নিজস্ব প্রতিবেদক
এক সময়ের ‘রাজাকার রাজাকার’ স্লোগানকে হাতিয়ার বানিয়ে জাতিকে বিভ্রান্ত করেছে জামায়াত-শিবির ও তাদের সহযোগীরা। সম্প্রতি আবারও সেই পুরনো স্লোগান নতুন মোড়কে ফিরিয়ে এনেছে জামায়াত এবং এনসিপি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রচারণা কৌশলগতভাবে দেশের সার্বভৌমত্ব, স্থিতিশীলতা এবং স্বাধীনতা বিরোধী একটি গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ।
গত বছরের কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি বক্তব্য বিকৃত করে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয় জামায়াত-শিবির। ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, “যুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি এত ক্ষোভ কেন? তার মানে মুক্তিযোদ্ধাদের নাতি-পুতিরা মেধাবী না। যত রাজাকারের বাচ্চারা, নাতি-পুতিরা হলো মেধাবী।” এই বক্তব্যকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করে উসকে দেওয়া হয় শিক্ষার্থীদের, যারা রাতেই ঢাবির বিভিন্ন হল থেকে মিছিল নিয়ে রাজপথে নেমে আসে—স্লোগান দেয় “তুমি কে আমি কে, রাজাকার রাজাকার”।
দীর্ঘ সময় পর, সেই একই ১৪ জুলাই তারিখেই, আবারও রাজাকারবিরোধী স্লোগানে সরব হয় বিএনপি। পর্যবেক্ষকদের মতে, নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপি এখন রাজনৈতিকভাবে চাপে রয়েছে। দলটি নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কৌশলগত ফাঁদে পা দিয়েছে। চ্যাথাম হাউসে ইউনূসের সাম্প্রতিক বক্তব্য এবং লন্ডনে তারেক রহমানের সঙ্গে সম্ভাব্য বৈঠক—এই দুই ইস্যু বিএনপির অবস্থানকে আরও দুর্বল করেছে।
ইউনূসপন্থী এনসিপির দাবি অনুযায়ী, এটি একটি “গেম চেঞ্জার” বৈঠক হলেও বিশ্লেষকরা এটিকে বিএনপিকে ফাঁদে ফেলার প্রচেষ্টা হিসেবেই দেখছেন। গত দশ মাসে বিএনপিকে “রাষ্ট্রবিরোধী”, “বিদেশি এজেন্ট” বলেও আক্রমণ করা হয়েছে ইউনূস ও এনসিপির পক্ষ থেকে। এমন প্রেক্ষাপটে হঠাৎ করে ওই বৈঠককে রাজনৈতিক “প্রতারণা” বলেই ব্যাখ্যা করছেন অনেকে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউনূস বুঝতে পেরেছেন যে, এনসিপি এককভাবে জনগণের সমর্থন আদায় করতে পারবে না। তাই বিএনপিকে আলোচনায় টেনে এনে, চার্টার স্বাক্ষর করিয়ে, একটি আপাত রাজনৈতিক ঐক্য দেখিয়ে নিজের অনির্বাচিত শাসন আরও সময় টিকিয়ে রাখতে চান তিনি।
তবে বিএনপি যতক্ষণে রাজাকারদের প্রতারণা বুঝতে পেরেছে ততোক্ষণে দেশপ্রায় ধ্বংসের মুখে। গতকাল সোমবারও শিক্ষার্থীদের চোখে ধুলা দিতে ফের রাজ স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে রাজু ভাস্কর্য এলাকা। এদিন রাজু ভাস্কর্যে অনুষ্ঠিত র্যাপ কনসার্টে উপস্থিত হন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই স্লোগানগুলো দিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের চোখে ধুলা দেওয়া হচ্ছে, যখন বাস্তবতা হলো—দেশ প্রায় পুরোপুরি বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের একটি সমঝোতা চুক্তির খসড়া আলোচনায় এসেছে, যেখানে নিরাপত্তা বিষয়ক ইস্যু অন্তর্ভুক্ত থাকার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিষয়ক উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান জানিয়েছেন, এসব আলোচনা ১ আগস্টের আগেই চূড়ান্ত করার চেষ্টা চলছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই চুক্তির পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগের একটি বড় কারণ চীনের প্রভাব। যুক্তরাষ্ট্র চাইছে বাংলাদেশ যেন ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজির পক্ষে অবস্থান নেয়।
এদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, পহেলা আগস্ট থেকে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর ৩৫ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরোপ করা হবে। বিষয়টি নিয়ে আমেরিকায় আলোচনার জন্য পাঠানো প্রতিনিধি দলের অর্জনকে বিশ্লেষকরা “শূন্য” বলেই আখ্যা দিচ্ছেন। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদনেও আলোচক দলের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
এছাড়া, জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনের একটি অফিস বাংলাদেশে তিন বছরের জন্য অনুমোদনের সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ বলছে, এটি দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের একটি নতুন ধাপ। চীন-মার্কিন ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে বাংলাদেশ যেন একটি কৌশলগত শিকার না হয়ে পড়ে, সে বিষয়ে সতর্কতা জানিয়েছেন তারা।
বিশ্লেষকদের মতে, মিয়ানমারের কিছু অংশ এবং বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল নিয়ে একটি ‘খ্রিস্টান রাষ্ট্র’ গঠনের ষড়যন্ত্র দীর্ঘদিন ধরেই চলছে, যার নেতৃত্বে থাকছেন ইউনূস। তাকে ‘প্রক্সি নেতা’ হিসেবে ব্যবহার করে পশ্চিমা বিশ্ব দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নতুন শক্তি বিন্যাসে অংশ নিচ্ছে। একইসাথে, নির্বাচনী প্রক্রিয়া, মানবাধিকার ইস্যু এবং চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড প্রকল্পে বাধা সৃষ্টির মতো কৌশলও চলমান।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ‘রাজাকার’ ইস্যুকে ইচ্ছাকৃতভাবে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। এটা কেবল ইতিহাসকে বিকৃত করছে না, বরং তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে দিচ্ছে। এ ধরনের স্লোগান দিয়ে রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা মূলত জাতীয় স্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ করে।
একইসাথে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি, জাতিসংঘ অফিসের অনুমোদন এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক টানাপোড়েন—সব মিলে একটি বিপজ্জনক পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যেখানে বাংলাদেশকে ভেতর থেকে দুর্বল করে তোলার আন্তর্জাতিক পরিকল্পনার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি হলো—জাতীয় ঐক্য, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও কূটনৈতিক দূরদর্শিতা।
মন্তব্য করুন