নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রাকৃতিক সম্পদ উত্তোলনের জন্য সব ধরনের ক্রয় প্রক্রিয়া পুরোপুরি উন্মুক্ত ও স্বচ্ছ করতে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানিয়েছে আমেরিকা। এর ফলে বিগত সরকারের অধীনে চলমান সব সরাসরি দরকষাকষি বা আলোচনা স্থগিত করা হয়েছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, এ বার্তার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সম্পদে নিজেদের নিয়ন্ত্রণের কথা জানিয়ে দিল আমেরিকা।
শুক্রবার (১৯ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা প্রতিবেদন ২০২৫-এ এ আমেরিকার পক্ষ থেকে এ তথ্য জানানো হয়।
বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের বিশাল সমুদ্রসীমার মূল্যবান খনিজ সম্পদ, যার মধ্যে রয়েছে ইউরেনিয়াম, থোরিয়াম, এবং সিমেন্ট উৎপাদনের কাঁচামাল ‘ক্লে’, এখন লুটপাটের হুমকির মুখে। গত ২১ আগস্ট থেকে ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নরওয়ের অত্যাধুনিক গবেষণা জাহাজ ‘আর ভি ড. ফ্রিডজোফ নানসেন’ বাংলাদেশের সামুদ্রিক জলসীমায় মৎস্যসম্পদ ও ইকোসিস্টেম জরিপের নামে প্রবেশ করছে।
তবে এই জরিপের আড়ালে অগভীর সমুদ্রের তলদেশে থাকা ইউরেনিয়াম, থোরিয়াম, এবং অন্যান্য মূল্যবান খনিজ সম্পদ লুটের পরিকল্পনা রয়েছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন বিশেষজ্ঞরা। এই উদ্যোগকে কেন্দ্র করে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফরিদা আখতার এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ভূমিকা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন।
৫ আগস্টের পর থেকে দেশে চলছে লুটপাটের মহাযজ্ঞ। এই সময়ে সরকারের নানা সংস্থা নিষ্ক্রিয় থাকায় বিদেশি কোম্পানিগুলো বাংলাদেশের সমুদ্র সম্পদের উপর নজরদারি বাড়িয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৬ সালের ২০ জুলাই বলেছিলেন, “সমুদ্রের এসব মূল্যবান খনিজ সম্পদ দ্রুত আহরণের ব্যবস্থা করতে হবে, নইলে তা বেহাত হয়ে যাবে।” তাঁর এই দূরদর্শী উক্তি এখন বাস্তবে রূপ নিচ্ছে। তাঁর নেতৃত্বে ২০১২ সালে ভারত এবং ২০১৪ সালে মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার সমুদ্রসীমা অর্জন করে।
এই বিজয়ের ফলে বঙ্গোপসাগরের তলদেশে থাকা তেল, গ্যাস, ইউরেনিয়াম, থোরিয়াম, এবং ভারী খনিজ বালুসহ বিপুল সম্পদের উপর বাংলাদেশের সার্বভৌম অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি সমুদ্র সম্পদের সঠিক ব্যবহার ও সংরক্ষণের জন্য বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট (বিওআরআই) প্রতিষ্ঠার মতো গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন।
বাংলাদেশ ও জার্মানির যৌথ জরিপে জানা গেছে, বঙ্গোপসাগরের ৮০ থেকে ১১০ মিটার গভীরতায় ইউরেনিয়াম, থোরিয়াম, এবং ভারী খনিজ বালু যেমন ইলমেনাইট, গার্নেট, সিলিমানাইট, জিরকন, রুটাইল ও ম্যাগনেটাইটের বিপুল মজুদ রয়েছে। এছাড়া ১৪০০ থেকে ৩৭০০ মিটার গভীরতায় ম্যাঙ্গানিজ ক্রাস্ট, সালফাইড, এবং কোবাল্ট, ভানাডিয়াম, মলিবডেনাম, প্লাটিনাম, সোনা ও রুপার মতো দুষ্প্রাপ্য ধাতু পাওয়া গেছে। অগভীর সমুদ্রে ‘ক্লে’র মজুদ সিমেন্ট শিল্পে বিপ্লব আনতে পারে। কক্সবাজারের নাজিরারটেক থেকে টেকনাফের বদরমোকাম পর্যন্ত ১২০ কিলোমিটার উপকূলীয় এলাকায় ২ কোটি ৪৯ লাখ টনেরও বেশি খনিজ পদার্থের মজুদ রয়েছে, যার মধ্যে মোনাজাইটের মতো তেজস্ক্রিয় পদার্থ পারমাণবিক শক্তি উৎপাদনে ব্যবহার করা যায়।
প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা আট বছরেও নিজ দেশ মিয়ানমারে ফিরতে পারেনি। উল্টো তাদের অনুপ্রবেশ অব্যাহত রয়েছে। এদিকে রাখাইন রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ এখন আরাকান আর্মির হাতে, যা প্রত্যাবাসনের পথ আরও কঠিন করে তুলেছে। এমন পরিস্থিতিতে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের দিকে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি ফেরাতে আজ রোববার কক্সবাজারে শুরু হচ্ছে তিন দিনের আন্তর্জাতিক সম্মেলন। এ আয়োজনের আগেই বড় ধরনের সংঘাতের শঙ্কায় রাখাইনের বাড়িঘর ছেড়ে বাংলাদেশে প্রবেশের আশায় সীমান্তে অবস্থান করছেন হাজারো রোহিঙ্গা। এপারে ভেসে আসছে ওপারে সংঘাতের গোলাগুলির শব্দ। অনুপ্রবেশ ঠেকাতে টেকনাফ সীমান্তে টহল জোরদার করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।
