনার কারণ হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এ সংকট সমাধান হিসেবে শুধু প্রশাসনিক ব্যবস্থা নয়, বরং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় সাইবার সুরক্ষা ইউনিট, অভিযোগের দ্রুত বিচার ব্যবস্থা এবং প্রার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় নারী শিক্ষার্থীরা ধীরে ধীরে রাজনীতি থেকে সরে যেতে বাধ্য হবেন, যা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য একটি বড় ক্ষতি।
এর আগে গত ৩০ মে বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলি (উদাহরণস্বরূপ: গণতান্ত্রিক ছাত্র কাউন্সিল) সংবাদ সম্মেলনে জানান—রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এবং চট্টগ্রামে তাঁদের শান্তিপূর্ণ মিছিল ও কর্মসূচিতে শিবিরের সন্ত্রাসীরা হামলা চালায়।
মন্তব্য করুন