Insight Desk
প্রকাশ : Sep 4, 2026 ইং
অনলাইন সংস্করণ

শেখ হাসিনার দূরদর্শিতা: শুধু টোলনির্ভর নয়, ভেবে রেখেছিলেন সাধারণের টোলমুক্ত যাতায়াতের কথাও

ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে চালুর তিন বছর পূর্ণ হয়েছে। ২০২৩ সালের ৩ সেপ্টেম্বর যানবাহন চলাচলের জন্য খুলে দেওয়ার পর প্রথম দিন ২২ হাজার ৮০৫টি যানবাহন থেকে টোল আদায় হয়েছিল ১৮ লাখ ৫৩ হাজার টাকা। তিন বছর পর সেই এক্সপ্রেসওয়েতেই এক দিনে যানবাহন চলাচল ৮৫ হাজার ছাড়িয়েছে। সর্বশেষ ৮৫ হাজার ৫৫টি যানবাহন থেকে টোল আদায় হয়েছে ৭২ লাখ ৫৯ হাজার টাকা।

যে প্রকল্পকে একসময় ‘শ্বেতহস্তী’ হবে বলে সমালোচনা করা হয়েছিল, সময়ের সঙ্গে তার ব্যবহার বেড়েছে বহুগুণ। পুরো এক্সপ্রেসওয়ে চালু হলে প্রতিদিন প্রায় দেড় লাখ যানবাহন চলাচলের সক্ষমতা তৈরি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কিন্তু এই প্রকল্পগুলোর আলোচনা শুধু যানবাহনের সংখ্যা, টোল কিংবা দ্রুত যাতায়াতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে এমন একটি পরিকল্পনার গল্প, যেখানে বড় অবকাঠামোর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের চলাচলের অধিকারও গুরুত্ব পেয়েছিল।

ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের দুটি সার্ভিস লেন সম্প্রতি খুলে দেওয়ার পর সেই বিষয়টিই আবার সামনে এসেছে। প্রকল্পটির প্রাথমিক নকশায় এই সার্ভিস লেন দুটি ছিল না। মূল পরিকল্পনা ছিল অনেকটা ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের আদলে টোলনির্ভর যাতায়াত ব্যবস্থা।

নকশা দেখার পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একটি সাধারণ কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছিলেন—যারা টোল দিয়ে চলাচল করতে পারবে না, তারা যাবে কোথায়?

প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কারণ ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের আশপাশে বিকল্প সড়ক থাকলেও আবদুল্লাহপুর থেকে আশুলিয়ার বাইপাইল পর্যন্ত বাস্তবতা ভিন্ন। ওই এলাকার বিপুলসংখ্যক মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াত মূলত একটি সড়কের ওপর নির্ভরশীল। সেই সড়কের ওপর এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করে পুরো ব্যবস্থাকে শুধু টোলনির্ভর করে দেওয়া হলে সাধারণ মানুষের জন্য বিকল্প পথ সীমিত হয়ে পড়ত।

সেখান থেকেই পরিকল্পনায় আসে পরিবর্তন। প্রায় চার কিলোমিটার দীর্ঘ দুটি সার্ভিস লেন যুক্ত করা হয়, যাতে মূল এক্সপ্রেসওয়েতে টোল দিয়ে চলাচলের পাশাপাশি সাধারণ মানুষ টোল ছাড়াও যাতায়াত করতে পারেন।

বিষয়টি শুধু দুটি সার্ভিস লেন তৈরির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর ভেতরে রয়েছে উন্নয়নকে দেখার একটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি। বড় অবকাঠামো নির্মাণ হবে, দ্রুতগতির যোগাযোগব্যবস্থা তৈরি হবে, রাজস্বও আসবে—কিন্তু সেই উন্নয়নের কারণে যেন একজন সাধারণ মানুষের পুরোনো চলাচলের পথ বন্ধ না হয়ে যায়।

মূল এক্সপ্রেসওয়ের দুই পাশে সার্ভিস লেন রেখে পরিকল্পনা করা হয়েছে টোলমুক্ত চলাচলের সুযোগ। নিচের অংশেও সাধারণ মানুষের জন্য আলাদা চার লেনের সড়ক রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে জলাভূমির স্বাভাবিক সংযোগ এবং আশপাশের সড়কব্যবস্থার সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টিও পরিকল্পনার অংশ করা হয়েছে।

এখানেই শেখ হাসিনার উন্নয়ন দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ফুটে ওঠে। তাঁর সময়ে পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, কর্ণফুলী টানেল কিংবা অসংখ্য সড়ক-মহাসড়ক নির্মাণের মতো বড় প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। কিন্তু বড় প্রকল্পের চাকচিক্যের বাইরে একজন সাধারণ নাগরিক কীভাবে সেটির সঙ্গে যুক্ত হবে—ঢাকা-আশুলিয়া এক্সপ্রেসওয়ের এই ঘটনাটি সেই চিন্তার একটি উদাহরণ।

একজন নীতিনির্ধারকের সামনে যখন একটি বিশাল প্রকল্পের নকশা আসে, তখন সেখানে নির্মাণ ব্যয়, দৈর্ঘ্য, যানবাহনের সক্ষমতা কিংবা অর্থনৈতিক সুবিধার হিসাবই সাধারণত প্রাধান্য পায়। কিন্তু সেই নকশার দিকে তাকিয়ে টোল দিতে না পারা মানুষের কথা ভাবা এবং তাদের জন্য বিকল্প পথ রাখার প্রশ্ন তোলা উন্নয়ন পরিকল্পনার সামাজিক দিকটিকেও সামনে নিয়ে আসে।

