নিজস্ব প্রতিবেদক
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তির দিনে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) শীর্ষ নেতাদের আকস্মিক কক্সবাজার সফর রাজনৈতিক মহলে তীব্র বিতর্ক ও সন্দেহের জন্ম দিয়েছে। প্রাথমিকভাবে সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাসের সঙ্গে গোপন বৈঠকের গুঞ্জন ছড়ালেও, নতুন তথ্যে সামনে এসেছে ১৪ বিলিয়ন ডলারের বোয়িং বিমান ক্রয় চুক্তির ২৫ শতাংশ কমিশন ভাগাভাগির অভিযোগ, যা দেশের রাজনীতিতে নতুন ঝড় তুলেছে।
নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাতে জানা গেছে, ২৫টি বোয়িং বিমান কেনার এই চুক্তির প্রকাশিত মূল্য ১৪ বিলিয়ন ডলার হলেও, আসল মূল্য সাড়ে ১০ বিলিয়ন ডলার। বাকি সাড়ে ৩ বিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ মোট মূল্যের ২৫ শতাংশ, কমিশন হিসেবে ভাগাভাগির জন্য পরিকল্পনা করা হয়েছে।
সূত্রের দাবি, এই বিপুল অর্থ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের উপদেষ্টা, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি এবং অন্যান্য গোষ্ঠীর মধ্যে বণ্টনের উদ্দেশ্যে এনসিপি নেতাদের কক্সবাজার সফর। এই কমিশনকে গত বছরের জুলাই আন্দোলনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে ভূমিকা পালনের ‘পুরস্কার’ হিসেবে বোয়িং কোম্পানির পক্ষ থেকে দেওয়া হবে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
এনসিপি’র মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলম, মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) হাসনাত আবদুল্লাহ, যুগ্ম আহ্বায়ক তাসনিম জারা, যুগ্ম আহ্বায়ক খালেদ সাইফুল্লাহ এবং সদস্য আয়শা খানম মঙ্গলবার (৫ আগস্ট) বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটে কক্সবাজার পৌঁছান। তারা বিমানবন্দর থেকে সরাসরি ইনানীর হোটেল সি-পার্লে যান, যেখানে গুঞ্জন ছড়ায় তারা পিটার হাসের সঙ্গে বৈঠক করছেন।
তবে এনসিপির মুখ্য সংগঠক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “কারও সঙ্গে বৈঠকের জন্য নয়, আমরা হুট করে ঘুরতে এসেছি। পদযাত্রার ধকল সামলাতে সাগরপাড়ে বিশ্রাম নিতে এসেছি।” তিনি এই গুঞ্জনকে ‘মিডিয়া প্রোপাগান্ডা’ বলে উল্লেখ করেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এই সফর এবং অভিযোগকে অত্যন্ত গুরুতর মনে করছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, “যদি বোয়িং চুক্তির কমিশনের অভিযোগ সত্য হয়, তবে এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি অভূতপূর্ব আর্থিক কেলেঙ্কারি হবে। জাতীয় সম্পদের এমন অপব্যবহার জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল। এনসিপি নেতাদের হঠাৎ কক্সবাজার সফর এবং তাদের নীরবতা সন্দেহকে আরও গভীর করছে।”
অপর এক বিশ্লেষক মনে করেন, “এই অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্বচ্ছ তদন্ত জরুরি। এনসিপির নেতারা যদি সত্যিই এমন কোনো চুক্তিতে জড়িত থাকেন, তবে এটি দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের উপর কালো ছায়া ফেলবে। এই ঘটনা বিএনপি ও এনসিপির মধ্যে বিদ্যমান উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে, যা ইতোমধ্যে ইশরাক হোসেনের মেয়র পদের ইস্যুতে প্রকাশ পেয়েছে।
এদিকে এনসিপির দলীয় দপ্তর সম্পাদক ও যুগ্ম সদস্য সচিব সালেহ উদ্দিন সিফাত পাঁচ নেতাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করেছেন, যাতে বলা হয়, এই সফর সম্পর্কে দলের রাজনৈতিক পর্ষদকে পূর্বে অবহিত করা হয়নি। এই নোটিশের পরও নেতাদের পক্ষ থেকে কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। বোয়িং কোম্পানি বা মার্কিন দূতাবাসও এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি।
অপরদিকে মঙ্গলবার (৫ আগস্ট) বিকেলে গণঅভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি উপলক্ষ্যে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলা ও পৌর বিএনপি আয়োজিত সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স প্রশ্ন তুলে বলেন, গণঅভ্যুত্থানের একক দাবিদাররা বর্ষপূর্তি উদযাপন রেখে কক্সবাজারে অবকাশ যাপনে কেন? জাতি জানতে চায়। গণতন্ত্রের উত্তরণে নতুন কোনো চক্রান্তের জাল বুনতে চাইলে জনগণ তাদের প্রতিহত করবে। যারা গণতন্ত্র উত্তরণে বাধা সৃষ্টি করবে তারা দেশ ও জনগণের বন্ধু হতে পরে না।
১/১১ পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে– তথ্য উপদেষ্টার এমন ফেসবুক স্ট্যাটাসের বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, আল্লাহ না করুন, সেরকম পরিস্থিতি যদি সত্যি সৃষ্টি হয় তাহলে তার জন্য সরকার ও গণঅভ্যুত্থানের শক্তির মধ্যে বিভেদ ও বিদ্বেষ সৃষ্টিকারী কিংস পার্টি ও তাদের সহযোগী দুটি দল দায়ী থাকবে।
মন্তব্য করুন