নিজস্ব প্রতিবেদক
শেখ হাসিনার নাটকীয় পতনের প্রায় এক বছর পেরিয়ে গেছে। গণতান্ত্রিক পুনর্জাগরণের বদলে বাংলাদেশ এখন নিমজ্জিত হয়েছে ভয়াবহ এক বিশৃঙ্খলার মধ্যে। এখানে প্রায়ই ঘটছে গণপিটুনি, যৌন সহিংসতা, ধর্মীয় নিপীড়ন। বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকেও পঙ্গু করে দেওয়া হয়েছে। মুহাম্মদ ইউনুসের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে আইন, ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদা সবই ধূলিসাৎ হচ্ছে।
গণপিটুনি: আতঙ্কে দেশ
বাংলাদেশজুড়ে গণপিটুনির ঘটনা ব্যাপকভাবে বেড়েছে, এতে শত শত মানুষ নিহত এবং আরও অনেকে আহত হয়েছেন। দ্য ইকোনমিক টাইমস-এর রিপোর্টে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে এখন পর্যন্ত ৬৩৭ জন গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক শূন্যতাকে কাজে লাগাচ্ছে উগ্রপন্থীরা।
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি জানায়, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত ১১৯টি গণহত্যা এবং ৭৪ জন আহত হয়েছেন। দ্য ডেইলি স্টার জানিয়েছে, শুধু ২০২৪ সালেই গণপিটুনিতে ১৭৯ জন নিহত হয়েছেন—যা গত দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। সহিংসতার শিকার হয়েছেন শিক্ষক থেকে শুরু করে মানসিক রোগী পর্যন্ত। ঢাবির তোফাজ্জল হোসেনকে মিথ্যা চুরির অভিযোগে হত্যা করা হয়।
যৌন সহিংতা বেড়েছে—রাষ্ট্রও নীরব
সহিংসতা বাড়ার সাথে সাথে ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের ঘটনাও বেড়েছে। বিশেষত নারী ও শিশুরা এর শিকার হচ্ছে বেশি। আওয়ামী লীগের তথ্য অনুযায়ী, কেবল ২০২৫ সালের জুন মাসেই ৬৩টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ১৭টি ছিল সংঘবদ্ধ ধর্ষণ। ভুক্তভোগীদের মধ্যে নাবালিকা, প্রতিবন্ধী ও কিশোরীরা ছিল।
সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ছিল মাগুরায় আট বছরের এক শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা, যা দেশজুড়ে ক্ষোভ ছড়ায়। আদালত মৃত্যুদণ্ড দিলেও ঘটনাটি বিচার ব্যবস্থার গভীর ব্যর্থতাকে উন্মোচিত করেছে। জনঅসন্তোষ বাড়ায় সরকার পরে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, ধর্ষণ মামলার তদন্ত ১৫ দিনের মধ্যে শেষ এবং বিচার ৯০ দিনের মধ্যে সম্পন্ন করা হবে।
সাম্প্রদায়িক ও ধর্মীয় নিপীড়ন তীব্রতর হয়েছে
ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা—বিশেষ করে হিন্দুরা—সবচেয়ে ভয়াবহ নিপীড়নের শিকার হয়েছে। ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত ২,৪৪২টি ঘৃণাজনিত অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, যার মধ্যে হত্যা, যৌন নিপীড়ন, অগ্নিসংযোগ ও মন্দির ভাঙচুর রয়েছে।
জাতিসংঘের একটি তদন্ত মিশন নিশ্চিত করেছে যে হিন্দু, আহমদিয়া মুসলিম এবং আদিবাসীদের ওপর ব্যাপক গণআক্রমণ হয়েছে—যা ইউনূসের সংখ্যালঘুদের নিয়ে অতিরঞ্জিত প্রচার মিথ্যা প্রমাণ করেছে। চট্টগ্রাম পাহাড়ি অঞ্চলের আদিবাসীরা বিশেষভাবে আক্রান্ত হচ্ছে। উগ্র ছাত্রগোষ্ঠীগুলো তাদের সংস্কৃতি মুছে দিয়ে সহিংসতায় ঠেলে দিচ্ছে।
ধ্বংসপ্রায় প্রতিষ্ঠান; উগ্রপন্থার উত্থান
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ভেঙে পড়ায় রাস্তায় অপরাধীদের দাপট বেড়েছে। দ্য ডেইলি পাইওনিয়ার জানিয়েছে, খুন, ডাকাতি, মাদক ব্যবসা, ধর্ষণ ও গ্যাং অপরাধ বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে বেড়েছে। শুধু ২০২৪ সালের শেষের দিকে খুনের সংখ্যা দ্বিগুণ বেড়েছে।
সরকার ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে “অপারেশন ডেভিল হান্ট” চালায় এবং সাবেক শাসক দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অভিযোগে সাড়ে ১১ হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করে। তবে সমালোচকরা বলছেন এটি ছিল রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক অভিযানের অংশ, প্রকৃত সংস্কারের প্রচেষ্টা নয়।
শাসন ও নিরাপত্তা জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে
সরকার স্থিতিশীলতার প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে এক বছর পরেও বাংলাদেশ রয়ে গেছে রাজনৈতিক অস্থিরতা, সহিংসতা ও জঙ্গিবাদ। বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) জানিয়েছে, সংস্কারের লক্ষ্য থাকা সত্ত্বেও প্রাতিষ্ঠানিক নির্যাতন ও বিভাজনমূলক পরিবেশ বহাল আছে।
ইন্ডিয়া টুডে-কে উদ্ধৃত করে সামাজিক বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশটি এখন “প্রতিহিংসার প্রজাতন্ত্র”—যেখানে নারী ও সংখ্যালঘুরা বাড়তি হামলার শিকার, উগ্রবাদীরা নির্বিঘ্নে কাজ করছে, আর রাষ্ট্র সবকিছু অস্বীকার করছে।
ভাঙনের দ্বারপ্রান্তে বাংলাদেশ
ইউনূসের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে বাংলাদেশ পরিণত হয়েছে সহিংসতা, অবিচার ও ভয়ের এক অগ্নিকুণ্ডে। গণপিটুনি থেকে শুরু করে অবাধ ধর্ষণ, সাম্প্রদায়িক নিধন থেকে উগ্রবাদের উত্থানের মতো ঘটনা ঘটেই যাচ্ছে। রাষ্ট্র তার নাগরিকদের রক্ষা করতে ব্যর্থ বা অনিচ্ছুক।
যদি জরুরি ও আন্তরিক সংস্কার না আসে এবং ন্যায়বিচার পুনঃপ্রতিষ্ঠিত না হয়, তবে বাংলাদেশ তার গণতান্ত্রিক রূপ হারানোর ঝুঁকিতে থাকবে। প্রশ্ন রয়ে যায়—দেশ কি এই পতন থেকে উঠে দাঁড়াতে পারবে, নাকি অন্ধকারে ডুবে যাবে?
মন্তব্য করুন