দেশে চলমান লোডশেডিং ও শিল্পখাতে গ্যাস সংকট সামাল দিতে আবারও ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর নির্ভরতা বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে সরকার। বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ব্যবহার কমিয়ে শিল্পখাতে সরবরাহ বাড়াতে তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে প্রায় ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়েছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। তবে এতে গ্যাসের তুলনায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় প্রায় ছয়গুণ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
উচ্চমূল্যের অভিযোগে সীমিত করা হয়েছিল তেলভিত্তিক কেন্দ্র
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে স্থাপিত বেসরকারি তেলভিত্তিক কুইক রেন্টাল ও আইপিপি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিতর্ক রয়েছে। বিশেষ করে ক্যাপাসিটি চার্জ এবং তুলনামূলক বেশি উৎপাদন ব্যয় নিয়ে এসব কেন্দ্রের সমালোচনা করা হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ কেনার বিষয়টি সামনে এনে তেলভিত্তিক অনেক কেন্দ্রের উৎপাদন সীমিত রাখা হয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি সংকট এবং চাহিদা-সরবরাহের ব্যবধান বাড়ায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং তীব্র হয়ে ওঠে।
এবার সেই কেন্দ্রগুলো থেকেই ৪ হাজার মেগাওয়াটের পরিকল্পনা
বর্তমান পরিস্থিতিতে পিডিবি আবার তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি এইচএফও কেন্দ্রগুলোর সম্মিলিত উৎপাদন সক্ষমতা চার হাজার মেগাওয়াটের বেশি হলেও পুরো সক্ষমতা এতদিন ব্যবহার করা হচ্ছিল না। এখন এসব কেন্দ্র থেকে প্রায় চার হাজার মেগাওয়াট উৎপাদনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাসের ব্যবহার কমানো। এতে যে গ্যাস সাশ্রয় হবে, সেটি শিল্পকারখানায় সরবরাহ করে উৎপাদন সচল রাখার চেষ্টা করা হবে।
তবে এই পরিকল্পনার বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ব্যয়। গ্যাসের পরিবর্তে ফার্নেস অয়েল ব্যবহার করে একই পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ কয়েকগুণ বেড়ে যেতে পারে। পিডিবির হিসাব অনুযায়ী, তেল থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় গ্যাসের তুলনায় প্রায় ছয়গুণ বেশি হতে পারে।
পরিস্থিতি সম্পর্কে পিডিবি চেয়ারম্যান রেজাউল করিম বলেছেন, “মাঝে মাঝে তো গভর্মেন্টকে ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট করতে হয়।”
যে কেন্দ্র নিয়ে সমালোচনা, সংকটে সেখানেই নির্ভরতা
ফলে বিদ্যুৎ খাতে এক ধরনের নীতিগত বৈপরীত্য সামনে এসেছে। যে তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোকে উচ্চ ব্যয়ের কারণে সীমিত রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট সামাল দিতে এখন সেগুলোর উৎপাদনই উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
স্বল্পমেয়াদে এতে লোডশেডিং কমানো এবং শিল্পখাতে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব হলেও বাড়তি উৎপাদন ব্যয়ের চাপ শেষ পর্যন্ত বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক অবস্থার ওপর কতটা প্রভাব ফেলবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
বিশেষ করে তেলভিত্তিক বিদ্যুতের অতিরিক্ত ব্যয় সরকার কীভাবে বহন করবে এবং ভবিষ্যতে এর কোনো অংশ গ্রাহকের বিদ্যুৎ বিলের ওপর গিয়ে পড়ে কি না—সেদিকেও নজর থাকবে।
মন্তব্য করুন