চলতি সেপ্টেম্বরের প্রথম ২৪ দিনে ঢাকার কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগার ও কাশিমপুর কারাগারে বন্দি অবস্থায় অন্তত ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, তাঁদের মধ্যে সাতজন আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী এবং বাকি তিনজন মাদক মামলার আসামি ছিলেন।
সর্বশেষ ২৩ সেপ্টেম্বর রাতে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের দুই বন্দি মোহাম্মদ ইফতেখার মাহমুদ (৩৬) ও মোহাম্মদ তোফাজ্জল হোসাইন পলাশ (৩৮)। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে কারা কর্তৃপক্ষের বরাতে জানানো হয়েছে, দুজনই কারাগারে অসুস্থ হয়ে পড়ার পর হাসপাতালে নেওয়া হন।
ইফতেখার মাহমুদ ১৯ সেপ্টেম্বর কারাগারে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চার দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ২৩ সেপ্টেম্বর রাত ৯টার দিকে তাঁর মৃত্যু হয়। একই রাতে তোফাজ্জল হোসাইন পলাশকে অচেতন অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হলে পরে তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
এ মাসের শুরু থেকে আরও একাধিক বন্দির মৃত্যুর খবর এসেছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন বাবুল হোসেন, মো. রফিকুল ইসলাম, আব্দুল বারেক, আব্দুল মাবুদ, আলী আকবর মণ্ডল, আবুল বাশার, আবদুল কাইয়ুম ও শাহাদাত হোসাইন লিটন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অসুস্থতার পর হাসপাতালে নেওয়া কিংবা চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুর তথ্য জানিয়েছে কারা কর্তৃপক্ষ।
তবে এসব মৃত্যুর রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে প্রকাশিত তথ্য সব ক্ষেত্রে সমানভাবে স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি। তাই “১০ জনের মধ্যে সাতজন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী” তথ্যটি সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে প্রকাশিত দাবি হিসেবে বিবেচনা করা উচিত, যতক্ষণ না কারা অধিদপ্তর বা অন্য কোনো নির্ভরযোগ্য সংস্থা পূর্ণ তালিকা প্রকাশ করে।
কারা হেফাজতে রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের মৃত্যু নিয়ে আগেও উদ্বেগ
এটি বিচ্ছিন্ন কোনো নতুন উদ্বেগ নয়। মানবাধিকার সাংস্কৃতিক ফাউন্ডেশনের তথ্য উদ্ধৃত করে ডয়চে ভেলে গত জুলাইয়ে জানায়, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত নিরাপত্তা হেফাজতে মোট ২৫৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ২২৭টি মৃত্যু কারা হেফাজতে এবং ৩০টি পুলিশ হেফাজতে। একই প্রতিবেদনে আওয়ামী লীগের ৪৩ নেতাকর্মীর নিরাপত্তা হেফাজতে মৃত্যুর তথ্য উল্লেখ করা হয়।
২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে কারা হেফাজতে ৩৯ জনের মৃত্যুর তথ্যও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রতিবেদনে এসেছে। তাঁদের মধ্যে ১২ জন আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে প্রকাশিত হয়েছে। এই ধারাবাহিকতা নিয়ে মানবাধিকারকর্মীরা কারাগারের চিকিৎসাব্যবস্থা, অতিরিক্ত বন্দি এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কোনো বৈষম্য হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
জুন মাসের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির প্রতিবেদনে সারাদেশের কারাগারে সাতজনের মৃত্যুর কথা বলা হয়। তাঁদের মধ্যে একজন আওয়ামী লীগ, একজন বিএনপি এবং পাঁচজন সাধারণ বন্দি ছিলেন।
অতিরিক্ত বন্দি ও চিকিৎসা সংকট
কারা কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, অনেক বন্দিই কারাগারে আসার সময় বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত থাকেন এবং গুরুতর অসুস্থ হলে তাঁদের হাসপাতালে পাঠানো হয়। তবে কারাগারগুলোর হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক, টেকনোলজিস্ট ও প্রশিক্ষিত জনবলের ঘাটতির অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
মানবাধিকারকর্মীরাও বলছেন, কারাগারে অতিরিক্ত বন্দি, পর্যাপ্ত চিকিৎসাসুবিধার অভাব এবং দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা বন্দিদের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে।
কারা হেফাজতে মৃত্যু মানেই নির্যাতন বা রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো তথ্য সব ক্ষেত্রে নেই। তবে অল্প সময়ে একের পর এক মৃত্যু, বিশেষ করে রাজনৈতিক মামলায় আটক ব্যক্তিদের মৃত্যুর ঘটনা, স্বাধীন তদন্ত, ময়নাতদন্তের স্বচ্ছতা এবং বন্দিদের চিকিৎসার অধিকার নিশ্চিত করার প্রশ্নকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলছে।
সূত্র: ইউএনবি, বিডিনিউজ২৪, বাংলা ট্রিবিউন, যুগান্তর, ইত্তেফাক, ডয়চে ভেলে, এইচআরএসএস।
মন্তব্য করুন