অনলাইন ডেস্ক
বাংলাদেশে সরকার পতনে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা এখন আর গোপন বিষয় নয়, বরং “ওপেন সিক্রেট”। সেই ষড়যন্ত্রের দিকেই এবার ইঙ্গিত দিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। সম্প্রতি মার্কিন অঙ্গরাজ্য ইউটাহ থেকে প্রকাশিত দৈনিক ডেজারেট নিউজ-এ লেখা এক নিবন্ধে তিনি উল্লেখ করেন, “এই গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে আমাদের সঙ্গে অংশীদার হওয়ার সুযোগ ও দায়িত্ব যাদের রয়েছে—তাঁদের মধ্যে ইউটাহের আমাদের বহু বন্ধু অন্তর্ভুক্ত। তাঁরাই আমাদের সেরা আশা—এবং সম্ভবত শেষ আশাও।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এ বক্তব্য স্পষ্ট করে দিচ্ছে—দেশীয় জনরোষের মুখে পড়া ড. ইউনূস এখন ভরসার জায়গা হিসেবে আমেরিকাকেই দেখছেন।
দীর্ঘমেয়াদি নীলনকশা
এর আগেও একাধিক সূত্র দাবি করেছিল, বাংলাদেশের সরকার পরিবর্তন যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি ভূরাজনৈতিক নীলনকশার অংশ। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নিজেদের প্রভাব বিস্তার এবং চীনের আগ্রাসন ঠেকানোই এর মূল লক্ষ্য। বিশেষ করে মিয়ানমারে চীন-সমর্থিত গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্প শুরু হওয়ার পর থেকে ওয়াশিংটন এ অঞ্চলে কৌশলগতভাবে আরও সক্রিয় হয়েছে।
রোহিঙ্গা ইস্যু, মানবিক করিডোর এবং চট্টগ্রাম বন্দরের মতো বিষয়গুলো এখন চীন-যুক্তরাষ্ট্র প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।
‘খ্রিস্টান রাজ্য’ ষড়যন্ত্র?
এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অংশ ও মিয়ানমারের কিছু অঞ্চল নিয়ে একটি সম্ভাব্য “খ্রিস্টান রাষ্ট্র” গঠনের ষড়যন্ত্রের অভিযোগও নতুন করে সামনে আসছে। পূর্ব তিমুরের ঘটনাকে এর সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও একাধিকবার সতর্ক করেছিলেন যে, বাংলাদেশে একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের পরিকল্পনাও সেই ষড়যন্ত্রের অংশ।
ইউনূসকে ‘প্রক্সি নেতা’ বানানো
নানা বিশ্লেষকের মতে, নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে বাইডেন প্রশাসন এই পরিকল্পনায় “প্রক্সি নেতা” হিসেবে ব্যবহার করছে। তাঁকে জাতিসংঘ মহাসচিব বানানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে পশ্চিমা স্বার্থ রক্ষায় মাঠে নামানো হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। পরিকল্পনার মধ্যে মিয়ানমারের বিদ্রোহীদের সহায়তা, চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগে বাধা দেওয়া এবং বাংলাদেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করাও অন্তর্ভুক্ত।
সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন
ইতোমধ্যেই অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি বিতর্কিত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের ওপর আরোপিত ৩৫ শতাংশ শুল্ক কমাতে রাজি হলেও এর বিনিময়ে একাধিক কঠিন শর্ত চাপিয়েছে, যা অর্থনীতি, সামরিক নীতি, তথ্যপ্রযুক্তি এবং কৌশলগত খাতে মার্কিন প্রভাব বাড়িয়ে তুলবে। বিশেষজ্ঞরা একে “জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে আপস” এবং “সার্বভৌমত্ব বিসর্জন” বলে অভিহিত করছেন।
বাণিজ্য উপদেষ্টার নেতৃত্বে আমেরিকা সফরকারী প্রতিনিধিদলও দৃশ্যমান কোনো সাফল্য ছাড়াই দেশে ফিরেছে। ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসি-র প্রতিবেদনে আলোচক দলের যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, “নন-ডিসক্লোজার ক্লজ”-এর কারণে আলোচনার মূল বিষয়বস্তু গোপন রাখা হয় এবং বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আগাম আলোচনা করা হয়নি।
জাতিসংঘ মিশন ও রোহিঙ্গা সম্মেলন
এদিকে জাতিসংঘের মানবাধিকার হাই কমিশনারের একটি স্থায়ী মিশন বাংলাদেশে স্থাপনের প্রস্তাব অনুমোদিত হওয়ায় নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে।
অন্যদিকে, আসন্ন জাতিসংঘ আয়োজিত রোহিঙ্গা সম্মেলন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সমালোচকদের মতে, এ সম্মেলনের আড়ালে মূলত মার্কিন বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে আনাই যুক্তরাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য। এ কারণে বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারের উচিত “লোকদেখানো প্রতিশ্রুতি” না দিয়ে জাতির সামনে প্রকৃত পরিস্থিতি তুলে ধরা।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এ পরিস্থিতিতে একটি গ্রহণযোগ্য, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন না হলে দেশের সার্বভৌমত্ব ও অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে। ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ যেন অন্য শক্তির হাতিয়ার হয়ে না যায়—সে বিষয়ে জনগণকেও সজাগ থাকতে হবে।
মন্তব্য করুন