Insight Desk
প্রকাশ : Sep 4, 2026 ইং
অনলাইন সংস্করণ

জন্মনিবন্ধন আছে, এনআইডি আছে, ফ্যামিলি কার্ডও আছে, এবার ৯ হাজার কোটি টাকার ‘এক-আইডি’!

কার্ডের দেশে এবার আসছে আরও এক কার্ড। জন্মনিবন্ধন আছে, জাতীয় পরিচয়পত্র আছে, পাসপোর্ট আছে, ড্রাইভিং লাইসেন্স আছে, টিআইএন আছে। এর সঙ্গে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ নানা পরিচয় ও সেবার আলাদা ব্যবস্থা তো আছেই। এত কিছুর পর এবার সবকিছুকে এক জায়গায় আনার কথা বলে বিএনপি সরকার নিয়ে আসতে যাচ্ছে নতুন ‘ইউনিফায়েড ডিজিটাল আইডেনটিটি’ বা ‘এক-আইডি’। আর সবকিছু ‘এক’ করতে প্রস্তাবিত প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয় প্রায় ৯ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, জন্মের পরই একজন নাগরিকের জন্য তৈরি হবে স্থায়ী ও স্বতন্ত্র পরিচয়। ভবিষ্যতে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও বিভিন্ন সরকারি সেবা এই পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারের আশা, এতে একই তথ্য বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে বারবার দেওয়ার ঝামেলা কমবে।

উদ্দেশ্য শুনতে আকর্ষণীয়। কিন্তু হিসাব সামনে আসতেই প্রশ্ন উঠছে, সব কার্ডের ঝামেলা কমাতে আবার নতুন কার্ডই কেন?

‘এক-আইডি’ চালুর জন্য তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগের অধীনে ‘ডিজিটাল সার্ভিস ট্রান্সফরমেশন ফর অ্যাকসেস অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স (ডি-স্টার)’ নামে একটি প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে। ২০২৬ থেকে ২০৩১ সাল মেয়াদি প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব পাওয়ার কথা বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের। অনুমোদনের জন্য প্রস্তাবটি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে।

প্রাথমিক হিসাবে প্রায় ১৮ কোটি নাগরিককে নতুন পরিচয়ব্যবস্থার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। অথচ কার্ড উৎপাদন ও মুদ্রণের লক্ষ্যমাত্রা রাখা হয়েছে ২০ কোটি। অর্থাৎ সম্ভাব্য নাগরিকসংখ্যার চেয়েও প্রায় দুই কোটি বেশি কার্ড।
তাই আরেকটি প্রশ্নও সামনে আসছে, ১৮ কোটি মানুষের জন্য ২০ কোটি কার্ড কেন?

এর চেয়েও বড় প্রশ্ন প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয় নিয়ে। প্রায় ৯ হাজার ১৯৩ কোটি টাকার কতটা কার্ড তৈরি ও মুদ্রণে, কতটা সফটওয়্যার ও তথ্যভান্ডার তৈরিতে, কতটা প্রযুক্তি অবকাঠামোয় এবং কতটা পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয় হবে, তার বিস্তারিত হিসাব সামনে আসা প্রয়োজন।

বাংলাদেশে নাগরিক পরিচয়ের জন্য ব্যবস্থার অভাব নেই। জন্মের পর জন্মনিবন্ধন, নির্ধারিত বয়সে জাতীয় পরিচয়পত্র, বিদেশ ভ্রমণের জন্য পাসপোর্ট, গাড়ি চালাতে ড্রাইভিং লাইসেন্স এবং কর ব্যবস্থায় টিআইএন রয়েছে।

সমস্যা মূলত বিভিন্ন সরকারি তথ্যভান্ডারের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি। একই নাগরিককে তাই বিভিন্ন দপ্তরে একই তথ্য বারবার দিতে হয়। নতুন প্রকল্পের লক্ষ্য যদি সেই সমস্যার সমাধান হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠছে, বিদ্যমান তথ্যভান্ডারগুলোকে প্রযুক্তিগতভাবে যুক্ত না করে নতুন একটি কার্ড তৈরির প্রয়োজন কেন?

প্রস্তাব অনুযায়ী, বর্তমানে ব্যবহৃত এনআইডি, ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডসহ বিভিন্ন পরিচয়পত্রের সেবাকে ধীরে ধীরে ‘এক-আইডি’র আওতায় আনার চিন্তা রয়েছে। তবে সেটিও এখনো চূড়ান্ত নয়।

ফলে কার্ডের হিসাবটি বেশ মজার হয়ে উঠেছে। একেক প্রয়োজনে একেক কার্ড। এরপর সেই সব কার্ড এক করতে আবার নতুন ‘এক-আইডি’।

এখন প্রশ্ন, ‘এক-আইডি’ এলে এনআইডির কী হবে? জন্মনিবন্ধন কি আগের মতোই থাকবে? ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড কি উঠে যাবে? নাকি নাগরিকের মানিব্যাগে পুরোনো কার্ডগুলোর পাশে নতুন অতিথি হিসেবে জায়গা নেবে ‘এক-আইডি’?