কক্সবাজার এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো স্পর্শকাতর এলাকাগুলোতে আমেরিকান প্রভাব বৃদ্ধির অভিযোগ উঠেছে। সূত্র জানায়, কক্সবাজারের নাজিরারটেক থেকে টেকনাফ পর্যন্ত ১২০ কিলোমিটার উপকূলীয় এলাকায় ২ কোটি ৪৯ লাখ টনেরও বেশি খনিজ সম্পদ রয়েছে, যার মধ্যে মোনাজাইটের মতো তেজস্ক্রিয় পদার্থ পারমাণবিক শক্তি উৎপাদনে ব্যবহার করা যায়। বঙ্গোপসাগরে ইউরেনিয়াম, থোরিয়াম, এবং সিমেন্ট উৎপাদনের কাঁচামাল ‘ক্লে’-এর বিশাল মজুদ রয়েছে।
কক্সবাজারে গত ২৫ আগস্ট হওয়া ‘অংশীজন সংলাপ
রোহিঙ্গা পরিস্থিতি নিয়ে উচ্চ পর্যায়ের সম্মেলন’ এবং জাতিসংঘের উদ্যোগে ৩০ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজনকে কেন্দ্র করে বিতর্ক তীব্র হচ্ছে। প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা আট বছরেও নিজ দেশ মিয়ানমারে ফিরতে পারেনি। উল্টো তাদের অনুপ্রবেশ অব্যাহত রয়েছে। এদিকে রাখাইন রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ এখন আরাকান আর্মির হাতে, যা প্রত্যাবাসনের পথ আরও কঠিন করে তুলেছে। সূত্র বলছে, মার্কিনিরা কোথায় বিনিয়োগ করেছে তা দেখাতেই আয়োজিত হচ্ছে রোহিঙ্গা সম্মেলন।
জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং রোহিঙ্গা বিষয়ক হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ ড. খলিলুর রহমান দাবি করেছেন, এই সম্মেলনগুলো রোহিঙ্গা সংকটের ‘স্থায়ী ও প্রকৃত সমাধান’ খুঁজে বের করার পথনির্দেশিকা দেবে। তবে রাজনৈতিক দলগুলো এবং বিশ্লেষকরা এই সম্মেলনকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ব্যর্থতা এবং বিদেশি শক্তির হাতে দেশের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল তুলে দেওয়ার একটি নীলনকশা হিসেবে দেখছেন।
চীনের আধিপত্য কমানো বঙ্গোপসাগরের প্রাকৃতিক সম্পদ হাতানোর পরিকল্পনা আমেরিকার বহুদিনের। এটি যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি একটি নীলনকশার অংশ, যার লক্ষ্য দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় তাদের আধিপত্য বিস্তার। জাতিসংঘের অফিসের মাধ্যমে ‘মানবাধিকার’ ইস্যুকে সামনে রেখে দেশের রাজনৈতিক ভারসাম্যকে ব্যাহত করা এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করা হতে পারে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, মিয়ানমারে চীন-সমর্থিত গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্পের পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় কৌশলগত অবস্থান নিতে সক্রিয় হয়েছে। রোহিঙ্গা সংকট, মানবিক করিডোর, এবং চট্টগ্রাম বন্দর—সব মিলে এই অঞ্চলটি চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। সেইসঙ্গে বঙ্গোপসাগরে থাকা প্রাকৃতিক সম্পদও উত্তোলন করতে চায় দেশটি।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে একটি “খ্রিস্টান রাজ্য” গঠনের ষড়যন্ত্রের আশঙ্কাও করা হচ্ছে, যা পূর্ব তিমুরের ঘটনার সাথে তুলনা করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এর আগেও সতর্ক করে বলেছিলেন, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের কিছু অংশ নিয়ে এমন একটি রাষ্ট্র গঠনের ষড়যন্ত্র চলছে । তিনি সেন্টমার্টিনে মার্কিনিরা ঘাঁটি করতে চায় সেই কথাও জানিয়েছিলেন।
আমেরিকার বিরুদ্ধে কথা বললেই করা হচ্ছে কণ্ঠরোধ
আমেরিকার এসব ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে কথা বললেই করা হচ্ছে কণ্ঠরোধ। সূত্র বলছে, এরইমধ্যে বেশ কয়েকজন সাংবাদিককে গোয়েন্দা সংস্থা দ্বারা হুমকি দেওয়ানো হয়েছে। সাংবাদিক মাসুদ কামাল ও আনিস আলমগীর এরইমধ্যে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছে। তারা গণমাধ্যমে আর সরব নেই। সাংবাদিক মঞ্জুরুল আলম পান্নাকেও সন্ত্রাস দমন আইনের মামলায় পাঠানো হয়েছে কারাগারে। টকশোতে দেশবিরোধী ষড়যন্ত্র নিয়ে কথা বলায় সাবেক সচিব আবু আলম মোহাম্মদ শহীদ খানকে কারাগারে পাঠানো হয়।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এ পরিস্থিতিতে একটি গ্রহণযোগ্য, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন না হলে দেশের সার্বভৌমত্ব ও অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে। ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ যেন অন্য শক্তির হাতিয়ার হয়ে না যায়—সে বিষয়ে জনগণকেও সজাগ থাকতে হবে।
মন্তব্য করুন