নিজস্ব প্রতিবেদক
শাহবাগে ‘জুলাই সনদ’ ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপ নতুন মোড় নিচ্ছে। বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং জাতীয় ঐক্যমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি অধ্যাপক ড. আলী রিয়াজের যৌথ পরিকল্পনায় শাহবাগে ভাড়ায় লোক এনে ‘জুলাই সনদ’ সংক্রান্ত একটি নাটক মঞ্চস্থ করা হয়েছে। ঘটনায় জাতীয় নাগরিক পার্টির নিরাপত্তা শাখা (পুলিশ) নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
‘সনদ নাটক’ পরিকল্পনায় জামায়াতের সংশ্লিষ্টতা
সূত্র জানায়, রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণে চলমান সংলাপের মাধ্যমে ‘জুলাই সনদ’ চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে কাজ করছে জাতীয় ঐক্যমত্য কমিশন। বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি, গণঅধিকার পরিষদসহ অন্তত ৩০টি রাজনৈতিক দল এই সংলাপে অংশ নিয়েছে। কমিশনের সহ-সভাপতি ড. আলী রিয়াজ ২০ জুলাই ঘোষণা দিয়েছিলেন, ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে সনদ চূড়ান্ত করা হবে। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাবলির পর এই উদ্যোগকে ‘মঞ্চস্থ নাটক’ বলেই আখ্যা দিচ্ছে কয়েকটি রাজনৈতিক দল।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি সূত্র দাবি করেছে, জামায়াত সমর্থিত লোকজনকে ভাড়ায় এনে শাহবাগে জনমত গঠনের কৃত্রিম প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে, যার লক্ষ্য ‘জুলাই সনদ’-কে জনপ্রিয় ও গ্রহণযোগ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। অথচ, এই ঘটনাগুলোর সময় এনসিপির নিরাপত্তা বাহিনী হিসেবে পরিচিতি পুশিল আশপাশে থাকলেও কোনো ধরনের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়নি, যা রাজনৈতিক মহলে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
সনদের খসড়া, আপত্তি ও সময়সীমা
২৯ জুলাই ড. আলী রিয়াজ জানান, জুলাই সনদের খসড়া রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে পাঠানো হয়েছে এবং ৩০ জুলাইয়ের মধ্যে তাদের মতামত সংগ্রহ করা হবে। তার ভাষায়, “আমাদের লক্ষ্য ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে একটি গ্রহণযোগ্য সনদ চূড়ান্ত করা।”
তবে এনসিপি সনদের খসড়ায় মৌলিক সংস্কার না থাকায় এতে স্বাক্ষর দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। দলের একজন নেতা জানান, “আমরা মৌলিক সংস্কার ছাড়া কোনো ধরনের আপস করব না।”
এই পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও বেড়েছে যখন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম সাংবাদিকদের বলেন, “জুলাই সনদ আগামী পাঁচ-ছয় দিনের মধ্যে বাস্তবায়ন করা না গেলে তা আর সম্ভব হবে না। এই সময়ের মধ্যে আমরা বুঝতে পারব, আমরা কোথায় যাচ্ছি।” —এই বক্তব্যকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা দেখছেন অপ্রয়োজনীয় চাপ সৃষ্টির প্রচেষ্টা হিসেবে, যা সংলাপের পরিবেশকে বিঘ্নিত করতে পারে।
অস্থিরতা ও বিভ্রান্তির আশঙ্কা
বিশ্লেষকদের মতে, শফিকুল আলমের মন্তব্য সনদ প্রক্রিয়াকে সংকটে ফেলতে পারে। তারা বলেন, “এ ধরনের সময়সীমা বেঁধে দেওয়ার মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিভ্রান্তি ও সন্দেহ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে যখন কয়েকটি দল এখনও খসড়ার সঙ্গে একমত নয়।”
বিএনপির এক শীর্ষস্থানীয় নেতা বলেন, “এ ধরনের বক্তব্য অযথা রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়াচ্ছে। জুলাই সনদের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জোর করে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া চলবে না। পর্যাপ্ত আলোচনা ও রাজনৈতিক ঐক্যমত্য ছাড়া সনদের বাস্তবায়ন দেশের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে।”
শাহবাগে সংঘটিত সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ এবং সনদ ঘিরে রাজনৈতিক দলগুলোর বিরোধিতা স্পষ্ট করছে—এই মুহূর্তে ‘জুলাই সনদ’ শুধু একটি রাজনৈতিক প্রস্তাবনা নয়, বরং তা হয়ে উঠেছে ক্ষমতার ভারসাম্য, গ্রহণযোগ্যতা এবং স্বচ্ছতার পরীক্ষা। পরিস্থিতির আরও অবনতি ঠেকাতে, এখনই প্রয়োজন সর্বস্তরের অংশগ্রহণ ও আন্তরিক সংলাপ—নয়তো এই রাজনৈতিক নাটকের পরিণতি হতে পারে আরো গভীর বিভাজন ও অনাস্থার সংকট।
মন্তব্য করুন