আজ সেই প্রশ্নের বাস্তব রূপ দেখা যাচ্ছে সার্ভিস লেনে।

একদিকে টোল দিয়ে দ্রুতগতিতে চলবে যানবাহন, অন্যদিকে টোল দিতে না চাওয়া বা না পারা মানুষও একই অঞ্চলে চলাচলের সুযোগ পাবেন। অর্থাৎ আধুনিক অবকাঠামোর সুবিধা তৈরির পাশাপাশি পুরোনো পথ ব্যবহারকারী মানুষের অধিকারও পুরোপুরি হারিয়ে যাচ্ছে না।

ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের তিন বছরের অভিজ্ঞতাও দেখিয়েছে, সময়ের সঙ্গে বড় অবকাঠামোর প্রয়োজনীয়তা অনেক বেশি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। প্রথম দিনের ২২ হাজারের কিছু বেশি যানবাহন এখন একদিনে ৮৫ হাজার ছাড়িয়েছে। যে প্রকল্প নিয়ে একসময় সংশয় ছিল, সেটিই এখন রাজধানীর যোগাযোগব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে।

উন্নয়ন নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক থাকবে, বড় প্রকল্পের ব্যয় ও বাস্তবায়ন নিয়েও প্রশ্ন থাকবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু একটি প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি মূল্যায়নে দেখতে হয় সেটি ভবিষ্যতের প্রয়োজন কতটা বুঝতে পেরেছিল এবং সাধারণ মানুষের জীবনকে কতটা বিবেচনায় নিয়েছিল।

ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের টোলমুক্ত সার্ভিস লেন সেই জায়গায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়। উন্নয়ন শুধু তাদের জন্য নয়, যারা টোল দিয়ে দ্রুতগতির এক্সপ্রেসওয়ে ব্যবহার করতে পারবেন। উন্নয়ন সেই মানুষটির জন্যও, যিনি প্রতিদিন সাধারণ সড়ক ব্যবহার করে কাজে যাবেন, বাজারে যাবেন কিংবা পরিবারের কাছে ফিরবেন।

আজকের বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে তাই কয়েক বছর আগে করা শেখ হাসিনার সেই একটি প্রশ্নই তাঁর দূরদর্শিতার সবচেয়ে সহজ ব্যাখ্যা হয়ে উঠেছে—❝যারা টোল দিয়ে চলাচল করতে পারবে না, তারা যাবে কোথায়?❞ একটি প্রশ্ন। কিন্তু তার উত্তর আজ দৃশ্যমান—সাধারণ মানুষের জন্য তৈরি টোলমুক্ত পথেই।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

৫ আগস্ট: দৃশ্যপটের আড়ালে জটিল বাস্তবতা

1

মব–শাসনের রক্তাক্ত বাস্তবতা, বিষবৃক্ষের ফল কুড়াচ্ছে সমাজ

2

ইউনূসের বাংলাদেশে নিরাপত্তাহীন সড়ক: যমুনা সেতু পশ্চিমে রামদা

3

গ্যাঁড়াকলে ইউনূস, পলাতে চাইলেও মিলছে না অনুমতি

4

শেখ হাসিনার দূরদর্শিতা: শুধু টোলনির্ভর নয়, ভেবে রেখেছিলেন সা

5

জঙ্গিবাদে সম্পৃক্ততার অভিযোগে জামায়াত আমিরের ছেলে ডা. রাফাত

6

৫ মার্চ ১৯৭১: লন্ডনে পাকিস্তানের পতাকা দাহ, দেশে অসহযোগ আন্দ

7

⁨সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অভিযোগ: ইসকনের বিরুদ্ধে উগ্র হিন্দুত্ব

8

কাঁদল বাংলাদেশ, ৩২ আতঙ্কে ঘুম হারাম ইউনূস গংদের

9

জন্মনিবন্ধন আছে, এনআইডি আছে, ফ্যামিলি কার্ডও আছে, এবার ৯ হাজ

10

মৌলবাদের ছায়া সংস্কৃতিতে: চারুকলা থেকে গেন্ডারিয়া পর্যন্ত বা

11

ভারতবিদ্বেষের দামি মূল্য: দুবাই ঘুরে আসছে একই ভারতীয় চাল

12

পাঠ্যবই প্রকল্পে ৬৫৯ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ: শিক্ষা খাতে

13

মব নিয়ে বিএনপির দ্বিচারিতা, থামছে না সন্ত্রাস

14

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও গণভোট বিতর্ক আদালতে চ্যালেঞ্জ

15

ঢাকা ওয়েস্টিনে মার্কিন সেনা কর্মকর্তার রহস্যজন মৃত্যু, গোপন

16

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বিদেশি অস্ত্রের জোগান আসছে কোথা থেকে ও কিভ

17

জুলাই মামলার ভয় দেখিয়ে আড়াই কোটি টাকার বেশি চাঁদাবাজি — নেপথ

18

ভোলার লালমোহন উপজেলায় যুবদলের নেতার ছেলে হলেন ছাত্রলীগের সাধ

19

মৌলবাদ ঠেকাতে হিন্দু ভোটে পাল্টাল সমীকরণ

20