দেশব্যাপী বিশেষ টিকাদান কর্মসূচির প্রায় পাঁচ মাস পরও নিয়ন্ত্রণে আসেনি হামের সংক্রমণ। হামের টিকা নেওয়ার দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে শরীরে রোগ প্রতিরোধী অ্যান্টিবডি তৈরি হওয়ার কথা থাকলেও প্রতিদিন নতুন রোগী শনাক্ত হচ্ছে, বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যাও। গত ১৫ মার্চ থেকে ৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে দেশে মোট ৯৮৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। বিপুলসংখ্যক শিশুকে টিকার আওতায় আনার পরও সংক্রমণ অব্যাহত থাকায় টিকার কার্যকারিতা, মান এবং সংরক্ষণব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বিশেষজ্ঞরা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ৩ সেপ্টেম্বরের নিয়মিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় আরও তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। তাঁদের মধ্যে দুজন ঢাকা বিভাগের এবং একজন সিলেট বিভাগের। ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ৮৮৭ জন এবং পরীক্ষা করে হাম নিশ্চিত হওয়ার পর মৃত্যু হয়েছে আরও ৯৯ জনের।
একই সময়ে রোগীর সংখ্যাও উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় ৯৬৪ জনের মধ্যে হামের উপসর্গ দেখা গেছে এবং পরীক্ষায় আরও ৮০ জনের সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে। ১৫ মার্চ থেকে মোট সন্দেহজনক রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬১ হাজার ১৪৮ জনে। এর মধ্যে পরীক্ষায় নিশ্চিত হয়েছে ১৯ হাজার ৫২৭ জনের হাম।
এই সময় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৪৯ জন এবং সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৪০৫ জন।
দেশে হামের প্রকোপ ছড়িয়ে পড়ার পর ৫ এপ্রিল উচ্চ সংক্রমিত এলাকার শিশুদের নিয়ে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করা হয়। প্রথম পর্যায়ে ১৮ জেলার ৩০টি উপজেলা ও পৌরসভায় টিকা দেওয়া হয়। পরে ২০ এপ্রিল থেকে দেশব্যাপী কার্যক্রম শুরু হয়।
সরকার ছয় থেকে নয় মাস বয়সীসহ নির্ধারিত বয়সসীমার ১ কোটি ৯০ লাখ ৫ হাজার ৯৫০ শিশুকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে ১২ মে শতভাগ কাভারেজ অর্জিত হয়। ২০ মে পর্যন্ত চলা কর্মসূচিতে মোট ২ কোটি ২৪ হাজার ১১৭ শিশুকে টিকা দেওয়া হয়, যা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৬ শতাংশ বেশি।
কিন্তু প্রশ্ন তৈরি হয়েছে এখানেই। লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি শিশুকে টিকা দেওয়ার পর কয়েক মাস পার হলেও সংক্রমণের ধারা কেন প্রত্যাশিতভাবে কমছে না?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু কত শতাংশ শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে সেই সংখ্যা দিয়ে একটি টিকাদান কর্মসূচির কার্যকারিতা নির্ধারণ করা যায় না। টিকা নেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর শরীরে পর্যাপ্ত অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে কি না, সেটিও বৈজ্ঞানিকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
দীর্ঘদিন সরকারের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) ও আইসিডিডিআর,বিতে কাজ করা টিকা বিশেষজ্ঞ ডা. মো. তাজুল ইসলাম এ বারী এর আগেই টিকাপ্রাপ্ত শিশুদের রক্ত পরীক্ষা করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তাঁর মতে, ছয় থেকে নয় মাস, নয় মাসের বেশি থেকে দুই বছর এবং পাঁচ বছরের নিচের বিভিন্ন বয়সী টিকাপ্রাপ্ত শিশুদের নমুনা পরীক্ষা করে দেখতে হবে তাদের শরীরে হামের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়েছে কি না।
