নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশের বিভিন্ন আদালত এলাকায় বিএনপির সংগঠিত মব হামলার ঘটনা উদ্বেগজনক মাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে। মামলার সুষ্ঠু বিচার না হওয়া, বিচার ব্যবস্থায় অনিয়ম ও অবৈধ লেনদেনের কারণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দিন দিন অবনতির পথে। সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও সাংবাদিকদের ওপর হামলার পাশাপাশি সাধারণ আদালত এলাকায় চাঁদা না দিলে প্রকাশ্যে মব লেলিয়ে দেওয়ার ঘটনায় দেশের বিচার ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।
২২ মে আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য কন্ঠশিল্পী মমতাজের ওপর মানিকগঞ্জ আদালত এলাকায় হামলা হয়। আদালত এলাকায় তার ওপর জুতা ও ডিম নিক্ষেপ করা হয়।
এর আগে ২০২৪ সালের ২০ আগস্ট ঢাকার আদালতে হাজির করা হলে সাবেক মন্ত্রী ড. দীপুমনি ও সাবেক উপমন্ত্রী আরিফ খান জয়ের ওপর হামলা হয়। তাদের আদালতে তুলে রিমান্ড মঞ্জুরের পর কারাগারে নেয়ার পথে আদালত এলাকাতেই তাদের ওপর একদল আইনজীবী হামলা করেন।
৭১ টিভির সাংবাদিক দম্পতি শাকিল আহমেদ ও ফারাজানা রূপাকে ২২ আগস্ট আদালতে হাজির করার সময় ফারজানা রূপাকে পুলিশি নিরাপত্তার মধ্যেই ঘুসি মারা হয়৷ তার স্বামী শাকিল আহমেদ সেসময় চিৎকার করে এই ঘটনার বিচার চান৷
৭ অক্টোবর ঢাকার আদালত এলাকায় হেনস্তার শিকার হন সাবেক মন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরী। তাকে ডিমও ছোড়া হয়। ২৮ এপ্রিল সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হককে নারায়ণগঞ্জের একটি আদালতে হাজির করা হলে তাকে এজলাসের বাইরে পুলিশের সামনেই কিলঘুসি মারা হয়।
এর আগে আনিসুল হক ও সালমান এফ রহমানকে জুতা ও ডিম নিক্ষেপ করা হয় ঢাকার আদালত এলাকায় ১৪ আগস্ট। ২৪ আগস্ট সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিকের ওপর হামলা হয় সিলেটের আদালত এলাকায়। তাকে কিল ঘুসি দেয়া হয়।
দেশের নানা জায়গাতেই বিএনপির কর্মীদের এমন আরো নানা ঘটনা ঘটেছে। তবে আসামি ও আইনজীবীদের ওপর হামলার ঘটনায় কারো বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে বলে জানা যায়নি। বরং হামলার বিভিন্ন ফুটেজে দেখা গেছে, এসব হামলার নানা ঘটনায় অনেক আইনজীবীও জড়িত রয়েছেন। উলটো আসামির পক্ষের আইনজীবীর বিরুদ্ধেই মামলা দায়েরের ঘটনাও ঘটেছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক মন্ত্রী, এমপি ও নেতাদের পক্ষে শুরুর দিকে কোনো আইনজীবী পাওয়া যেত না। পরে যারা আইনজীবী হিসাবে কাজ শুরু করেন তারাও হেনস্তা ও হুমকির শিকার হন। তাদের একজন মোরশেদ হোসেন শাহীন। সাবেক এমপি ব্যারিস্টার সায়েদুল হক সুমনের পক্ষে আদালতে শুনানির পর মিডিয়ায় ব্রিফ করার সময়ই মারধরের শিকার হন তিনি।
ডয়চে ভেলেকে মোরশেদ হোসেন শাহীন বলেন, "আমি হামলার শিকার হয়েছি। আমার চেম্বার ভাঙচুর করা হয়েছে। কিন্তু কোনো প্রতিকার পাইনি। আমাকে শেষ পর্যন্ত হত্যাচেষ্টা মামলার আসামিও করা হয়, যদিও আমি জামিন পেয়েছি।”
বিএনপির মানবাধিকারবিষয়ক সম্পাদক থাকার সময় আসাদুজ্জামান দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সমর্থন নিয়েছেন। তারা গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাসহ আওয়ামী লীগের নামে বিভিন্ন অভিযোগ তোলেন। কিন্তু ৫ আগস্টের পর মানবাধিকার লঙ্ঘন চলে গেছে চূড়ান্ত পর্যায়ে। সূত্র বলছে, অ্যাটর্নি জেনারেল ও আইন মন্ত্রণালয়ে ৬ থেকে ৮ কোটি টাকার লেনদেন না দিতে পারলে মব লেলিয়ে দেওয়া হয়। সেইসঙ্গে তাদের ভুয়া মামলা বাণিজ্য তো আছেই।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, আমাদের অফিস বরাবরই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার পক্ষে, কিন্তু বাস্তবতা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিচার করেও সিদ্ধান্ত নিতে হয়।”
আইন মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা, যিনি দায়িত্বে আছেন কিন্তু পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক থাকার শর্তে বলেন, মব লেলিয়ে দেওয়ার ঘটনাও গড়ে উঠেছে এই অবৈধ লেনদেনের কারণে। যারা আইনি প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করতে চায়, তারা এই ধরনের প্রক্রিয়া ব্যবহার করছে। ভুয়া মামলা দায়ের, অপ্রয়োজনে মামলা টানাটানি এবং নির্যাতন অনেক সময় এই আর্থিক লেনদেনের সাথে জড়িত।”
বিশ্লেষকদের মতে, আইনকে পাশ কাটিয়ে বিচার নিজ হাতে তুলে নেওয়ার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, যা একটি সভ্য ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য অশনিসংকেত। তারা বলছেন, এই ধরনের সহিংসতা শুধুমাত্র রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নয়, বরং সাধারণ নাগরিককেও আতঙ্কিত করছে।”
মন্তব্য করুন