এর সঙ্গে রয়েছে নাগরিকের তথ্যের নিরাপত্তার প্রশ্ন। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পরিচয় ও বিভিন্ন সরকারি সেবার তথ্য একটি ডিজিটাল পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত হলে সেবা সহজ হতে পারে। একই সঙ্গে একটি কেন্দ্রীয় ব্যবস্থায় বিপুল ব্যক্তিগত তথ্য জমা হওয়ার কারণে তথ্য সুরক্ষা ও গোপনীয়তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

জন্মের পর থেকেই একটি একক ডিজিটাল পরিচয় দেওয়ার ধারণা নিজে অযৌক্তিক নয়। সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে এটি সরকারি সেবা সহজ করতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে এর বাস্তবায়ন পদ্ধতি, প্রয়োজনীয়তা এবং ৯ হাজার ১৯৩ কোটি টাকার বিশাল ব্যয় নিয়ে।

দেশে যখন জন্মনিবন্ধন ও এনআইডির মতো বড় জাতীয় তথ্যভান্ডার আগে থেকেই রয়েছে, তখন এত অর্থ ব্যয় করে নতুন ব্যবস্থা তৈরির আগে বিদ্যমান ব্যবস্থাগুলো সমন্বয় ও আধুনিকায়নের বিকল্প কতটা যাচাই করা হয়েছে, সেটিও জানা প্রয়োজন।
কারণ সরকারি প্রকল্পের টাকা শেষ পর্যন্ত জনগণেরই টাকা।

তাই ‘এক-আইডি’র লক্ষ্য যদি সত্যিই ‘এক নাগরিক, এক পরিচয়’ হয়, তাহলে বিএনপি সরকারের আগে পরিষ্কার করা প্রয়োজন, এটি কি পুরোনো ব্যবস্থাগুলোকে প্রতিস্থাপন করবে, নাকি পরিচয়পত্রের দীর্ঘ তালিকায় আরও একটি নতুন কার্ড যোগ করবে?

জন্মনিবন্ধন আছে, এনআইডি আছে, ফ্যামিলি কার্ড আছে, কৃষক কার্ড আছে। এবার সব কার্ডের সমাধানে আসছে ‘এক-আইডি’। কিন্তু ৯ হাজার ১৯৩ কোটি টাকার প্রশ্নটা থেকেই যাচ্ছে, কার্ড কমাতে নতুন কার্ড, নাকি কার্ডের তালিকায় শুধুই আরেকটি নাম?

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

মব–শাসনের রক্তাক্ত বাস্তবতা, বিষবৃক্ষের ফল কুড়াচ্ছে সমাজ

1

জেলায় জেলায় বিএনপি–জামায়াত সংঘর্ষ

2

গোপালগঞ্জে গণহত্যা চালানো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের পরিচয়

3

রাষ্ট্রপতির বাণী কি উপদেষ্টা মাহফুজ আলম লিখে দিলেন?

4

শেখ হাসিনার কড়া সতর্কবার্তা: অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন ছাড়া

5

নির্বাচন ঘিরে জঙ্গি হামলার শঙ্কা: আইজিপি

6

বাংলাদেশের রঙ্গিন বিপ্লব ও জাতিসংঘের প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা

7

সামরিক নির্ভরতার ফাঁদ ও ৫ আগষ্ট

8

স্বাস্থ্য খাতে অনিয়মের অভিযোগে ডিজি আবু জাফরের বিরুদ্ধে তদন্

9

মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগে ইউনূসপন্থীদের, নি

10

রাজপথে স্বতঃস্ফূর্ত মিছিল আওয়ামী লীগের, অবৈধ ইউনুস সরকারের প

11

৫ আগস্টের পর জঙ্গিবাদের আস্ফালনে, ভয়-উৎকণ্ঠায় তটস্থ জনগণ

12

বিশাখাপত্তনমে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ, ভারত–বাংলাদেশ ন

13

ভয় দেখিয়ে ৫ আগস্ট ‘গণজোয়ার’ সৃষ্টির অপচেষ্টা

14

সিরাজগঞ্জে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নারী হত্যায় এলাকায় আতঙ্ক

15

সুতো নিয়ে মহাসঙ্কটে বাংলাদেশ: বন্ধের মুখে শতাধিক স্পিনিং মি

16

সংকটে এনসিপি, মার্কিন গুরুর দীক্ষা নিতে কক্সবাজারে এনসিপির ন

17

জুলাই: বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের পুনরুত্থানের মাস

18

নোয়াখালীতে ভোটকেন্দ্র স্কুলে আগুন, শ্রেণিকক্ষ পুড়ে ছাই

19

জুলাই মামলার ভয় দেখিয়ে আড়াই কোটি টাকার বেশি চাঁদাবাজি — নেপথ

20