একটা হাসপাতালের জেনারেটর অকেজো পড়ে থাকতে পারে কতদিন? বরিশাল জেনারেল হাসপাতালে এই প্রশ্নের উত্তর হলো, "দীর্ঘদিন ধরে।" একশো শয্যার এই হাসপাতালে একমাত্র জেনারেটরটা সচল করার চেষ্টা হয়েছে, ব্যর্থ হয়েছে, তারপর বিষয়টা চাপা পড়ে গেছে ফাইলের নিচে। ফল কী দাঁড়িয়েছে? বিদ্যুৎ গেলে রোগীর ভরসা এখন হাতপাখা, রাতে অন্ধকার তাড়াতে মোমবাতি। এটা কোনো প্রত্যন্ত ইউনিয়নের ক্লিনিকের চিত্র না, এটা একটা জেলা শহরের সরকারি হাসপাতালের বাস্তবতা, যেখানে রাষ্ট্রের কাছ থেকে সবচেয়ে অসহায় মানুষগুলো ন্যূনতম সেবাটুকু পাওয়ার কথা।
শেবাচিমের চিত্রও কম উদ্বেগজনক না। দক্ষিণাঞ্চলের সবচেয়ে বড় চিকিৎসাকেন্দ্র, প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎবিহীন। নতুন ভবনে লিফট বন্ধ থাকে, ফ্যান বন্ধ থাকে, জেনারেটর থাকা সত্ত্বেও জ্বালানির অভাবে সেটা সার্বক্ষণিক চালানো যায় না। অস্ত্রোপচারের মতো স্পর্শকাতর কাজ পর্যন্ত এই সংকটের আওতার বাইরে না। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, বাড়তি সংযোগ আর পর্যাপ্ত জ্বালানি চেয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। প্রশ্ন হলো, এই চিঠি কবে গেছে, আর জবাব কবে আসবে? একটা সরকারি হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটার জ্বালানি সংকটে ঝুঁকিতে পড়ে থাকবে, আর জবাব আসবে "চিঠি বিবেচনাধীন" এই ধরনের আমলাতান্ত্রিক নীরবতায়, এটা কোনো সভ্য প্রশাসনের চেহারা হতে পারে না।
যাদের ওপর মানুষের ক্ষোভ গিয়ে পড়ছে, তারা বিদ্যুৎ উৎপাদন বা বণ্টনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা রাখেন না। মিটার রিডার, লাইনম্যান, সাবস্টেশনের মাঠকর্মী, এরা প্রতিদিন গ্রাহকের রোষের মুখোমুখি হচ্ছেন, কেউ কেউ উত্তেজিত আচরণেরও শিকার হচ্ছেন, অথচ লোডশেডিংয়ের সিদ্ধান্ত হয় তাদের নাগালের অনেক ওপরে, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে। এই বিচ্ছিন্নতাটাই আসল সমস্যা। যে প্রশাসনিক কাঠামোয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এক জায়গায়, আর তার মাশুল গুনতে হয় সম্পূর্ণ ভিন্ন আরেকটা স্তরের মানুষকে, সেই কাঠামো জবাবদিহিতা এড়ানোর একটা কৌশল হয়ে দাঁড়ায়। ক্ষুব্ধ গ্রাহক আর অসহায় মাঠকর্মী, দুই পক্ষই আসলে একই ব্যর্থতার শিকার, শুধু সিদ্ধান্ত নেওয়া মানুষগুলো এই সমীকরণের বাইরে থেকে যাচ্ছেন নিরাপদে।
গ্রীষ্মের একটা মৌসুম আসতেই যদি বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার মৌলিক পরিকল্পনাটাই ভেঙে পড়ে, জ্বালানি বরাদ্দ আর গ্রিড সক্ষমতার মতো পূর্বানুমানযোগ্য বিষয়েও যদি প্রস্তুতি না থাকে, তাহলে ক্ষমতা দখলের আগে "সব ছিঁড়ে আটিঁ বেঁধে ফেলবো" টাইপ আলাপ কেবল পেট গরমের প্রভাব থেকে ছিলো কিনা বিএনপির, সেই প্রশ্ন তোলা অযৌক্তিক না। একটা হাসপাতালের জেনারেটর মাসের পর মাস অকেজো পড়ে থাকা, আরেকটা হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটার জ্বালানি সংকটে ঝুঁকিতে থাকা, এগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা না, এগুলো তদারকি আর আন্তরিকতা অভাবেরই জ্বলজ্বলে প্রমাণ।
মন্তব্য করুন