নিজস্ব প্রতিবেদক
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের ‘মব ভায়োলেন্স’ বন্ধে সরকারের কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি প্রকাশ্যে মিথ্যাচার বলে সমালোচিত হয়েছে। রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে নুরুল হক ওরফে ‘নুরাল পাগলা’র মরদেহ কবর থেকে তুলে পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় উগ্রপন্থী জনতার হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের পরও সরকারের নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টরা রিজওয়ানার এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্যে হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন, যা দেশের চলমান আইনশৃঙ্খলার অবনতিকে আরও স্পষ্ট করছে।
সরকারের দায়সারা বিবৃতি
রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে নিজেকে ‘ইমাম মাহদি’ দাবি করা নুরুল হক ওরফে নুরা পাগলার মরদেহ কবর থেকে তুলে পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাকে অন্তর্বর্তী সরকার ‘অমানবিক ও জঘন্যতম অপরাধ’ আখ্যা দিয়ে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। শুক্রবার (৫ সেপ্টেম্বর) সরকারের প্রেস উইং থেকে জারি করা এক বিবৃতিতে এই প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করা হয়। তবে বিশ্লেষকরা এই বিবৃতিকে ‘দায়সারা’ ও ‘প্রকৃত পদক্ষেপের অভাবে ফাঁকা বুলি’ হিসেবে সমালোচনা করেছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, “এ ধরনের বিবৃতি জনগণের ক্ষোভ প্রশমনের জন্য দেওয়া হয়, কিন্তু বাস্তবে এর পেছনে কোনো দৃঢ় পদক্ষেপ থাকে না। এই ঘটনার তদন্তে স্বচ্ছতা ও জড়িতদের দ্রুত বিচার না হলে সরকারের প্রতিশ্রুতি শুধুই কথার কথা হয়ে থাকবে।” তিনি আরও মনে করেন, এ ধরনের ঘটনা সমাজে ধর্মীয় উন্মাদনা ও অরাজকতার প্রতিফলন, যা প্রতিরোধে সরকারের ব্যর্থতা স্পষ্ট।
স্থানীয় সাংবাদিক রহিম মিয়া বলেন, “এই ঘটনা শুধু নুরা পাগলার মরদেহের প্রতি অবমাননাই নয়, বরং আইনশৃঙ্খলার সম্পূর্ণ ভাঙনের চিত্র। সরকারের বিবৃতিতে কঠোর শাস্তির কথা বলা হলেও, এখন পর্যন্ত কোনো গ্রেপ্তার বা তদন্তের অগ্রগতির খবর পাওয়া যায়নি। এটি জনমনে সরকারের প্রতি অবিশ্বাস তৈরি করছে।”
বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই ঘটনার পর সরকারের উচিত ছিল তাৎক্ষণিকভাবে তদন্ত কমিটি গঠন করে জড়িতদের গ্রেপ্তারে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া। কিন্তু শুধুমাত্র বিবৃতি প্রকাশের মাধ্যমে সরকার দায় এড়ানোর চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তারা সরকারের কাছে দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে জড়িতদের শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
মবের পক্ষে সরকার
জাতীয় নাগরিক পার্টির দক্ষিণাঞ্চলীয় নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ বলেছেন, “মব নয়, এটা জনরোষ। যারা বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরি করেছে, তাদের বিচার না হওয়াতেই এই ক্ষোভ।”
সাবেক বিএনপি নেতা ও বর্তমান অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান বলেন, “মবের ঘটনাগুলো বিচার বিভাগের প্রতি অনাস্থা নয়, বরং গত ১৭ বছরের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ।” তার এই বক্তব্যে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মানবাধিকার কর্মীরা, যাদের মতে, এমন মন্তব্য রাষ্ট্রীয় সহিংসতাকে বৈধতা দেয়।
২৬ জুন রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে এক সেমিনারে প্রেস সচিব বলেন, “বলা হচ্ছে মব তৈরি হচ্ছে, আমি এটাকে মব বলছি না, বলছি প্রেসার গ্রুপ। সেটা তৈরি হচ্ছে সাংবাদিকতার ব্যর্থতার কারণে। তিনি অভিযোগ করেন, ১৫ বছরের সরকারে থাকা অবস্থায় গণমাধ্যমের স্বাধীনতা হরণ এবং রাষ্ট্রীয় হিংস্রতা জন্ম দিয়েছে বর্তমান ‘ভয়ের সংস্কৃতি’। এর মধ্যে এক ধরনের জনরোষ জমে উঠে মব হিসেবে প্রকাশ পাচ্ছে।
বাংলাদেশ এখন এক ধরনের হাইব্রিড অরাজকতার মুখোমুখি—যেখানে প্রোপাগান্ডা, গুজব, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক ভয়াবহ পরিস্থিতি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, "সন্ত্রাস যে করে, তার ঘৃণা যেন তৃণসম দহে"—এই নীতিতে ফিরতে না পারলে সহিংসতা আরও বাড়বে, আর গণতন্ত্র আরও সংকুচিত হবে।
প্রশাসন, রাজনৈতিক দল, মিডিয়া ও নাগরিক সমাজ—সব পক্ষের এখন প্রয়োজন সচেতনতা, দায়িত্বশীলতা ও দ্রুত পদক্ষেপ। নইলে, এই 'মব' ও জঙ্গিবাদ কেবল দুটি শব্দ নয়—এটি হয়ে উঠবে জাতির ভবিষ্যতের অভিশাপ। প্রশ্ন ওঠে সরকার যখন মবকে স্বীকারই করে না তাহলে কিসের বিরুদ্ধে তারা ব্যবস্থা নিচ্ছে। আর এটি স্পষ্টতই একটি প্রতারণা, যা প্রতিনিয়ত জনগণের সঙ্গে করা হচ্ছে।
এর আগে সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ভোলাগঞ্জে ‘সাদাপাথর’ এলাকায় লুটপাট হলে সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেছিলেন, আগের চার বছর জাফলং-এ পাথর উত্তোলন বন্ধ রাখতে পেরেছিলাম, এখন আমি উপদেষ্টা হয়েও পারলাম না। অর্থাৎ উপদেষ্টা হয়ে তিনি নিজের ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে নিয়েছেন তখনই।
অভিযোগ রয়েছে, রিজওয়ানা আওয়ামী লীগের আমলে বিভিন্ন আবাসন প্রজেক্টের কাছ থেকে পরিবেশের দোহাই দিয়ে চাঁদা দাবি করতেন। অনেক কোম্পানি তাঁকে লাঞ্ছিতও করেছে এ ঘটনায়। তবে সরকারের আসার পর এবার তিনি বসুন্ধরা, যমুনাসহ বিভিন্ন আবাসন প্রকল্পের কাছ থেকে শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। এছাড়া রিজওয়ানার নাম ব্যবহার করে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার চাঁনমারিতে জমি দখলের চেষ্টা ও স্থানীয় পত্রিকা অফিস ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে শহরের আলোচিত সন্ত্রাসী রিন্টু বাহিনীর বিরুদ্ধ্বে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ এখন এক ধরনের হাইব্রিড অরাজকতার মধ্যে পড়েছে—যেখানে প্রোপাগান্ডা, গুজব, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা এবং প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা মিলেমিশে ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি তৈরি করছে। তারা সতর্ক করেছেন, অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে তব ঘৃণা যেন তারে তৃণসম দহে। যদি এই নীতিতে ফেরা না যায়, তবে সহিংসতা আরও বাড়বে, আর গণতন্ত্র আরও সংকুচিত হবে।”
মন্তব্য করুন