তিনি আরও বলেছেন, শুধু অ্যান্টিবডির উপস্থিতি পেলেই যথেষ্ট নয়; সেই অ্যান্টিবডির মাত্রা রোগ প্রতিরোধের জন্য পর্যাপ্ত কি না, সেটিও দেখা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুর বয়সের সঙ্গে হামের টিকার কার্যকারিতার সম্পর্ক রয়েছে। কম বয়সে মায়ের কাছ থেকে পাওয়া অ্যান্টিবডি শিশুর শরীরে থাকার কারণে টিকার প্রতিক্রিয়া তুলনামূলক কম হতে পারে। পুষ্টি ও শারীরিক অবস্থাসহ আরও কিছু বিষয়ও কার্যকারিতাকে প্রভাবিত করতে পারে। ফলে সংক্রমণ অব্যাহত থাকার অর্থ স্বয়ংক্রিয়ভাবে টিকা নিম্নমানের—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না। তবে কারণ অনুসন্ধানে কার্যকারিতা পরীক্ষা জরুরি।
একই সঙ্গে টিকার মান এবং সরবরাহের সময় ‘কোল্ড চেইন’ ঠিক ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে। নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় টিকা সংরক্ষণ ও পরিবহন না হলে তার কার্যকারিতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
এ কারণে ন্যাশনাল কন্ট্রোল ল্যাবরেটরিতে ব্যবহৃত টিকার নমুনা পরীক্ষা, পরিবহন ও সংরক্ষণব্যবস্থার মূল্যায়ন এবং প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক মান যাচাইয়ের উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক বে-নজির আহমেদও টিকাদানের পর শিশুদের শরীরে প্রয়োজনীয় অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে কি না তা পরীক্ষা করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।
আইইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা অধ্যাপক ডা. আহমেদ নওশের আলমের বক্তব্যেও আরেকটি সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে। কাগজে-কলমে টিকার কাভারেজ শতভাগ হলেও কোনো নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠী বাস্তবে বাদ পড়ে থাকতে পারে এবং সেখান থেকেও সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাঁর মতে, টিকার কার্যকারিতা পরীক্ষা ছাড়া বিষয়টি নিশ্চিতভাবে বোঝা সম্ভব নয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক ডা. হালিমুর রশিদ জানিয়েছেন, বিষয়টি কর্তৃপক্ষের ভাবনায় রয়েছে। সংক্রমণ কমে আসবে বলে ধারণা করা হয়েছিল। কিন্তু তা প্রত্যাশিতভাবে না কমায় বিষয়টি নিয়ে ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে আলোচনা প্রয়োজন বলে তিনি জানিয়েছেন।
হাম অত্যন্ত সংক্রামক রোগ। টিকাদানই এর বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সুরক্ষাগুলোর একটি। তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে টিকা সম্পর্কে জনমনে অনাস্থা তৈরি না করে কেন সংক্রমণ অব্যাহত রয়েছে, তার বৈজ্ঞানিক কারণ দ্রুত শনাক্ত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
দুই কোটির বেশি শিশুকে টিকা দেওয়ার পরও যদি প্রতিদিন শত শত সন্দেহজনক রোগী পাওয়া যায় এবং মৃত্যু অব্যাহত থাকে, তাহলে শুধু টিকাদানের সংখ্যাগত সাফল্য তুলে ধরলেই পরিস্থিতির সমাধান হবে না। কোন বয়সী শিশুরা আক্রান্ত হচ্ছে, আক্রান্তদের কতজন টিকাপ্রাপ্ত, তাদের শরীরে পর্যাপ্ত অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছিল কি না, ব্যবহৃত টিকার মান ঠিক ছিল কি না এবং পুরো সরবরাহব্যবস্থায় কোল্ড চেইন যথাযথভাবে বজায় ছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখন জরুরি।
৯৮৬টি মৃত্যু কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি হারিয়ে যাওয়া জীবন ও একটি পরিবারের শোক। তাই টিকার মান নিয়ে অনুমান কিংবা আশ্বাস নয়—প্রয়োজন দ্রুত, স্বচ্ছ ও বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা।
মন্তব্য করুন